বাংলাদেশ এখনো মূলত কৃষি অর্থনীতির দেশ। শুধু কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশেরই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জাতীয় প্রত্যাশা পূরণ হয় না। কৃষি অর্থনীতির পাশাপাশি শক্তিশালী শিল্প-অর্থনীতিও গড়ে তোলা জরুরি। সেই পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, খুলনা, যশোর প্রভৃতি এলাকায় বহু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব শিল্প-কারখানার একাংশ পরিকল্পিত এলাকা কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তবে অধিকাংশই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা নানাভাবে নাগরিক ও পারিবেশিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। এলাকাগুলোয় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা জনচাপ, যানজট, আবাসিক সংকট, নাগরিক সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতার মতো সমস্যার পাহাড় সৃষ্টি করেছে। বহু দিন ধরে তাগিদ উচ্চারিত হচ্ছে শহর থেকে শিল্প-কারখানা দূরে সরিয়ে নেয়ার। বিভিন্ন শিল্পের জন্য আলাদা আলাদা শিল্পনগরী গড়ে তোলাসহ দেশের সর্বত্র শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা হলে সুষম অথনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিরাজমান বহু সমস্যারই সুরাহা হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার দেশজুড়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য উৎপাদন ও রফতানির প্রত্যাশা নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১২টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল সক্রিয় রয়েছে, বাকি ১৭টি অনুমতি পেয়েছে। সরকার প্রতি জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা-উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছে তার বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সুষমতা যেমন আসবে, তেমনি এখনকার মতো অনেক সমস্যাই আর তখন থাকবে না। উন্নয়ন, শিল্পায়ন, রফতানি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য তৈরি হবে।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাটি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভালো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়াই বড় কথা নয়, সেই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ যথাসময়ে সুচারু ও মানসম্পন্নভাবে বাস্তবায়নের মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা, সাফল্য এবং জাতীয় জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত নেই। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রয়োজন। কোথায় কোথায় পরবর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গড়ে তোলা হবে, সে ব্যাপারে যথোচিত সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। সম্ভাব্যতা যাচাই, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, রাস্তাঘাট, পরিবহন সুবিধা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংস্থানের পাশাপাশি কী ধরনের শিল্প-কারখানা করা হবে, উৎপাদিত পণ্যের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার কতটা অনুকূল প্রভৃতি দিক দেখতে হবে। দেশে জমির সমস্যা আছে। আবাদি জমি যাতে ব্যবহৃত না হয় কিংবা হলেও কম হয় সেটাও নজরে রাখতে হবে। আরেকটি দিক বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। অন্তত ১০০ বছর যাতে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল টিকে থাকতে পারে, উৎপাদনে থাকতে পারে, স্থানান্তরের প্রয়োজন না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা প্রভৃতি শিল্প এলাকা এরই মধ্যে সম্প্রসারমাণ শহরের ভেতরে চলে এসেছে। ৪০-৫০ বছরেই এগুলো স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সন্দেহ নেই, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠবে। সেসব শহরকেও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। নদী দখল, জোর করে ভূমি দখলের মতো ঘটনা যেন না ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা চাই। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে এটি একটি বিশাল পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। নির্ধারিত সময়সীমায় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গড়ে উঠলে উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় এজন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে ধাপে ধাপে। অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য মূলত খাসজমি, ভূমি পুনরুদ্ধার ও অকৃষি জমিকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পায়নের সুবিধার জন্য একটি ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশের এলাকাভিত্তিক বৈচিত্র্য আছে। বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে। কিন্তু যেভাবে এলাকাভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পিত শিল্পায়নের পথে হাঁটতে পারেনি দেশ। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে অপরিকল্পিত কিছু শিল্প গড়ে উঠলেও মূলত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ভর করেই পাঁচ দশক পার করে ফেলেছে। কিন্তু সব নাগরিকের জন্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। বর্তমান সরকার কৃষি আর প্রাচীন অর্থনীতির পুরনো ধ্যানধারণার বৃত্ত ভেঙে ভারতের মতো পরিকল্পিত শিল্পায়নের পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। তাছাড়া জমি লিজ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, লিজ প্রদানকারীকে নিশ্চয়তা দিতে হবে। লিজের অর্থ এই নয় যে বিনিয়োগকারী লিজ করা জমি গ্রাস করে ফেলবে। তাহলে জমি লিজ পাওয়া সহজতর হবে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ক্ষেত্র সহজীকরণ করতে হবে।

বাংলাদেশের এমন শিল্পবান্ধব পরিস্থিতি সব দেশেরই পছন্দ। বিদ্যুৎ সমস্যায় উৎপাদন আর ব্যাহত হয় না। আরো নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠছে। যাতে নতুন শিল্পায়নে বিদ্যুতের অভাব আর না থাকে। পণ্য আমদানি-রফতানিতেও অসুবিধা নেই। যেসব রাস্তা সরু ছিল সেগুলো চার থেকে ছয় লেনের করা হয়েছে। রেল যোগাযোগের দুর্বলতা কাটছে। লাইন আছে। দরকার একটু সংস্কারের। পণ্যের সঙ্গে যাত্রী যাতায়াতের অসুবিধা হবে না। পদ্মা সেতু সম্পন্ন হয়েছে, গাড়ি ছুটছে। দ্রুত রেললাইনও চালু হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সংযোগের বড় সমস্যা কেটেছে। রেললাইন ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে যাবে সারা দেশের শিরায়-উপশিরায়। রেল পরিবহনে খরচ অনেক কম। বাণিজ্যে সেটা খুবই বড় কথা। 

পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এর প্রমাণ দেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, যা ইপিজেড নামেই অধিক পরিচিত। ইপিজেডে কর্মপরিবেশ, শ্রমিকের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা, পণ্যের মান সব মিলিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ, যেমন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায় অর্থনৈতিক জোন ব্যবস্থা খুবই সফল বলে প্রমাণিত। দেশগুলোর অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি তৈরিতে অঞ্চলগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোও একইভাবে যাতে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও জাতীয় আয়ে যথাযথ অবদান রাখতে পারে সে লক্ষ্যে সতর্ক থাকতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নেও দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করাও জরুরি।