২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) প্রোগ্রামের মাধ্যমে রেকর্ড সংখ্যক ৫ হাজার ৮৯১ জন ‘নিম্ন ও মাঝারি’ দক্ষ বাংলাদেশী কর্মী নিয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাদেশ থেকে আরো শ্রমিক নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ঢাকা সফররত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত জাং সুং মিন। যা বাংলাদেশের জনশক্তির জন্য ইতিবাচক বার্তা। দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার অনেক সংগঠিত। বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কোরিয়া একটি অধিক পছন্দের গন্তব্য, কারণ তারা কোরিয়ার আইনগত ন্যূনতম মজুরি লাভ করতে পারেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেমন সাফল্য পেয়েছে এবং সেখানে যাওয়া কর্মীরাও তেমন খুশি, সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের এখন এ বাজারের দিকে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।
বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী পাঠানো হয় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী। যে কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ সেখানে কর্মী পাঠায় তার নাম এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম বা ইপিএস। বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি জনশক্তি রফতানি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল ২০০৮ সাল থেকে ইপিএস কর্মসূচির আওতায় স্বল্প ব্যয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী পাঠাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ইপিএসের আওতায় নির্ধারিত ১৬টি দেশ থেকে কোরীয় ভাষা দক্ষতা ও স্কিল টেস্টের মাধ্যমে অদক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে। তবে কভিড মহামারীর কারণে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত সব ক’টি দেশ থেকে কর্মীদের কোরিয়ায় যাওয়া বন্ধ রেখেছিল। বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, কভিড পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির পর নির্ধারিত কভিডবিধি অনুসরণ করে গত বছরের ডিসেম্বর হতে আবার কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। কেউ দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী হিসেবে যাওয়ার জন্য সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তাদের চাকরি দেয়ার ক্ষমতা বোয়েসেলের নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো ক্ষুদ্র বা মাঝারি প্রতিষ্ঠান যখন তাদের প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে কর্মী এনে নিয়োগ দিতে চান, তখন তাদের সে দেশের শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। মন্ত্রণালয় তখন চাহিদা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেয়। বার্ষিক কোটা অনুযায়ী চাহিদার ভিত্তিতে তখন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে জব রোস্টার থেকে লেবার কন্ট্রাক্ট দেয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার চাকরিদাতা হলো সেখানকার ছোট ছোট বেসরকারি কোম্পানি। কোনো কোম্পানি কোনো কর্মীকে জব অফার প্রদান করলেই কেবল তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় চাকরি পান। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাষার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৬২ শতাংশ অদক্ষ, ৩৬ শতাংশ আধা দক্ষ ও ২ শতাংশ মাত্র অতিদক্ষ। যে কারণে এসব কর্মীর মজুরিও কম। তাই এ মানবসম্পদকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সব ধরনের টেকনিক্যাল বা কারিগরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ প্রদান পদ্ধতি তথা সার্টিফিকেট যেন লেবার রিসিভিং কান্ট্রিগুলো আস্থায় নেয়। তা না হলে উন্নত দেশগুলোয় ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তির বিপুল চাহিদা থাকলেও তারা বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের জনশক্তি নেবে না। তাই বিষয়টির প্রতি অধিকতর নজর দিয়ে এবং বিশ্ব চাহিদা ও মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোসহ প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি জাপানসহ ইউরোপের কিছু দেশে জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি কাজে লাগাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। সারা বিশ্বে এখন দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এ প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক অবস্থায় জনশক্তি রফতানি খাত ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে এক মহীরুহ। কিন্তু এ খাতের সম্ভাবনাকে এখনো পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিকল্পিতভাবে জনশক্তি রফতানি খাতের সমস্যা সমাধান এবং পেশাজীবী ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি তাদের পাঠানো অর্থ সঠিকভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিতে পারে। অভিবাসী কর্মীরা, বিশেষ করে স্বল্প দক্ষ কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিগ্রস্ত। অভিবাসী কর্মীরা স্বদেশ ও প্রবাসে শোষণ, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। এ বাস্তবতার নিরিখে রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা প্রদানে আইনি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ থেকে বহির্মুখী শ্রম অভিবাসন বৃদ্ধির অব্যাহত ধারার কারণে শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি বহির্গামী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিবাসী কর্মীদের নিপীড়ন ও তাদের নিয়োগ-চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সে বিবেচনায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অভিবাসীদের সুরক্ষা এ দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে ভবিষ্যৎ শ্রম অভিবাসনসংক্রান্ত নীতিমালা গ্রহণ ও কর্মসূচি পরিকল্পনা করার মূল চ্যালেঞ্জ।
করোনার কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান কমেছে। অথচ লাখ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ছিল। এতে দেশে বেকারের মিছিল দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সম্ভাব্য কোনো সুযোগকেই হাতছাড়া করা যাবে না। সর্বাগ্রে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বপ্রকার সিন্ডিকেটবাজি রহিত করতে হবে। সর্বাগ্রে যাতে বাংলাদেশ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে পারে তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পুরনো শ্রমবাজার তো আছেই, সেই সঙ্গে অনেক নতুন শ্রমবাজারও খুলছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, এমনকি চীনে পর্যন্ত জনশক্তি রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। ওদিকে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও বিদেশী জনশক্তির চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এসব নব্যসৃষ্ট শ্রমবাজার দ্রুত আমাদের ধরতে হবে। এজন্য যা কিছু করা দরকার, তা করতে হবে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য অভিবাসী কূটনীতি জোরদার করতে হবে। শুধু নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করলেই হবে না, একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষ শ্রমিক প্রেরণকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। আগামী দিনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শ্রম অভিবাসন খাতই হবে আমাদের অন্যতম এক হাতিয়ার। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে নিরাপদ অভিবাসন আর অভিবাসন কূটনীতিকে সমান্তরাল এগিয়ে নিতে হবে। বিশ্ব চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে।










