কি রাজনৈতিক কি অর্থনৈতিক—কোনো ক্ষেত্রেই ভালো খবর নেই। কিছুদিন ধরে শুনছি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের খবর এবং এর সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নানা দুঃসংবাদ। যুদ্ধ এবং অর্থনীতির খারাপ সংবাদের পাশাপাশি ‘সার্ক’ অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে খারাপ সংবাদ। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত বাদে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। এর মধ্যে বড় অনিশ্চয়তা চলছে শ্রীলংকায়, তার পরেই পাকিস্তান। মালদ্বীপের সংকট আছে, সংকট আছে নেপালেও। আফগানিস্তান তো রীতিমতো জ্বলছে। সবকিছু ভালো, হঠাৎ এ অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কেন? প্রথমেই ধরা যাক আমাদের প্রতিবেশী ও সার্কের অন্যতম সদস্য পাকিস্তানের কথা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক ক্রিকেটার ও লড়াকু রাজনীতিবিদ পদত্যাগ করে প্রেসিডেন্টকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বিরোধী দলগুলো এ পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে।

পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অধিবেশন বসার পর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিরোধীদের আনা অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান ইমরান খান। বিরোধী জোটের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে সোমবার জাতীয় পরিষদে ১৭৪ ভোট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন শাহবাজ শরিফ। অথচ জানি মোটামুটি একটা জনপ্রিয়তা ও সেনাবাহিনীর পরোক্ষ সমর্থনে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হন একটা জোট গঠন করে। তিনি পাকিস্তানিদের ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার আহ্বান জানান, দুর্নীতি বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরে নয়া পাকিস্তানের কোনো সুফল কি পাকিস্তানিরা পেয়েছে? নাকি দুর্নীতি বন্ধে কোনো অগ্রগতি দেখছে? না, এসব শুধু মুখের কথাই রয়ে গেছে। বরং ইমরান খানের আমলে অর্থনীতির বারোটা বেজেছে। তার একের পর এক ভুল পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তানিদের নাভিশ্বাস উঠেছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নিয়েছে রাজনৈতিক সংকটের। দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে ইমরান খান ক্ষমতায় আসার আগে ২০ বছর ক্রমাগতভাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে ইমরান খানের আমলে পাকিস্তানিদের মাথাপিছু আয় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে। তিনি দফায় দফায় সৌদি আরব, চীন ও আইএমএফ থেকে বেশ পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিপদে পড়েছেন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে আবার আইএমএফের কাছে হাত পেতেছেন। কিন্তু আইএমএফ নানা শর্ত জুড়ে দিচ্ছে এবং সর্বশেষ তারা বলেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা। এরই মধ্যে পাকিস্তান পড়েছে ব্যালান্স অব পেমেন্ট সমস্যায়। আমদানি বেশি রফতানি কম; কম রেমিট্যান্সও। আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণ। জিডিপি বৃদ্ধির পরিমাণ ২০২১ সালে ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। শেয়ারবাজার সাড়ে তিন বছর আগে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। চিনি, আটা ইত্যাদি খাদ্যপণ্যে মাত্রাতিরিক্ত ভর্তুকি দেয়ার ফলে সরকারের খরচ বেড়েছে কিন্তু আয় সেভাবে বাড়েনি। জ্বালানি তেলে পাকিস্তান বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ১২ শতাংশে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ এবং তারা ইমরান সরকারের ওপর বীতশ্রদ্ধ। পাকিস্তানের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৭ দশমিক ২ শতাংশ বা যেকোনো হিসাবে মাত্রাতিরিক্ত। বড় বড় প্রকল্পে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। চীনা ঋণও এখন আর সহজলভ্য নয়। এদিকে কৃষি উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশের মতো হ্রাস পেয়েছে প্রধানত তুলা উৎপাদন হ্রাসের কারণে। অতিরিক্ত আমদানির ফলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা মোটামুটি তিন মাসের আমদানির সমান। এদিকে সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে। আর ১ ডলারের দাম এখন ১৮০-১৯০ রুপি, যা সাড়ে তিন বছর আগে ছিল ১১০ রুপির মতো। ডলার পাচার হচ্ছে আফগানিস্তানে—এ সংবাদ এখন চাউর হচ্ছে। আফগানিস্তান এখন পাকিস্তানের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। একনায়কসুলভ নেতৃত্বের সমস্যা তো রয়েছেই, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে এখন পাকিস্তান।

