গুণগত ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাই পরবর্তী শিক্ষার মূল ভিত্তি। প্রাথমিক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সঠিক নির্দেশনা বা পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়তা করেন। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের আনন্দের সঙ্গে বিভিন্ন কলাকৌশল ব্যবহার করে সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, নিজেদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট নন প্রাথমিকের শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষার্থীরাও বঞ্চিত হচ্ছে ভালো শিক্ষা থেকে। প্রাথমিক ভালো শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে তাই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণীভিত্তিক পাঠদানের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণে এগিয়ে থাকলেও মানে যথেষ্ট পিছিয়ে। প্রাথমিকের ১১ বছরে বাংলাদেশের শিশুরা যা শেখে, তা অন্য দেশের শিশুরা শিখছে সাড়ে ছয় বছরে। তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের বাংলা পাঠের অবস্থা খুবই করুণ। তাদের ৬৫ শতাংশ বাংলা পড়তে পারে না। তৃতীয় শ্রেণীর ৩৫ শতাংশ শিশু কোনো রকম বাংলা পড়তে পারে। আবার পঞ্চম শ্রেণী পাস শিশুরা গণিতের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। মাত্র ২৫ ভাগ নিজ শ্রেণীর উপযোগী গণিতে সমাধান করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মসূচির অভাবে এ অবস্থা। এছাড়া নিম্নমানের শিক্ষা পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবের কারণেও মান বাড়ছে না। এসব বিষয় ‘লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ’ নামক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে। অবস্থা দু-একটি এলাকায় কিছু নতুন ও তরুণ শিক্ষক কিংবা শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন হলেও পুরো দেশের চিত্র কিন্তু খুব একটা পাল্টায়নি। শিক্ষার গুণগত মান নির্ভর করে শিক্ষকদের ওপর। সেই শিক্ষকদের মানই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শিক্ষার মান বাড়বে না। শিক্ষকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ না থাকলে শিক্ষার মান বাড়বে না। উপবৃত্তি, শিক্ষার জন্য খাদ্য, বিনামূল্যে বই দেয়াসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়াতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিশুর সার্বিক জ্ঞান ত্বরান্বিত হয়। গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষ বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন এবং আদর্শ অনুপাতে শ্রেণীকক্ষ ও শিক্ষকের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন কিনা তা ভেবে দেখা জরুরি। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমল তো বটেই, এমনকি দুই আড়াই দশক আগের তুলনায় শিক্ষায় বৈচিত্র্য এখন অনেক বেশি। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশের অভিভাবকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আরেকটি অংশের বাবা-মায়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেছেন। বাকি একটি অংশ আসছে এমন পরিবার থেকে যাদের বাবা-মা প্রাথমিক-পরবর্তী শিক্ষায় শিক্ষিত। বিভিন্ন আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে আসা ছাত্রছাত্রী যাতে শ্রেণীকক্ষে একটি সমধারা/অভিন্ন ধারার পরিবেশে জ্ঞানার্জন করতে পারে তা শিক্ষককে নিশ্চিত করতে হয়। শিক্ষক যাতে সেই ভূমিকা পালন করতে পারেন সেজন্য তার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতি যে বাড়তি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন তা সহায়ক শিক্ষকের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে। মানসম্মত শিক্ষাদানে শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। সরকারের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসহ (পিটিআই) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শিক্ষক প্রশিক্ষণে ভূমিকা পালন করছে সত্য, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্ভাবন চলছে তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ শিক্ষকদের কতটুকু? দেশে চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, গবেষণা ইত্যাদি পেশায় জড়িতদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের যে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য তা তৈরি হয়নি। আবার পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যার সুযোগ শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এ পেশায় আসতে আগ্রহ বোধ করছেন না। কাজের স্বীকৃতি যেকোনো পেশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ব্যক্তির পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে তা অনুপ্রেরণা জোগায়। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বছরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতির বিদ্যমান সরকারি ব্যবস্থাটিকে এজন্য আরো উদ্ভাবনমূলক ও প্রসারিত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরিতে ৫৫টি পিটিআইয়ের মাধ্যমে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যিনি যে বিষয় পড়াতে আগ্রহী হবেন তাকে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরিতে শিক্ষকদের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ এবং যেসব জেলায় এখনো পিটিআই গড়ে তোলা হয়নি, পার্শ্ববর্তী জেলায় (যেখানে পিটিআই রয়েছে) তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি অর্ধশত পিটিআই প্রশিক্ষককে (ইনস্ট্রাকটর) ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ইংরেজি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছে সরকার। যারা ইংরেজি পড়াতে আগ্রহী তাদের বাড়তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়ে পড়ানোর ওপর অভিজ্ঞ করে তুলবেন। এভাবে তিন ক্যাটাগরিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরি করা হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রশিক্ষণের পরও শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা না বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকলে দ্রুতই সেটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল, পাসের আধিক্য থাকলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষক দিয়ে সব শিক্ষা দান নিশ্চিত করা জরুরি। মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদান হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষার উপকরণ ও মানসম্মত পরিবেশ। শিক্ষক-শিক্ষিকারাই শিক্ষার্থীদের রোল মডেল। এ কারণে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। যোগ্যতা ও অবদান অনুযায়ী শিক্ষকদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তা না হলে যতই বেতন বৃদ্ধি বা কারিকুলাম বদল করা হোক, কোনো লাভ হবে না। গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের বেশকিছু অর্জন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হার যৌক্তিক পর্যায়ে চলে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের হার প্রায় শতভাগ। এসব কার্যক্রম সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছে। এখন প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক যথাযথ প্রশিক্ষণ।










