‘সাহিত্য,
অতিমারী ও
সমাজ’—এ
শিরোনামে করোনা
নিয়ে একটা
ভিন্নধর্মী লেখা
লিখেছেন বিশিষ্ট
অর্থনীতিবিদ ড.
বিনায়ক সেন
(বাংলাদেশ উন্নয়ন
সমীক্ষা, খণ্ড
৩৮, ১৪২৭
বার্ষিক সংখ্যা)।
লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক
পরিচয়, তিনি
বর্তমানে বাংলাদেশ
ইনস্টিটিউট অব
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের
(বিআইডিএস) মহাপরিচালক।
লেখাটি ভিন্নধর্মী
হিসেবে আমার
ভাবার কারণ
করোনা অতিমারীকে
সাহিত্য ও
ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ
থেকে বিচার
করে কিছু
মূল্যবান উপসংহার
উপহার দিয়েছেন।
অন্যদিকে সামান্য
সমন্বয়ে এটি
পুনরুত্পাদনে আমার
উদ্দেশ্য খুবই
সাধারণ: জার্নাল
পড়ুয়া সীমিত
পাঠকসমাজ থেকে
পত্রিকার অপেক্ষাকৃত
বড় পরিসরে
লেখাটি নিয়ে
যাওয়া। কিন্তু
ভাবা যত
সহজ, করা
তত কঠিন;
প্রায় ১৫
হাজার শব্দ-সংবলিত
মোট নয়টি
অনুচ্ছেদে উপস্থাপিত
একটা লেখা
মাত্র দুই-তিন
হাজার শব্দে
গাঁথার কাজ
চিলিং ও
চ্যালেঞ্জিং উভয়ই।
আর তাই
এত বড়
কাটছাঁটের পর
গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
বাদ পড়ে
থাকলে (কিংবা
দু-এক
জায়গায় অসাবধানতাবশত
হুবহু বাক্য
স্থানান্তর ঘটে
থাকলে) আগাম
ক্ষমা প্রার্থনা
লেখক ও
পাঠকের কাছে।
অতিমারী-মহামারী
নিয়ে আলোচনা
দেশের ভেতরে
যেমন, বাইরেও
তেমনি বহমান।
করোনায় সবাই
শরবিদ্ধ, তাই এটাই
স্বাভাবিক যে
করোটিতে সারাক্ষণ
করোনা খেলে
যায়। তবে
এই অতিমারী
কিন্তু অচিন
কিছু নয়,
অন্তত এ
উপমহাদেশে, সারা
বিশ্বে তো
বটেই। ইবোলা,
প্লেগ, এইডস
বা সারসজাতীয়
মহামারী করোনার
মতো নজর
কাড়তে পারেনি,
পারেনি বিস্তৃত
ভুবনে বিভীষিকার
বাষ্প ছড়াতে।
ওগুলো নিয়ে
‘ব্যাপক তত্ত্ব-তালাশ
দেখা দেয়নি
অন্তত অর্থনীতি,
সমাজ, ইতিহাস
ও দর্শনচর্চায়।
সাধারণ জনগণের
মধ্যেও এ
নিয়ে উদ্বিগ্ন
মনোভাব ছিল
সীমিত পর্যায়ের।
এর কারণ
সবার জানা—অঞ্চলভিত্তিক
মহামারী করোনার
মতো বৈশ্বিক
স্তরে করাল
নয়। প্রাপ্ত
তথ্য অনুযায়ী,
২০২১ সালের
মার্চ পর্যন্ত
মোট ২২১টি
দেশ করোনায়
আক্রান্ত, আক্রান্ত
মানুষের সংখ্যা
১২ কোটি,
মারা গেছে
২৭ লাখের
বেশি এবং
প্রতিদিন দুই
লাখের বেশি
মানুষ কভিডের
শিকার হচ্ছে।
বিনায়ক
সেন মনে
করেন, বৈশ্বিক
ব্যাধি কভিড
