দেশে হঠাৎ করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়ে গেছে। এদিকে বিদ্যুতের দাম এক মাস পার হওয়ার আগেই দুই দফা বেড়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই ভাড়া বাড়িয়েছে অনেক বাড়িওয়ালা। বাজারে গেলে স্বস্তি নেই, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে তাতে শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে গেছে স্বল্প আয়ের মানুষের। 

নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ভালো নেই, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির তুলনায় সবার উপার্জন বাড়েনি। জীবনের ঘানি টেনে চলতে গিয়ে মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাটছাঁট করতে হচ্ছে জীবনযাপনের ব্যয়ে। এ সময়ে কারা ভালো আছে? দুর্দশায় জর্জরিত মানুষ সরকারি কর্মকর্তারা ভালো আছে বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু সত্যি কি তাই? ব্যয় বৃদ্ধির এ লাগামহীন বাজারে সত্যি কি সরকারি চাকরিজীবীরা ভালো আছেন? সম্প্রতি একটি অনলাইন পোর্টালে ‘সরকারি কর্মচারীদের মন খারাপ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। গত ১০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ‘এ মুহূর্তে নতুন পে-স্কেল বা মহার্ঘ ভাতা নয়’, এমন বক্তব্যের পর সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ করে কর্মচারীদের মন বেশি খারাপ হয়েছে। কারণ তারা সবাই আশায় ছিলেন মূল্যস্ফীতির ধকল সামলাতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পে-স্কেলের সুখবর থাকবে।

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পায়। অথচ বেতন বাড়ে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের, কিন্তু এর ধকল সামলাতে হয় সব ধরনের আয়ের জনগোষ্ঠীর। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারা ঢাকা শহরকে শুধু সরকারি চাকরিজীবী ও উচ্চ আয়ের মানুষের বসবাসের উপযোগী ঘোষণার দাবি জানান।

বর্তমানে দেশের অন্য জেলাগুলোর মানুষের জন্য ঢাকা ব্যয়বহুল শহরে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী দেশের ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার মানুষের মধ্যে ঢাকা শহরেই ১ কোটি ২ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে। সরকারি হিসাবে ঢাকায় বসবাসকারীর সংখ্যা কম হলেও প্রকৃতপক্ষে এ শহরের জনসংখ্যা দুই কোটির বেশি। মূলত উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থানের চাহিদা থাকায় ঢাকা শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। ঢাকার বাইরে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও মানুষ আর্থিক নিশ্চয়তার জন্য ঢাকা শহরে আসছে। এ সুযোগে পাল্লা দিয়ে ঢাকায় বসবাসের খরচ বেড়েছে।

আর আমাদের দেশে একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে তা আর কমে না। তাই ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়াও আর কমেনি, সময়ের সঙ্গে তা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ঢাকায় জমির দামও এখন অনেক, তাই ঢাকার বুকে নিজের বাড়ি বা কেনা ফ্ল্যাটে থাকার সৌভাগ্য সবার হয় না। মানুষের উপার্জনের বড় অংশই বাড়ি ভাড়ার পেছনে চলে যাচ্ছে। শিক্ষা উপকরণের মূল্য বেড়ে গেছে, জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহের পর সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়িয়ে এ শহরে টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে গেছে।

বস্তুত জীবন নির্বাহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সবাই এখন অধিক অর্থ উপার্জন করতে চায়। কিন্তু এটা একটা চক্রের মতো, দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট পণ্য মজুদ করে অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে উপার্জিত অতিরিক্ত অর্থ ভোগ করা যায় না। কারণ বাজারে সে যেমন বিক্রেতা হিসেবে অধিক অর্থ উপার্জন করছে, ঠিক তেমনি ক্রেতারূপে তার প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা অধিক লাভে বিক্রি করছে। এতে অতিরিক্ত যে অর্থ উপার্জন করা হয়, সেটি বর্ধিত মূল্য আরোপিত পণ্য কিনতে গিয়েই খরচ হয়ে যায়। এজন্য সম্পদের পাহাড় জমাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া ব্যবসার মনোভাব পোষণ করে।

আবার সরকারি অফিসে সেবা পেতে ঘুস প্রদান এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। প্রযুক্তির বিস্তারে অফিসগুলোতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও খামের মাধ্যমে ঘুস নেয়া হয়। সেবাপ্রার্থী মানুষও ঘুস দিতে বাধ্য হয়। মানুষকে জিম্মি করে অর্থ উপার্জন করা অপরাধ, এক্ষেত্রে সৎ পথে উপার্জনের মধ্যে যে মানসিক প্রশান্তিটুকু আছে, তা অসৎ পথের উপার্জনে পাওয়া যায় না।

এজন্য সেবা প্রদান করার মানসিকতা থাকতে হবে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বদলিতে এলাকাবাসীর কান্নার যে সংবাদ ছাপা হয়েছে, সেটি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। 

বর্তমানে বদলে যাওয়া সময়ে মানিয়ে নিতে কৃচ্ছ্র সাধনের কথা উঠে আসছে, খাবারসহ বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতার কথা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই বলা হয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এখনো ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু এতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যাবে না।

অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ যুগে আমাদের আরেকটি বিষয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, সেটি হচ্ছে ‍গুজব। গুজবের ফলে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা তুলে নেয়ার হিড়িক পড়েছিল, পরবর্তী সময়ে গুজব কেটে যাওয়ায় মানুষ আবারো ব্যাংকে টাকা রাখছে। তবে ব্যাংকে সঞ্চিত আমানতের বিপরীতে সুদ বা মুনাফার পরিমাণ কমছে। দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত মানুষ বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। তবে ব্যাংকের ওপর আস্থা হারালে চলবে না। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পপতিরা ব্যবসা করেন, তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। এজন্য ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা রেখে সঞ্চয়ের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ এবং উপার্জন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কথাও ভাবতে হবে। 

চলতি বছর বৈশ্বিক মন্দার সতর্কবাণী গত বছর থেকেই বলা হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত সংকট সেভাবে এসে হানা না দিলেও বেশকিছু সতর্কতার বিষয় উড়িয়ে দেয়া যায় না। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, মন্দা যদি এসেই যায়, তাহলে যেন আমরা কষ্ট করে হলেও টিকে থাকতে পারি সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। এ সময় অসংখ্য গুজব আসবে, এক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে সঠিক সংবাদটা যাচাই করতে হবে। সার্বিকভাবে জাতীয় একতা রক্ষার জন্য আগ্রহ থাকতে হবে। বিরোধী মত থাকবে, তবে সেটা যেন সংকট উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে সেটিই প্রত্যাশা। 

সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির হিসাব বোঝে না, তারা বোঝে নিজের উপার্জন দিয়ে দুই বেলা পেট পুরে খেতে পারাকে। এক্ষেত্রে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার্থে মুক্তবাজার অর্থনীতি ব্যক্তি মালিকানায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সুযোগ দিলেও সামর্থ্যবানদের সমাজের অসহায় মানুষের কথা ভাবতে হবে। সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে যেদিন আমরা ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের কথা ভাবতে পারব, সেদিনটাই হবে আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। আমাদের উচিত কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য এ প্রচেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখা।


তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক