পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে প্রণীত বিধিমালার পরিবর্তে নতুন বিধিমালা ২০২৩-এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ৭২ শিল্পকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিতপূর্বক সেগুলো কঠোর তদারকির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। এতে পরিদর্শন করে ছাড়পত্রের বিধানসহ কিছু ইতিবাচক বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এ বিধিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে চায় তবে আরো জনবল এবং দাপ্তরিক সক্ষমতার প্রয়োজন হবে। নয়তো এ বিধিমালার সুফল মিলবে না। অনেক ভালো আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও শুধু প্রয়োগে শিথিলতার কারণে সেগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলে না। সদ্য ঘোষিত পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা যেন একই পরিণতি বরণ না করে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে, পরিবেশ সুরক্ষায় বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ জনবহুল হলেও শিল্পায়নের দিক থেকে আমরা পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এখনো পিছিয়ে আছি। সে কারণে শিল্পক্ষেত্রের বর্জ্য থেকে পরিবেশদূষণের মাত্রা আমাদের দেশে কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শিল্পের কারণে আমাদের পরিবেশদূষণের মাত্রা কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রক্ষায় পারদর্শিতাবিষয়ক সূচকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে অবস্থান ১৬২তম। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে বাংলাদেশের অবস্থান। এটি বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়, কারণ বাংলাদেশের আয়তন কম, সে তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। এ রকম উচ্চমাত্রার জনঘনত্বপূর্ণ দেশ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পারদর্শী না হলে দেশবাসীর স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক জীবনমান ক্রমেই হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন নয় যে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি আছে। পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার আইন প্রণয়ন করেছে অন্তত দুই যুগ আগে। পরিবেশদূষণ-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করার জন্য এ দেশে তিনটি পৃথক আদালতও রয়েছে। কিন্তু এ আইনের পর্যাপ্ত প্রয়োগ হচ্ছে না বলে পরিবেশদূষণ-সংক্রান্ত অপরাধগুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। যাদের কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশের দূষণ ঘটছে, তাদের মধ্যে এটা অনুধাবনে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে যে তাদের ওই সব কর্মকাণ্ড পরিবেশ সুরক্ষা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কিংবা তারা সেগুলোকে অপরাধ বলে গণ্য করলেও এ রকম ভেবে নিশ্চিন্ত থাকেন যে কিছু জরিমানা পরিশোধের মাধ্যমেই ওই সব অপরাধের শাস্তি এড়ানো সম্ভব। এমন বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, তার ওপর এর সুফল নির্ভর করছে।
বিশ্বের বহু দেশ দূষণ কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মাধ্যমে। মানুষ যেন গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসা কমিয়ে দেয়, সেজন্য লন্ডনের কেন্দ্রে গাড়ি চালাতে গেলে দিনে ১০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪ ডলার কিংবা ১১ ইউরো ‘ভিড়ের মাশুল’ গুনতে হয়। রাস্তায় লাগানো যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর প্লেট চিনে নিতে পারে অর্থাৎ ধরতে পারে ‘ভিড়ের মাশুল’ দেয়া হয়েছে কিনা। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখা হয়েছে; শহরের অর্ধেক বাসিন্দা সাইকেলে চড়ে অফিসে যায়। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের রয়্যাল থিয়েটারের সামনের চত্বরটিতে এরই মধ্যে গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ, অন্যান্য এলাকাও ‘পথচারী এলাকা’ ঘোষণা করার প্রচেষ্টা চলছে। লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মাদ্রিদের গোটা কেন্দ্রীয় অংশটি শুধু পথচারীদের জন্য খোলা রাখা। এর কারণ হলো মাদ্রিদের চারপাশে পাহাড় থাকার ফলে দূষিত বায়ু শহরেই আটকা পড়ে ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। দূষিত নদীকে পরিশুদ্ধ করে পর্যটনের স্থানে রূপ দিয়েছে ইতালির ভেনিস। এমন আরো উদাহরণ খুঁজে বের করা সম্ভব। চীনের বেইজিংকে দূষণমুক্ত করতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ ও শিল্প-কারখানার দূষণ কমিয়ে এনেছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি কঠিন নয়। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় ছাড়াও অধিদপ্তর ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে, যারা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। এসব সংস্থার জনবলও কম নয়। তার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সমস্যা হচ্ছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাব।
