ঢাকায় ঘণ্টায় এক তালাক, দিনে ৩৯ তালাক। কথাগুলো শুনে আমাদের আক্কেলগুড়ুম। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত সাত বছরে তালাকের প্রবণতা ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। তালাক বা ডিভোর্স স্বাভাবিকভাবে নেতিবাচক বলেই এ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা থাকবে। কিন্তু কোন সেই কারণ, যা আমাদের দুর্গতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ নিয়ে বহু মতামত হাজির করা হয়। তবু ভেবেছি এ নিয়ে কিছু লেখা দরকার। বিভিন্ন মিডিয়ায় তুলে ধরা হয়, নারীদের পক্ষ থেকে ডিভোর্সের প্রধান কারণ হলো স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত। আর পুরুষদের পক্ষ থেকে ডিভোর্সের প্রধান কারণ স্বামীর অবাধ্য হওয়া, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা ও সন্তান না হওয়া। এই সাধারণ কারণগুলোর দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায় নারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগের পাল্লা পুরুষদের তুলনায় অনেক ভারী। সেদিক বিবেচনায় নারীদের পক্ষ থেকে ৭০ শতাংশ আর পুরুষদের পক্ষ থেকে ৩০ শতাংশ ডিভোর্সের যৌক্তিকতা উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রকৃতিগতভাবেই নারী পরিবারবান্ধব, সে কারণে এ চিত্র প্রাকৃতিক চরিত্রের অনেকটাই বিপরীতে অবস্থান করে। আবার এও দেখা যায়, শিক্ষিতদের মধ্যে এ হার অশিক্ষিতদের তুলনায় অনেক বেশি, আর্থিক অসচ্ছলদের তুলনায় সচ্ছলদের মধ্যে ডিভোর্সের হার আরো বেশি। এর মানে শিক্ষা আর অর্থসম্পদ দিয়ে সংসার টেকানো যাচ্ছে না। সে কারণেই এর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অতিজরুরি হয়ে পড়েছে। 

ডিভোর্সের মাত্রা বৃদ্ধির পেছনে যে কারণগুলো উঠে আসে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পুরুষতান্ত্রিকতা, নারীবাদী প্রবণতা, আধুনিকতা ও প্রযুক্তির বিশ্বায়ন। এর মানে একটা জটিলতার মধ্য দিয়ে মানুষের পারিবারিক জীবন চলছে। সহজ ভাষায়, জটিলতাই ডিভোর্সের মাত্রাকে বাড়িয়ে তুলছে। সেই আদিম অকৃত্রিম পরিবার ব্যবস্থা সহজেই চোখে পড়ে না। কোন সেই কারণ, যা পারিবারিক জীবনযাত্রাকে জটিল করেছে? আমার মনে হয়, বিয়ে বা পরিবার নামের প্রতিষ্ঠান গঠনের দুর্বল ভিত্তিই বিবাহবিচ্ছেদ বা পরিবার ভাঙনের অন্যতম কারণ।

বিয়ে বা পরিবার গঠনের ভিত্তি নিয়ে দুটো জনপ্রিয় তত্ত্ব রয়েছে। ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মতে, অর্থনীতিই পরিবার বা বিয়ে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ভিত্তি। এ তত্ত্বে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অবাধ যৌনাচার রহিত হয়ে যায়, গড়ে ওঠে স্থায়ী পরিবার ব্যবস্থা। আর এই পরিবার ব্যবস্থায় পুরুষতন্ত্র পেয়ে যায় শক্ত আসন, যাকে তিনি বলেছেন নারী জাতির ঐতিহাসিক পরাজয়। সম্পত্তির মালিকানাই যদি পরিবার ব্যবস্থার একমাত্র ভিত্তি হয়, তাহলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোই সবচেয়ে বেশি টেকসই হতো। অথচ আমরা দেখতে পাই যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের চেয়ে ওইসব পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে যায়, যাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ অনেক অনেক বেশি। বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধনী দেশ আমেরিকা, অথচ এ দেশে ডিভোর্সের হার ইউরোপ ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি (Davis ১৯৮৫, Lye ১৯৮৮)। আমাদের দেশে জিডিপি বাড়ছে, মানুষের আয় বাড়ছে, অথচ দুর্বল হয়ে পড়ছে পরিবার কাঠামো। অর্থনীতি যদি পরিবার কাঠামোর প্রধান ভিত্তি হয়, তাহলে কেন বহু সচ্ছল পরিবারের সম্পর্কগুলো বিবাহবিচ্ছেদে পরিণত হচ্ছে, যেখানে উল্টো হওয়ার কথা ছিল।