নিয়ে চলমান
লেখালেখির তিনটি
মূলধারা লক্ষণীয়:
এক, অর্থনীতিবিদদের
লেখার কেন্দ্রবিন্দুতে
থাকছে প্রবৃদ্ধি,
দারিদ্র্য, বহির্বাণিজ্য
ও রেমিট্যান্সের
ওপর অভিঘাত
এবং তার
সঙ্গে কর্মসংস্থান,
এসডিজি, নতুন
পণ্যবাজারের আত্মপ্রকাশ,
নারীর কাঁধে
বাড়তি বোঝা,
বৈষম্য ইত্যাদি
বিষয়ে পরিসংখ্যানসমৃদ্ধ
বিশ্লেষণ। দুই,
এই অতিমারীর
কারণে পারিবারিক
সহিংসতা, বিপর্যস্ত
মানসিক স্বাস্থ্য,
শিক্ষার স্তর
থেকে দরিদ্রের
ছিটকে পড়া,
বাল্যবিয়ের প্রবণতা,
‘সামাজিক পুঁজির’
সম্ভাব্য অবক্ষয়,
সামাজিক বর্গের
মধ্যে চলমান
টেনশনের ভেতরে
নতুন সংকট
ও সম্ভাবনায়,
এমনকি নতুন
ধারার মূল্যবোধের
জন্মে কভিডের
ভূমিকা প্রভৃতি
বিষয় নিয়ে
বিদগ্ধ আলোচনা
চলছে। এতে
অংশগ্রহণ করছেন
অর্থনীতিবিদ ছাড়াও
সমাজবিজ্ঞানী, নারীবাদী,
পরিবেশবাদী ও
অন্যরা। এবং
সব শেষে
স্বল্পসংখ্যক, যদিও
তৃতীয় ধারার
লেখাগুলোর মধ্যে
আছে ‘ক্রমশ
নজর কাড়া
সমাজবিদ, দার্শনিক
ও ইতিহাসবিদরা,
যারা মহামারী-অতিমারীর
দীর্ঘমেয়াদি সূত্র
খুঁজছেন, সমাজ
ও রাষ্ট্রচিন্তার
ইতিহাসে উইলিয়াম
ফকনারের মতো
এরা বিশ্বাস
করেন যে
অতীত ‘মৃত
নয়’ এবং
সেই অর্থে
অতীত ‘অতীতও’
নয়। সেজন্যই
অতীতের অভিজ্ঞতায়
তারা বারবার
ফিরে যান
এবং সেই
সূত্রে তাদের
সৃষ্টি করতে
হয় নতুন
জ্ঞানের আর্কাইভ—সাহিত্য,
শিল্পকলা, ইতিহাস
ও দর্শন
গ্রন্থ থেকে।
(প্রসঙ্গত,
আমরা অন্য
একটা ধারাও
লক্ষ করি
এবং সেটা
হলো করোনাকেন্দ্রিক
চিকিত্সা ও
স্বাস্থ্য পরিচর্যাবিষয়ক
লেখালেখি, অজ্ঞাত
কারণে যা
লেখক উল্লেখ
করেননি)।
আগেই
বলেছি, একজন
অর্থনীতিবিদ হয়ে
লেখক অতিমারীর
অস্তিত্ব, প্রবণতা
এবং সেই
সঙ্গে নিরাময়ে
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার
খুঁটিনাটি খুঁজতে
গেছেন সাহিত্য
ও ইতিহাসের
ডেরায়—চলমান
লেখালেখির তৃতীয়
ধারা বেছে
নিয়েছেন তিনি।
পার্থক্যটা এখানেই।
তার লেখাটি
আর্কাইভ থেকে
আহরিত এবং
বিভিন্ন অনুচ্ছেদে
সুবিন্যস্ত, যেখানে
আছে বিভিন্ন
বিষয় নিয়ে
বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা
এবং যার
প্রতিটি যেন
নিজেই একেকটা
প্রবন্ধ—যথা
‘বাঙালির প্রথম কোয়ারেন্টিন’,
‘রবীন্দ্রনাথের লেখায়
জনস্বাস্থ্য ও
মহামারী প্রসঙ্গ
এবং মানবিক
সম্পর্ক’।
মহামারীর সময়
