২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু গত চার বছরে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম একেবারেই ‘বাত কা বাতে’ পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে যে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচ বছর বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের বিশ্ব র‍্যাকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা অর্জন করেছিল। ওই পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম বছর ক্ষমতাসীন ছিল আওয়ামী লীগ, পরের চার বছর ক্ষমতাসীন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। এরপর সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসনামলে লে. জেনারেল হাসান মাসউদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মতিনের নেতৃত্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন দুর্নীতি দমন কমিটির মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমননীতি বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশ ওই ‘ন্যক্কারজনক চ্যাম্পিয়নশিপ’ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে ‘নখদন্তহীন ব্যাঘ্রে’ পরিণত করা হয়। দুর্নীতি দমনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুদককে স্বাধীনতা দিয়ে যে অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল সেটাকে সংসদে পাস না করায় ওটা তামাদি হয়ে যায়। এর স্থলে মহাজোটের শাসনামলে পরবর্তী সময়ে যে দুদক আইন পাস করা হয় তাতে দুদককে অনেকটাই দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। ফলে আবার দেশে দুর্নীতির তাণ্ডব পুরোদমে চালু হয়ে যায়। ২০১৪ সাল থেকে নয় বছর ধরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা অর্জন করে চলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের বিশ্ব র‍্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১২ নম্বর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ণীত হয়েছে। 

দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বরাত দিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে শুধু হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বর্তমানে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আমদানির ওভার ইনভয়েসিং, রফতানির আন্ডার ইনভয়েসিং এবং রফতানি আয় দেশে ফেরত না আনার মতো মূল সমস্যাগুলো যোগ করলে দেখা যাবে, প্রতি বছর এখন কমপক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এর মানে বাংলাদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলার পুঁজি এখন বিদেশে পাচার হয়ে চলেছে (অথবা বিদেশে হুন্ডিওয়ালাদের কাছে বিক্রীত ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না, কিন্তু তার সমপরিমাণ টাকা হুন্ডিওয়ালাদের প্রদানের মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশে হুন্ডি প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে), যার অর্ধেকের মতো পাচার হচ্ছে হুন্ডি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে টালমাটাল অবস্থায় পৌঁছে গেছে সেটার জন্য প্রধানত দায়ী পুঁজি পাচার প্রক্রিয়া। পুঁজি পাচারের চাহিদার প্রধান গ্রাহক হলো দুর্নীতিবাজ আমলা, প্রকৌশলী, সামরিক অফিসার, লুটেরা রাজনীতিবিদ  ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকঋণ গ্রহীতারা। হুন্ডি প্রক্রিয়ায় যে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার দাবি করছে সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) তার সিংহভাগ পাচারকারী ওপরে উল্লিখিত গোষ্ঠিগুলো।

২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল এলএনজি ও তেলসহ পেট্রোলিয়াম পণ্য, ভোজ্যতেল, চিনি, গম ও সারের নাটকীয় আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি। একই সঙ্গে আমদানি এলসি ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পুঁজি পাচারও এর জন্য দায়ী ছিল। সরকার ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করায় গত পাঁচ মাসে এলসি খোলার হার প্রায় ৯ শতাংশ কমে এসেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ‘এলসি ওভার ইনভয়েসিং মনিটরিং’ ব্যবস্থা জোরদার করায় ওভার ইনভয়েসিংও খানিকটা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সরকার যদি এ পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও পুঁজি পাচারের অন্যান্য পদ্ধতির বিরুদ্ধে কঠোর দমন কার্যক্রম শুরু করে তাহলে অতিদ্রুত বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যালান্স অব পেমেন্টসের সংকট নিরসনের পথে এগিয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এরই মধ্যে আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার বাংলাদেশ পেয়ে গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনকে শ্লথ করবে। আর এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ করার মতো কঠোর দমন ব্যবস্থা নিলে আগামী মাসগুলোয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে শুরু করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ডলারের দামের সঙ্গে কার্ব মার্কেটের ডলারের দামের পার্থক্য ৭-৮ টাকায় স্থির থাকা হুন্ডি ব্যবসার রমরমা অবস্থা ঘটাচ্ছে, যার প্রধান কারণ হুন্ডি প্রক্রিয়ায় বিদেশে পুঁজি পাচারের চাহিদার ক্রমবর্ধমান ব্যাপক উল্লম্ফন। অতএব এ ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কমিয়ে আনতে না পারলে এই দুটো দামের পার্থক্যকে কমিয়ে আনা যাবে না। শুধু আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দামকে বাজারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করার জন্য ক্রমান্বয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সুফল পাওয়া যাবে না। হুন্ডি-ডলারের চাহিদা এত বেশি শক্তিশালী থাকলে কার্ব মার্কেটেও ডলারের দাম ক্রমেই বাড়িয়ে ডলারের দুটো দামের পার্থক্য হুন্ডিওয়ালারা ৭-৮ টাকায় রেখে দেবে। সেজন্যই বলছি, হুন্ডি ডলারের চাহিদাকে দমন করতে চাইলে দুর্নীতি দমনকে সত্যিকারভাবে শক্তিশালী করার প্রয়োজন হবে।

অতএব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে ‘বাত কা বাত’ বানিয়ে রেখে পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার সমস্যার সমাধান পাওয়া অসম্ভব। অবশ্য এটাও বলা প্রয়োজন, যদি সত্যিকারভাবে দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন এবং পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্যভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয় তাহলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তার জন্য এককভাবে দায়ী ছিল ওই সরকারের সফল দুর্নীতি দমন অভিযান। মানুষের কাছে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের জন্য চিহ্নিত হোমরা-চোমরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ওই সময় যেভাবে নাকানি-চুবানি খেতে হয়েছিল সেটা এখনো আমরা ভুলে যাইনি, আওয়ামী লীগের নেতাদেরও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। (২০০৭ সালের ২০ আগস্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল)। ওই ধরনের আরেকটি অভিযান যদি প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে শুরু করেন তাহলে তার নেতৃত্বে অর্জিত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাস্তবায়িত মেগা প্রজেক্টগুলোর সুফল তিনি আগামী নির্বাচনে ঘরে তুলতে সক্ষম হবেন।


ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়