কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীদের বিনামূল্যে ইনসুলিন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের উচ্চপ্রকোপ রয়েছে এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দশম অবস্থানে রয়েছে। দেশে তিন কোটিরও বেশি ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে, যাদের আবার ৯৭ শতাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। চিকিৎসকদের মতে, এই ৯৭ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‌কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ৩০ ধরনের ওষুধ বিনাপয়সায় মানুষকে দেয়া হয়। এর সঙ্গে দেশের ডায়াবেটিস রোগীদেরও বিনামূল্যে ইনসুলিন দেয়া হবে। এ রোগ থেকে মানুষ যাতে মুক্তি পায় সে ব্যবস্থাই নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারের পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, অন্ধত্ব, কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, পা হারানো ইত্যাদির মতো গুরুতর সমস্যার প্রধান কারণ ডায়াবেটিস। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ ডায়াবেটিস নির্ণয় ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন; যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য গুরুতর বিপদের কারণ হতে পারে। 

মূলত ইনসুলিন নেয়ার মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার কথা ভেবেই অনেক রোগী ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে ভয় পান। অথচ সময়মতো চিকিৎসা না করালে এ রোগ খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। আর ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষেরই যেহেতু ডায়াবেটিস হচ্ছে, তাই এ রোগের চিকিৎসা যেন সর্বজনীন হয় সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করতে হবে। 

সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিক নিঃসন্দেহে সরকারের একটি দূরদর্শী উদ্যোগ। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানের সহজলভ্যতা যেখানে অনিশ্চিত ছিল, সেখানে এ উদ্যোগ ‘গরিবের হাসপাতাল’-এ পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ১৩ হাজার ৭০৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সারা দেশের প্রান্তিক জনগণের স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবাসহ বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী দেয়া হচ্ছে। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা থাকে। কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য ২০০৯ সালের জুলাইয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প শেষ হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। এরপর ২০১৮ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে এ কমিউনিটি ক্লিনিক চলছে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের আওতায়।

মুদ্রার এক পিঠের মতো এ ইতিবাচক দিকগুলো পরিলক্ষিত হলেও মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় সেবা মিললেও ওষুধ না পাওয়ার ভোগান্তি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণা বলছে, সেবার মান বাড়ার পরও দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ৯৩ শতাংশ রোগী কোনো ওষুধ পায় না। প্রায় ৮৫ শতাংশ রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে ছুটতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে। এছাড়া এসব রোগীকে ওষুধের ৬৪ শতাংশ ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হয়। এ গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, গ্রাম পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথাযথ কার্যকর নয়। শহর এলাকায়ও পর্যাপ্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নেই। এ কারণে রোগীরা চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। এছাড়া সারা দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় দৈনিক চার লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছে। এসব ক্লিনিকে ২৭ ধরনের দরকারি ওষুধ বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও এগুলোর বেশির ভাগই পাওয়া যায় না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিকের সাফল্য অনেক বেশি। একই সঙ্গে সব ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করতে পারলে সেবার মান আরো বাড়বে।

সরকারি হিসাবমতে, সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় দৈনিক গড়ে ৩০ জন স্বাস্থ্যসেবা নেয়। সেবাপ্রাপ্তিতে অসন্তোষের পরও বর্তমানে আরো ১৪৬টি ক্লিনিক চালুর অপেক্ষায় আছে। এসব ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা ও 

স্বাস্থ্যশিক্ষার পাশাপাশি পুষ্টিশিক্ষা দেয়া হয়। বয়স্ক, কিশোর-কিশোরী ও প্রতিবন্ধীদের লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু ক্লিনিকগুলোয় চাহিদার তুলনায় ওষুধ সরবরাহ অনেক কম। ওষুধ আসার কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে প্রায় সময় ক্লিনিকে নেই এমন ওষুধ চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে লেখেন। ফলে ক্লিনিকের পাশাপাশি বাইরের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হয় রোগীদের। 

বস্তুত স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, এর মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সেবা এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে। তবে এখনো এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এসব ক্লিনিকে সেবা নেয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে বেড়েছে। অথচ সক্ষমতা তেমন বাড়েনি। তাই প্রায়ই ওষুধের ঘাটতির খবর শুনতে হয়। কিছু ভিটামিন ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ছাড়া অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকে অন্য ওষুধ মেলে না। এ অবস্থায় ডায়াবেটিসের মতো রোগ যেটি দিনে দিনে বাড়ছে, রোগটির প্রতিষেধক হিসেবে ইনসুলিনের সহজপ্রাপ্যতা যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে বিনামূল্যে ইনসুলিন প্রদানের উদ্যোগ ব্যাহত হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আশাবাদী হতে চাই। দেশের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হোক—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকলে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা অধরাই থেকে যাবে। অবশ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ওষুধের ঘাটতি নিরসনে দুটি উপায়ের কথা বলেন। প্রথমত, ওষুধের ওপর চাপ কমাতে জনগণকে স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ও যথেচ্ছ ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কিছু হলেই ওষুধ দরকার—এমন মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অহেতুক ওষুধের ব্যবহার বন্ধে চিকিৎসকেরও সচেতন হতে হবে। কিন্তু এটি আপাতদৃষ্টিতে পরিপূর্ণ সমাধান নয়, বিশেষ করে ডায়াবেটিস আক্রান্ত যাদের ইনসুলিন নিতে হয় তাদের জন্য পর্যাপ্ত ইনসুলিনের ব্যবস্থা করতে না পারলে কমিউনিটি ক্লিনিকের এ উদ্যোগ ব্যাহত হবে। আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি। এজন্য ক্লিনিকগুলোয় বর্তমানে যে ওষুধগুলো বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে ইনসুলিনের সহজপ্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।