উপমহাদেশে ‘উপনিবেশিক
রাষ্ট্রের’ ভূমিকা
(এক ধরনের
দ্বৈত খাতবিশিষ্ট
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা),
যা কেবল
‘অতীতেই সীমাবদ্ধ’
থাকেনি এমনকি
বাংলাদেশকেও পরোক্ষভাবে
প্রভাবিত করেছে,
সে বিষয়ে
আকর্ষণমূলক আলোচনা
রয়েছে ওই
প্রবন্ধে। মিশেল
ফুকোর Bio-power এবং
মহামারী নিয়ে
‘নিম্নবর্গের প্রতিক্রিয়া’-সংক্রান্ত
আলোচনা স্বল্প
পরিসরে উল্লেখ
করা আছে।
মজার ব্যাপার
হলো, ‘এলিনিয়েটেড
উপনিবেশিক রাষ্ট্র
একে তো
যথাযথ জনস্বাস্থ্য
কার্যক্রম হাতে
নিতে পারেনি,
তদুপরি নিম্নবর্গ
গোড়া থেকেই
এ ধরনের
আধুনিকায়ন বা
জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিকে
সন্দেহের চোখে
দেখেছে এক
প্রকার এখনো
দৃশ্যমান কভিডের
স্বাস্থ্যবিধি মানার
ক্ষেত্রে বা
টিকা নেয়ার
ক্ষেত্রে আপাত
অনীহার প্রকাশ।’
এবং লেখাটির
শেষ অনুচ্ছেদে
কয়েকটি উপসংহারমূলক
পর্যবেক্ষণ করা
হয়েছে সমাজে-রাষ্ট্রে-দর্শনে
মহামারী-অতিমারীর
অভিঘাত সম্পর্কে
।
আমরা
চেষ্টা করব
সম্ভব হলে
সব নয়তো
বেছে বেছে
অনুচ্ছেদভিত্তিক গল্প
পাঠকের সামনে
পেশ করতে।
বাঙালির
কোয়ারেন্টিন
পুরো
প্রবন্ধের প্রাণ
হিসেবে শুরুতে
আছে কোয়ারেন্টিন শব্দটি।
এ শব্দ
সম্ভবত বাঙালি
প্রথম শুনতে
পায় বাংলা
সাহিত্যে শরত্চন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের চার
পর্বের ‘মাস্টারপিস’
বলে খ্যাত
শ্রীকান্ত উপন্যাসের
দ্বিতীয় পর্বের
তৃতীয় অধায়ে।
সেখানে শ্রীকান্তর
বার্মা ভ্রমণের
বর্ণনা থেকে
শব্দটির সঙ্গে
পাঠকের পরিচয়
ঘটে। তখনকার
বার্মায় চারদিকে
শোরগোল ও
সরকারি সতর্কতা
কেন্দ্রীভূত ছিল
শুধু প্লেগের
বিস্তার রোধে,
যদিও এই
ভয়াবহ রোগ
তখনো সে
দেশে যায়নি। কলকাতার জাহাজঘাটে
পৌঁছে দেখেন
“চোদ্দ-পনের
শ লোক
‘ভেড়ার পালের
মতো’ সারবদ্ধ
দাঁড়িয়ে আছে,
ডাক্তার পরীক্ষা
করিয়া পাস
করিলে তবেই
সে জাহাজে
উঠিতে পাইবে...তাহারা
প্লেগের রোগী
কিনা, তাহা
প্রথমে যাচাই
হওয়া দরকার...।”
পরের
দিন দুপুর
নাগাদ জাহাজ
রেঙ্গুনে পৌঁছার
কথা। কিন্তু
ভোর থেকেই
যাত্রীদের মুখচোখে
ভীতি আর
ধড়ফড় ভাব
লক্ষ করা
গেল, ‘চারিদিকে
হইতে একটা
অস্ফুট শব্দ
কানে আসতে
লাগিল, কেরেন্টিন।
খবর লইয়া
জানিলাম, কথাটা
quarantine. শহর
হইতে আট-দশ
মাইল দূরে
একটা চড়া