অন্যদিকে শারীরবৃত্তীয় তত্ত্ব থেকে বলা হয়, মানুষ যৌন চাহিদা পূরণের নিমিত্তে আর যৌন নিরাপত্তার খাতিরে পরিবার ব্যবস্থা চালু রাখে। যৌন নিরাপত্তাই যদি বিবাহ ও পরিবার প্রথার ভিত্তিমূল হয়, তাতে বিবাহবিচ্ছেদ এক স্বাভাবিক ব্যাপার হবে অনায়াসেই। ফ্রয়েডীয় ধারণা এই যে মানুষ যৌন কামনা-বাসনাপ্রবণ এমন এক জীব, যে কিনা ব্যক্তিক আনন্দ, বিনোদনে কাটাতে চায়, যে কিনা চায় শুধুই নিজের সুখ নিজের শান্তি; বরং সমাজের এমনকি ধর্মের আরোপিত বিধি-নিষেধ মানতে চায় না প্রবৃত্তিপ্রবণ এই মানুষেরা। মানুষ যদি নিজেকে শারীরবৃত্তীয় সত্তাই মনে করে, তাহলে সে কেমন করে পরিবার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখবে? শরীরই যদি তাকে পরিচালিত করে, সে কী করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে? এ কারণে বিয়ের আগে কামনাপ্রবণ প্রেম-সম্পর্ক আর বিয়ের পরে পরকীয়ায় আসক্তি—এসবই কামনার দুরন্তপনাকে ইঙ্গিত করে। এর মানে অর্থনীতি বা যৌনতা কোনোটাই বিয়ে বা পরিবার কাঠামোর ভিত্তি হতে পারে না।

কেউ কেউ বলছে, আধুনিকতাই ডিভোর্সের হার বৃদ্ধির অন্যতম খলনায়ক। প্রচলিত আধুনিকতাকে আমি চারটি উপাদানে বুঝতে চাই—এক. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (formal education) দুই. ব্যক্তিবাদ (individualism) তিন. পুঁজিবাদ (capitalism) চার. মিডিয়া প্রযুক্তি। পরিসংখ্যানে দেখতে পাই নারী ও পুরুষের মধ্যে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সনদ পেয়েছে, তাদের মধ্যে ডিভোর্সের হার অত্যধিক। কারণ তাদের শিক্ষা তাদের চাকরি দিয়েছে, কামনা-বাসনার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, অহংকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এই শিক্ষা পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শক্তিশালী এক পুঁজি, কিন্তু এটা এমন কোনো মূল্যবোধ শেখাতে পারেনি, যাতে মানুষ সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক উন্নত করতে পারবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিবাদ। নারী ও পুরুষ উভয়ই ব্যক্তিবাদী হয়ে উঠেছে চরম আকারে। হয়তো তাদের মধ্যে একসময় প্রেম ছিল, ভেবেছিল একজন ছাড়া আরেকজন বাঁচতেই পারবে না। অথচ পারিবারিক জীবনে আয় উপার্জন বাড়ানো আর ক্যারিয়ারমুখিতা এতই প্রকট হয় যে তাদের দুজনের আগের সেই প্রেম দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। পারিবারিক সম্পর্কে পুরুষের মাঝে কাজ করে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, নারীর মধ্যে কাজ করে সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে স্বাধীন হওয়ার প্রবণতা। এই দুই প্রবণতার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলেই তারা তাদের প্রেমকে ভুলে যায়, ভুলে যায় একে অন্যের প্রতি দায়িত্বশীলতা, কমে যায় নিজ সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