পরিবেশদূষণ রোধে সরকার আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনেক পদক্ষেপই নিয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও তার ফল প্রত্যাশিত নয়। পরিবেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত আইনের সংখ্যা প্রায় ২০০টি। দূষণ রোধে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ১৯৯৭ সালে পরিবেশ দূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরিবেশ আদালত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে বিশেষায়িত পরিবেশ বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয় ২০০০ সালে। দেশের প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত এবং সারা দেশের জন্য এক বা একাধিক পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয় আইনে। পরিবর্তনের হাওয়ায় আগের আইনটি রহিত করে ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। দুঃখজনক ব্যাপার, পরিবেশ আদালত আইনে জনগণকে সরাসরি মামলা দায়েরের অধিকার দেয়া হয়নি। তবে কিছু আশাব্যঞ্জক নীতিমালা পরিলক্ষিত হয়। উপরন্তু ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে বিভিন্ন সামাজিক শক্তিসহ সরকারি বিধি ও নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন নীতিগত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যদিও সবক্ষেত্রে সুফল মিলছে না।
শিল্পায়নের কারণে নানাভাবেই পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। শিল্প-কারখানার ধোঁয়া সরাসরি আমাদের পরিবেশে মিশে বায়ুদূষণ করছে। কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদী কিংবা অন্য কোনো জলাধারে ফেলা হচ্ছে। এতে পানি তো দূষিত হচ্ছেই, নদীতে থাকা অনেক জীবও হারিয়ে যাচ্ছে। নদীর তীর দখল করে কিংবা তীর ঘেঁষে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপনও এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদী দখল করে শুধু শিল্প স্থাপনই নয়, আবাসন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হচ্ছে। নদী থেকে প্রতিনিয়ত বালি তুলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভারসাম্যও নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। এ বালি বিশাল ভবন থেকে শুরু করে অনেক কিছুতে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বনভূমিও মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলা হচ্ছে। আমাদের পরিবেশের লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত সুন্দরবনকে ঘিরে শত শত কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি এর অদূরেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। এটা নিয়ে পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথা কারো অজানা নয়। চট্টগ্রাম শিপইয়ার্ড এলাকায়ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে। পুরনো জাহাজের পোড়া তেল সমুদ্রে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এগুলো জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হচ্ছে তা সবারই জানা কথা। এছাড়া শিল্প-কারখানা স্থাপনের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার একর কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। কৃষিজমি হ্রাস আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও হুমকি। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় চামড়ার ট্যানারিগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর কতটা ক্ষতি করেছে তাও সবার জানা। নদীর পানি পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও সেখানে মেলা ভার। সাভারের ট্যানারি শিল্প এখন ধলেশ্বরী নদীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হওয়ায় তা ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরীতে।
পরিবেশ রক্ষা করে শিল্প-কারখানা গড়তে হলে আমাদের বেশকিছু উদ্যোগ সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শুধু গাজীপুর কিংবা নরসিংদীর মতো বড় শহর নয়, জাতীয় পর্যায়ে কিছু নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে এবং তা অবশ্যই আবাসিক এলাকার বাইরে। এক্ষেত্রে নতুন কোনো কৃষিজমি যাতে নষ্ট না হয় তাও খেয়াল রাখতে হবে। নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলের বাইরে কারখানা নির্মাণ কোনোভাবেই অনুমোদন দেয়া যাবে না। স্বল্প জায়গায় বহুতল কারখানা নির্মাণের মতো ব্যাপার গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে গার্মেন্টসের মতো কিছু শিল্প-কারখানা পরিবেশ ও আবাসনসহ নানা ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এজন্য এ ধরনের শিল্প খাত বড় শহরগুলো থেকে বাইরে কোথাও নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে দেয়া যেতে পারে। কারখানার জন্য শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুতের মতো সুবিধা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ঢাকা শহরের গার্মেন্ট কারখানাগুলো সরাতে উদ্যোগের কথা শোনা যায়। তবে তার বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য মেলে না।
শিল্প-কারখানাগুলো অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। দেশে দেখা যায়, বড় বড় কোম্পানির কারখানা নদীতীরে কিংবা কোনো জলাধারের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে। এর তরল বর্জ্য প্রতিনিয়ত পানিতে ফেলে দূষিত করা হচ্ছে। এভাবে দূষণকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া সমীচীন নয়। এগুলো বন্ধের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া কারখানাগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনা করছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। মোট কথা, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।