কাঁটাতারের বেড়া
দিয়া অনেকগুলি
কুঁড়েঘর তৈয়ারি
করা হইয়াছে;
ইহার মধ্যে
সমস্ত যাত্রীদের
নির্বিচারে নামাইয়া
দেয়া হয়।
দশদিন বাস
করিবার পর,
তবে ইহারা
শহরে প্রবেশ
করিতে পারিবে...তবে
যদি কাহারও
কোনো আত্মীয়
শহরে থাকে
এবং সে
Port Health Officer-এর
নিকট হইতে
কোনো কৌশলে
ছাড়পত্র যোগাড়
করিতে পারে,
তাহা হইলে
অবশ্য আলাদা
কথা।’
পাঠকের
জানার জন্য
বলা যে
পায়ে হেঁটে,
নিজের বোঝা
নিজে টেনে
কোয়ারেন্টিন নামক
কষ্টের ওটা
ছিল শুরু,
শেষ নয়।
একই জাহাজে
শ্রীকান্তর সহযাত্রী
এবং পরিচিত
ডাক্তার বাবু
শ্রীকান্তকে একটু
বিরক্ত হয়েই
বললেন:
“শ্রীকান্ত
বাবু, একখানা
চিঠি যোগাড়
না ক’রে
আপনার আসা
উচিত ছিল
না; Quarantine-এ
নিয়ে যেতে
এরা মানুষকে
এত কষ্ট
দেয় যে
কসাইখানার গরু-ছাগল-ভেড়াকেও
এত কষ্ট
সইতে হয়
না। তবে
ছোটলোকেরা কোনোভাবে
রকমে সইতে
পারে, শুধু
ভদ্রলোকদেরই মর্মান্তিক
ব্যাপার। একে
ত মুটে
নেই, নিজের
সমস্ত জিনিস
নিজে কাঁধে
করে একটা
সরু সিঁড়ি
দিয়ে নামাতে
ওঠাতে হয়,
তত দূর
বয়ে নিয়ে
যেতে হয়;
তার পরে
সমস্ত জিনিসপত্র
সেখানে খুলে
ছাড়িয়ে স্টিমে
ফুটিয়ে লণ্ডভণ্ড
করে ফেলে—মশাই
এই রোদের
মধ্যে কষ্টের
আর অবধি
থাকে না।”
বুঝতে
বাকি থাকে
না যে
কোয়ারেন্টিনের সঙ্গে
বাঙালির প্রথম
পরিচয় ছিল
অত্যন্ত ভীতিপ্রদ
এবং গায়ে
কাঁটা দেয়ার
মতো এক
অভিজ্ঞতা, ছেড়ে
দে মা
কেঁদে বাঁচি
ধরনের অবস্থা।
লেখক বলছেন,
সম্ভবত সেই
অভিজ্ঞতা মাথায়
রেখে আধুনিক
কালের সরকার
কোয়ারেন্টিনের বদলে
লকডাউন বা
সাধারণ ছুটি
ঘোষণা-জাতীয়
মৃদু শব্দ-সংবলিত
বিকল্প আবিষ্কার
করেছেন। “ভারতে
মোদি তার
ভাষণে লকডাউন
বোঝাতে ঘরের
চারদিকে ‘লক্ষণরেখা’
এঁকে দিয়েছিলেন।
রামায়ণের প্রসঙ্গ
টেনে সবাইকে
ঘরের বাইরে
যেতে মানা
করেছিলেন। এক
অর্থে সীতাই
ছিলেন লকডাউনে
আবদ্ধ প্রথম
পৌরাণিক নারী
এবং একজন
নারীকেই যে
প্রথম লকডাউনে
আবদ্ধ হতে
হলো, সেটাও
তাত্পর্যপূর্ণ বৈকি।”
মহামারী
যে বৈষম্যের
বাহক তা
আজকের গবেষণা
নয়; স্পষ্ট
বেরিয়ে আসে ১৯১৭-৩৩
সালে লেখা
শ্রীকান্ত উপন্যাসে
শ্রীকান্তর বিবরণী
থেকে। মোট
কথা, মহামারী
‘ছোটলোক’ ও
‘ভদ্রলোকে’র
ব্যবধান কমায়
না, বরং
তাকে আরো
প্রকট করে
তোলে। এল
ইন্দ্রনাথ নামে
অসম সাহসী
কিশোরের কথা,
যে ছয়-সাত