দুর্বল সম্পর্ককে আরো দুর্বল করতে হাজির হয় আধুনিকতার আরেক শক্তি ‘মিডিয়া প্রযুক্তি’, আমরা একে বলতে পারি ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। ইন্টারনেট স্মার্টফোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মা-বাবা ও সন্তানদের জীবনের ওপর এত বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় যে যেন স্মার্টফোন পুরো পরিবারের কর্তা। স্মার্টফোনের কর্তৃত্ব এমনই প্রবল হতে শুরু করে, প্রত্যেকে নিজেকে উড়াল পাখির মতো স্বাধীন মনে করে। ক্যাসেলস এ কারণে এর নাম দিয়েছেন স্বাধীনতার প্রযুক্তি। এই স্বাধীনতা এমনই উদ্ভ্রান্ত যে দ্রুততার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ানো সহজ হয়ে গেছে। পরকীয়ায় জড়ানোর চেষ্টা অথবা স্বাভাবিক আলাপচারিতা দাম্পত্য জীবনে একে অন্যের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয়। এদের প্রেম সম্পর্ক এতই দুর্বল যে সন্দেহ-ভুল বোঝাবুঝি আর কলহ নিত্যদিনের সাথী হয়ে যায়। বিয়ের আগে বলছিল, ‘সুখের সাগরে ঢেউ খেলে চলো দুজনে এক সাথে ভেসে যাই’, অথচ দাম্পত্য জীবন তাদের কাছে যেন কণ্টকাকীর্ণ বিছানা, সাগরে তারা আর আগের মতো ভাসে না, ডুবে যেতে চলছে তাদের প্রেম, তাদের সম্পর্ক। এর স্বাভাবিক দায় প্রযুক্তিকে দেয়া হলেও মূল কারণ সম্পর্কের ভিত্তিমূল। উলরিচ বেক (১৯৯৫) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘the common ground is exclusively emotional’। সত্যিকার অর্থে চলমান ‘আবেগসূচক প্রেম’ (বেক, ১৯৯৫), আত্মতৃপ্তির অনুসন্ধান (ডেজলার, ১৯৮০), ব্যক্তিগত সুবিধার তাড়না (সুইডলার, ১৯৮০) মানুষের দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

অথচ এসবই ব্যক্তিবাদের চেতনা থেকে এসেছে। ব্যক্তিবাদের এই চেতনায় মানুষ হারিয়ে ফেলে দায়িত্বশীলতার অনুভূতি, আসক্ত হয় পরকীয়ায়, ক্যারিয়ারের মাঝে মর্যাদা খুঁজে, আর হোটেল-বারে আনাগোনা বাড়তে থাকে। পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সুযোগ-সুবিধা উন্মুুক্ত করে দিয়েছে। চরিত্রের সীমা লঙ্ঘন করা, পরিবারের প্রতি উদাসীন থাকা, সন্তানকে চাইল্ড কেয়ারে দিয়ে ফুর্তি-মাস্তিতে সময় কাটানো মানে এদের কাছে আধুনিকতা। আধুনিকতার অর্থ যদি সর্বজনীনতা হয়, এর অর্থ মানবিকতা হয়; তাহলে বলতেই হবে প্রচলিত আধুনিকতা মানুষকে ক্যারিয়ারমুখী করেছে, স্বাধীনতার পুঁজিবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছে, অথচ পরিবার ও বিয়ে নামক জাতি গঠনের ভিত্তিকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এর চেয়ে বড় অমানবিকতা আর কী আছে?

প্রকৃত আধুনিকতা এখনো আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমরা যদি আমাদের আত্মপরিচয়ের সন্ধান না পাই, আমরা যদি বুঝতে না পারি আমাদের জীবনীশক্তির শিকড়; আমরা হতে থাকব উদাসীন, আবেগসর্বস্ব প্রেমিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও কামনাপ্রবণ। ফলে ভেঙে পড়ছে পরিবার কাঠামো। পরিবার আসলেই দায়িত্বপালনের সেন্টার, ভালোবাসা আর মমতার উত্তম স্থান। সততা, দায়িত্বশীলতা আর ত্যাগের মধ্য দিয়েই আমরা বিয়ে ও পরিবারের শক্ত ভিত দাঁড় করাতে পারব। আয় উপার্জন আর যৌনতা হলো পরিবার ব্যবস্থা সক্রিয় রাখার উপায় মাত্র। আমাদের খুঁজতে হবে এই ভিত্তিমূলের উৎস কোথায়?

 

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়