দেশে মাটির উর্বরতাশক্তি ক্রমেই কমছে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে ভুগছে কৃষিজমি। বাড়ছে অনুর্বর হয়ে পড়া জমির পরিমাণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, ২০০০ সালে দেশে উর্বরতা ঘাটতিতে থাকা জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর। ২০২০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ হেক্টরে। জমির অনুর্বরতা যেভাবে বাড়ছে, তা আশঙ্কাজনক। এর পেছনে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারকে দায়ী করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার বন্ধে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। 

পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ১৯৭২ সালে এর পরিমাণ (প্রধানত চাল-গম) ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। বর্তমানে তা প্রায় ৪০ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে, জমির অনুর্বরতা বৃদ্ধির বিষয়টি। দিন যত যাচ্ছে, দেশের কৃষিজমির উর্বরতাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এর পেছনে নানা ফ্যাক্টর দায়ী। সময়ান্তরে নগরায়ণের প্রসার ঘটেছে। বিক্ষিপ্ত, অগোছালো ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে ইটভাটারও সমান্তরাল বৃদ্ধি হয়েছে। ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। শিল্পায়নসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। জমির উর্বরতাশক্তিতে অবদান রাখা নানা উদ্ভিদ, লতা-গুল্ম উজাড় করা হচ্ছে নির্বিচারে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। এতেও মাটির গুণগতমান ও উর্বরতায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত চাষাবাদ এবং উৎপাদন বাড়াতে কৃষক অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর। ফলে মাটির পুষ্টি উপাদানে তৈরি হচ্ছে ভারসাম্যহীনতা। সব মিলিয়ে কমছে কৃষিজমির উর্বরতাশক্তি।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার, প্রেসিশন এগ্রিকালচারের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এ ধরনের চৌকস কৃষিতে নিরাপদ ও দক্ষ মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বে কর্ষণযন্ত্রের সঙ্গে সেন্সর যুক্ত করে পানির চাহিদাসহ মৃত্তিকা স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যেসব দেশে জমির অভাব নেই, তারাও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অত্যন্ত যত্নশীল হচ্ছে। জমিতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় জৈব পদার্থ ও পুষ্টি উপাদানগুলো আছে কিনা, তা নিয়মিত পরীক্ষা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করে কীভাবে মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা যায়, সে বিষয়ে সেখানে রয়েছে বিশদ নির্দেশনা। সময়ে সময়ে হালনাগাদ চর্চাগুলো অভিযোজনে কৃষককে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। বলতে গেলে নানামুখী পদক্ষেপে দেশগুলো মাটির উর্বরতাশক্তি ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।

সন্দেহ নেই, বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য জোগানো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেজন্য স্বল্প জমিতে কীভাবে অধিক ফসল ফলানো যায়, সেদিকে বরারবই নজর ছিল নীতিনির্ধারকদের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের প্রসার ঘটানো হয়েছে। নির্বিচারে প্রয়োগ করা হয়েছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। এতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও খাদ্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব হয়েছে, হচ্ছে। বাড়ছে ধানসহ নানা ফসলের উৎপাদন। এটা নিঃসন্দেহে বড় ধরেনের সাফল্য। কিন্তু বেশি উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষক যে অতিমাত্রায় রাসায়িক সার ও কীটনাশকে ঝুঁকে পড়ছেন, তাতে বহুমাত্রিক ক্ষতি হচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা শক্তি তো কমছেই, উপরন্তু পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কাজেই প্রাণ-প্রকৃতির স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতে এখন একটা প্যারাডাইম শিফট সময়ের দাবি। 

কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাটির উর্বরতা অক্ষুণ্ন রাখতে সুনির্দিষ্ট মাত্রার জৈব পদার্থের উপস্থিতি প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে এক্ষেত্রে ক্রমেই অবনতি ঘটছে। মানদণ্ড অনুযায়ী মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ৫ শতাংশ হলে সে মাটি সবচেয়ে ভালো বলে বিবেচিত। ন্যূনতম ২ শতাংশ থাকলে সেটিকে ধরা হয় মোটামুটি মানের। কিন্তু দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখন গড়ে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বড় কথা হলো, মোট জমির প্রায় ৭৯ শতাংশে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। এটা উদ্বেগজনক তথ্য। তাই মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের আরো সচেষ্ট হওয়ার সময় এসেছে। মাটির উর্বরতাশক্তি ধরে রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফসলের ধরন পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ফসলের ধরন পরিবর্তনের নানামুখী উপকারিতা বিদ্যমান। এটি জমির আগাছা দমনে সহায়ক, পোকামাকড়ের আক্রমণ কমায়, ফসলের রোগবালাই কম হয়, সর্বোপরি ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। একইভাবে লিগিউম ফসল আবাদ করলে এটি বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ করে, মাটির জৈব উপাদানের পরিমাণ ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির অভ্যন্তরীণ পুষ্টিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে। এতে মাটির উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য শস্যবৈচিত্র্য সব জায়গায় এখনো সমানভাবে হয়নি। কৃষিজমি ব্যবহার ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা না গেলে চরম সংকটে পড়তে পারে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশ। ভালো হয় কৃষক পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে মাটি পরীক্ষার কিটের ব্যবস্থা, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষক তাদের মাটি পরীক্ষা এবং সুষমভাবে সার প্রয়োগ করতে পারেন। এজন্য কিট ব্যবহার বিষয়ে কৃষকের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মাটি পরীক্ষার কিট উদ্ভাবন করেছে। এটাকে কৃষকের জন্য সহজলভ্য করে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

এখন চলছে বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য এসডিজির বাস্তবায়ন। এসডিজির কয়েকটি লক্ষ্য অর্জন লাগসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কাজেই এসব লক্ষ্য অর্জনে উত্তম মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ক্রপ জোনিং, ক্রপ প্ল্যানিং, সয়েল প্ল্যানিং করতে হবে। ইটভাটায় উপরের মাটি ব্যবহার রোধ করতে হবে। মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে সুষম রাসায়নিক সার প্রয়োগ জৈবসারের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এক্ষেত্রে অনেক কৃষকেরই সচেতনতা ঘাটতি রয়ে গেছে। তাদের সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতেও বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। রাসায়নিক সার উৎপাদনে বিপুল বিনিয়োগে বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হলেও জৈব সার উৎপাদন ও বিপণনের তেমন  কাঠামো নেই। বিচ্ছিন্ন কিছু কোম্পানি জৈব সার উৎপাদনে যুক্ত হলেও তাদের সক্ষমতা সীমিত। এ ধরনের সক্ষমতা বাড়াতে দরকার সরকারের নীতি সমর্থন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে কৃষিজমির উর্বরতাশক্তি যেভাবে কমছে, তা ভীতিপ্রদ। এমনটা হলে দেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপক হারে হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই মাটির উর্বরতাশক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সুপারিশকৃত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সে অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাও জরুরি।