বছরের শিশুর
মরদেহটি ডিঙিতে
তুলে দূরের
চরের ঝাউবনের
মধ্যে ফেলে
রেখে আসামাত্রই
জাতপাতের প্রশ্ন
উঠল:
“কুণ্ঠিত
হইয়া যেই
জিজ্ঞাসা করিলাম
কি জাতের
মড়া তুমি
ছোঁবে? ইন্দ্র
সরিয়া আসিয়া
একহাত তাহার
ঘাড়ের তলায়
এবং অন্যহাত
হাঁটুর নিচে
দিয়া একটা
শুষ্ক তৃণ
খণ্ডের মত
স্বচ্ছন্দে তুলিয়া
লইয়া কহিল—‘মড়ার
কি জাত
থাকে রে?’
আমি
তর্ক করিলাম,
‘কেন থাকবে
না?’
ইন্দ্র
কহিল, ‘আরে
এ যে
মড়া। মড়ার
আবার জাত
কী? এই
যেমন আমাদের
ডিঙিটা—এর
কি জাত
আছে? আমগাছ,
জামগাছ যে
কাঠেরই তৈরি
হোক, এখন
ডিঙি ছাড়া
একে কেউ
বলবে না—আমগাছ,
জামগাছ, বুঝলি
না? এও
তেমনি’।”
প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য, ওই
সময়ে সনাতন
সংস্কার অনুযায়ী
কোনো জাতের
মরদেহ ছোঁয়াচে
রোগে বা
অন্য কিছুতে
মরেছে কিনা,
তা না
জেনে সংস্কার
করা যেত
না ।
বৈষম্যের
বেলায় বাংলাদেশের
অভিজ্ঞতা নিয়ে
লেখক বলছেন,
“করোনার সময়ে
আমরা দেখতে
পাচ্ছি (শহরের)
ধনী লোকের
ছেলেমেয়েরা অনলাইনে
কোচিং করছে,
ইন্টারনেট প্লাটফর্মে
পাঠদান চলছে
কিন্তু গরিবের
ছেলেমেয়েরা সে
সুযোগ নিতে
পারছে না।
কেননা তাদের
ঘরে একখানা
মোবাইল ফোন
আছে বটে,
কিন্তু সেটা
‘স্মার্টফোন’ নয়,
অন্যান্য ইন্টারনেট
প্রযুক্তি প্রায়
দুর্লভ বললেই
চলে গ্রামাঞ্চলে।
এই প্রযুক্তি
না থাকায়
শুধু শিক্ষাই
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
না, টেলিমেডিসিনও
তার সম্পূর্ণ
সুবিধা দিতে
পারছে না।
করোনা জাতীয়
মহামারী আয়ে-সম্পদে-শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে
ধনী-গরিবের
মধ্যকার বৈষম্যকে
আরো প্রকট
করে তুলছে।”
যাই
হোক। আমরা
জানতে পাই
যে শ্রীকান্ত
উপন্যাসে আরো
কিছু ব্যাধির
উল্লেখ আছে
যেগুলো মহামারী
আকারে ছড়িয়েছিল।
যেমন রাজলক্ষ্মীকে
পাঠকের সামনে
পরিচয় করানো
হয় এভাবে—“স্বামী
পরিত্যক্তা মা
সুরলক্ষ্মী ও
রাজলক্ষ্মী দুই
মেয়ে লইয়া
বাপের বাড়ি
চলিয়া আসে।
ইহার বয়স
তখন আট-নয়
বত্সর, সুরলক্ষ্মীর
বারো-তেরো।
ইহার রঙটা
বরাবর ফর্সা;
কিন্তু ম্যালেরিয়া
ও প্লীহায়
পেটটা ধামার
মত, হাত-পা
কাঠির মত,
মাথার চুলগুলু
তামার শলার
মত—কতগুলি
তাহা গুনিয়া
বলা যাইত।’
অন্যের
শুশ্রূষা করতে
গিয়ে শ্রীকান্ত
স্বয়ং একদিন
মহামারীর কবলে
পড়েছিলেন। বর্তমান
করোনার মতোই
তাকে অচেতন
জ্বরে রেখে
সবাই ভোঁদৌড়,
যার যেদিকে
ইচ্ছা। তবে
তখন প্লেগ
বা কলেরা
নয়, উঠে
আসে আরেক
মহামারীর কথা—বসন্ত
মহামারী। গুরুত্বপূর্ণ
কথা হলো,
এরই মধ্যে
জীবনের সুখ-দুঃখগুলোর
মুখোমুখি হচ্ছে
মানুষ:
‘আমাদের
জলে পানা,
হাওয়ায় ম্যালেরিয়া,
মানুষের পেটে-পেটে
পিলে, ঘরে-ঘরে
মামলা, পাড়ায়-পাড়ায়
দলাদলি—তা
হোক তবু
তারি মধ্যে
কত রস,
কত তৃপ্তি
ছিল, এখন
যেন তাহার
কিছুই না
বুঝিয়াও সমস্ত
বুঝিতে লাগিলাম।’
শ্রীকান্ত
উপন্যাসে চার
চারটি মরণব্যাধির
উল্লেখ আছে—প্লেগ,
কলেরা, বসন্ত
ও ম্যালেরিয়া।
তার সঙ্গে
জাতপাতের বিভেদ
ও দলাদলি
নিয়ে মানুষের
দুর্ভোগের সীমা
নেই। তার
পরও ‘পল্লীসমাজ’
রচনায় এক
রমেশের দেখা
মেলে, যে
জীবনের ঝুঁকি
নিয়ে হলেও
জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে
জনসচেনতা সৃষ্টি
করতে চায়;
জাতপাত আর
ধর্ম নিয়ে
বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে
দাঁড়ায়। বিশেষত
যখন ‘ম্যালেরিয়া ভীতি
বাঙ্গালার পল্লী
জননীর আকাশে,
বাতাসে এবং
আলোকে উঁকিজুঁকি
মারিতে লাগিল,
রমেশও জ্বরে
পড়িল। তিনদিন
জ্বরভোগের পর
খুব খানিকটা
কুইনাইন গিলিয়া
ভাবিতেছিল, গ্রামের
এই সমস্ত
অনাবশ্যক ডোবা
ও জঙ্গলের
বিরুদ্ধে গ্রামবাসীকে
সচেতন করা
সম্ভব কিনা।
মানুষ হইয়া
সে যদি
নিশ্চেষ্টভাবে থাকিয়া
এই রোগ
ভোগ করিতে
দেয়, ভগবান
তাহাকে ক্ষমা
করিবে না।
তার নিশ্চিত
ধারণা জন্মিয়াছিল
এই ম্যালেরিয়াহীন
গ্রামগুলির জল-নিকাশের
স্বাভাবিক সুবিধা
কিছু আছেই।
তাহার ইঞ্জিনিয়ারিং
শিক্ষা এতদিন
পরে এমন
একটি মহত্
কাজে লাগাইবার
সুযোগ উপস্থিত
হইয়াছে মনে
করিয়া সে
মনে মনে
প্রফুল্ল হইয়া
উঠিল।’
বিনায়ক সেনের ধারণা, পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম অঘোষিত, অস্বীকৃত কর্মী ছিল পল্লীসমাজের রমেশ। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন চিঠিপত্রেও মহামারী ও জনস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ এসেছে, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আলোতে আনা হবে।
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক
বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