যদি আমরা শ্রীলংকার দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল। বলা বাহুল্য, এ রাজনৈতিক সংকটও সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট থেকে। বেশ কয়েক দিন ধরেই শ্রীলংকার মানুষ, কলম্বোর মানুষ রাস্তায়। তারা বর্তমান সরকারের বিদায় চায়। তেল ও ডিজেল নেই। বিদ্যুৎ ও গ্যাস নেই। খাদ্যাভাবে মানুষের মধ্যে হাহাকার, পানীয় জল নেই। কাগজের অভাবে সরকার ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা পর্যন্ত নিতে পারেনি। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে বিদেশে অবস্থিত অনেক দূতাবাস শ্রীলংকার সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের প্রতিরোধের মুখে তা তুলে নিয়েছে। কারফিউ জারি করেছে। সরকারের অর্থমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। নতুন নিয়োজিত অর্থমন্ত্রীও একদিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন। সরকারের হাতে খাদ্য, ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, তেল-গ্যাস আমদানির মতো কোনো অর্থ নেই। শ্রীলংকার ঘনিষ্ঠ চীন এ দুুর্দিনে কোনো সাহায্য দিতে এগিয়ে আসছে না। ভারত এ পর্যন্ত আড়াই মিলিয়ন ডলারের সাহায্য এবং লাইন অব ক্রেডিট দিয়েছে। তেল, গম, ওষুধ এবং জরুরি দ্রব্যাদি ভারত জরুরি ভিত্তিতে শ্রীলংকায় পাঠাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে জনগণের দাবির প্রতি কোনো তোয়াক্কা না করে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এখনো ক্ষমতাসীন। তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। প্রেসিডেন্টের নিজ দলের পার্লামেন্ট সদস্যদের অনেকেই পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে বসছেন। বিরোধী দলগুলো একাট্টা হয়ে তাদের পদত্যাগ দাবি করেছে। সংক্ষেপে এই যে পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করলাম, তা কি একদিনে সৃষ্টি হয়েছে? কী কী ভুল পদক্ষেপের ফলে শ্রীলংকার আজ এই দশা? আমাদের অঞ্চলে শ্রীলংকা ছিল আদর্শ স্থানীয় দেশ। তারা তৈরি পোশাক খাতের জন্মদাতা। শিক্ষিতের হার শতভাগ। পর্যটকদের বিরাট আকর্ষণ শ্রীলংকা। প্রচুরসংখ্যক শ্রীলংকাবাসী দেশে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠায়। তবে কেন এ সুন্দর দেশটি আজ এ অবস্থার মধ্যে পড়ল? আমার ধারণা শ্রীলংকার সমস্যা শুরু বহু আগে থেকেই। ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকা স্বাধীনতা লাভ করে। নেতা এস ডব্লিউ আর ডি বন্দর নায়েকের নেতৃত্বে সিংহলি ও তামিল জনগণ আন্দোলন করে শ্রীলংকার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগণের মন রক্ষার্থে বন্দর নায়েক তামিল জনগণের প্রতি বৈষম্য শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার আগে শ্রীলংকার সমাজ ও অর্থনীতিতে তামিলরা ছিল অগ্রণী সম্প্রদায়। এরা ১৫০ বছরের ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের তামিলনাড়ু থেকে শ্রীলংকায় যায়। সংখ্যায় মাত্র ১৫-১৮ শতাংশ। কঠোর শ্রম ও মেধার বলে তারা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করার নীতি গৃহীত হয়। প্রথমেই যে কাজটি করা হয়, তা হচ্ছে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি। নয় লাখ তামিলকে শ্রীলংকা নাগরিকত্ব দেয়নি স্বাধীনতা উত্তরকালে (১৯৪৯-৫০)। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে ইংরেজির বদলে সিংহলি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি। এতে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তামিলরা। তারা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। একই সঙ্গে চাকরিবাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্র থেকে তারা অপসারিত হতে শুরু করে। এ রাজনৈতিক অসন্তোষ ও তামিল ক্ষোভের মধ্যেই শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট এস ডব্লিউ আরডি বন্দর নায়েক নিহত হন ১৯৫৯ সালে। বন্দর নায়েকের স্থলাভিষিক্ত হলেন তার স্ত্রী মাভো বন্দর নায়েকে। তামিল সমস্যার সমাধান তখনো হয়নি। তামিলরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়। গড়ে তোলে এলটিটিই, যারা জনযুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের ন্যায্য অধিকার স্থাপন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান নেয়। কিন্তু শাসককুল ও উগ্র জাতীয়তাবাদীরা তামিলদের কোনো দাবিই মানেনি। এ প্রেক্ষাপটে নিহত হন প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধনে। এলটিটিই ভি প্রভাকরণের নেতৃত্বে এক দুর্ধর্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয় শ্রীলংকার সেনাবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে। এ গৃহযুদ্ধ চলে প্রায় তিন দশক ধরে। অবশেষে মাহিন্দা রাজাপাকসে যখন প্রেসিডেন্ট তখন তিনি শক্ত হাতে ‘গৃহযুদ্ধ’ দমন করেন। এতে দু-তিন লাখ তামিল প্রাণ হারায় এবং বহু তামিল হয় গৃহহারা। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কাছে মাহিন্দা রাজাপাকসে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। অনেকে মনে করেন, তার এ অতিরিক্ত জনপ্রিয়তাই আজকের অর্থনৈতিক সংকটের মূলে। তার জনপ্রিয়তার শক্তিতে তিনি হয়ে ওঠেন একনায়ক। সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে থাকেন এককভাবে। গত নির্বাচনে অঙ্গীকার করেন তিনি গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স অর্ধেকে নামিয়ে আনবেন, আয়করের নিম্নতম সীমা বৃদ্ধি করবেন। যথারীতি তিনি ‘বিএমটি’ ১৮ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনেন। আগে ৫ লাখ টাকা আয় হলেই আয়কর দিতে হতো। তিনি এ সীমা করলেন ৩০ লাখ। এর ফল হলো রাজস্ব হ্রাস ৩৩ শতাংশ। আয়কর হ্রাস পেল জিডিপির ২ শতাংশ। রাজস্ব হ্রাস কিন্তু রাজস্ব ব্যয় বাড়ল, ভর্তুকির খরচ বাড়ল। এতে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশ। আরেক হঠকারী সিদ্ধান্ত হলো অর্গানিক ফুডসংক্রান্ত। অর্গানিক ফুডের প্রয়োজনে সরকার জৈব সারের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। হঠাৎ এ সিদ্ধান্তের ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৩০ শতাংশ। খাদ্য সংকট দেখা দেয়। কালোবাজারি, খাদ্য মজুদকরণের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। সরকার প্রশাসনিকভাবে তা বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়। নিয়োগ করে এক জেনারেলকে, যিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি শুরু করেন। ফল হয় উল্টো। বাজার হয় বিপর্যস্ত। এদিকে বিদেশী ঋণ নিয়ে শুরু হয় আরেক বিপদ। শ্রীলংকার এ মুহূর্তে বিদেশী ঋণ প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীনা ঋণ ১০ শতাংশের। বড় বড় চীনা ঋণ নিয়ে সরকার গড়তে শুরু করে নানা ধরনের বড় বড় অবকাঠামো, নৌ-সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, স্মার্ট সিটি ইত্যাদি। শুরু হয় বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। শ্রীলংকার মুদ্রার ঘটে অবমূল্যায়ন। ১ ডলার পাওয়া যেত ১৯০ শ্রীলংকা রুপি দিয়ে। তা বাড়তে বাড়তে এখন ৩০০ রুপির ওপরে। শ্রীলংকা চীনা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু তাদের শর্ত মানেনি। অতএব, তারা আর ঋণ দিতে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত হাম্বানটোটা নামের সমুদ্রবন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয় শ্রীলংকা। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়। চীন আর কোনো অর্থ সাহায্য দিচ্ছে না। শ্রীলংকা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকেও বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেয়; যা সময়মতো তারা ফেরত দিতে পারেনি। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি ১৯-২০ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হচ্ছে ৩০ শতাংশ। এদিকে পর্যটননির্ভর শ্রীলংকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কভিড-১৯-এর কারণে। পর্যটন আয় হ্রাস পায়, হ্রাস পায় রেমিট্যান্স আয়ও। সংক্ষেপে এই হচ্ছে শ্রীলংকার অবস্থা। সার্কের একটি উজ্জ্বল অর্থনীতি আজ নিভু নিভু। পাশেই মালদ্বীপ, যা আরেকটি সার্কভুক্ত দেশ। এ ওদশের মূল রাজস্ব আয় ‘পর্যটন’ থেকে। কভিড-১৯-এর কারণে পর্যটন আয় তাদেরও অনেক কমে গেছে। এতে দেশটি পড়েছে সংকটে। গতবার মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সালিহ যখন ঢাকায় আসেন, আমাদের আমন্ত্রণে তখন তিনি বাংলাদেশের কাছে ডলার সাহায্য প্রার্থনা করেন। কাগজে দেখলাম বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সাহায্য দিতে অপারগ বলে জানিয়েছে। এদিকে মালদ্বীপও বড় বড় অবকাঠামো গড়ে ঋণের ফাঁদে পড়েছে। চার লেনবিশিষ্ট ২ দশমিক ১ কিলোমিটার লম্বা এক ব্রিজ বানিয়েছে মালদ্বীপ, দুটো দ্বীপের মধ্যে সংযোগের জন্য। চীনা এ ঋণের পরিমাণ ২০০ মিলিয়ন ডলার। পাবলিকলি গ্যারান্টেড ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ তার বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ডলার। এদিকে আরেক সার্কভুক্ত দেশ নেপালের অবস্থাও নড়বড়ে। রেমিট্যান্স, আমদানি ও পর্যটননির্ভর নেপালের বাণিজ্য ঘাটতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবসায় অতিরিক্ত ঋণ দেয়ার কারণে ব্যাংকগুলো এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এরই মধ্যে কমেছে ১৭ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। নেপাল এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। সার্কের অনেক দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে পড়ছে গত শতাব্দীর ব্যাঘ্র অর্থনীতিগুলোর কথা। সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ইত্যাদি ব্যাঘ্র অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে যোগ হয় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া। ১৯৯৭ সালের দিকে জর্জ সোরোস নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে উদীয়মান এসব অর্থনীতির সর্বনাশ করেন। সে ভিন্ন ইতিহাস। বর্তমান থেকে শিক্ষা নেয়াই এখন জরুরি।

 

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক