গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো শিল্পপণ্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পানি। যদিও বিষয়টি অধিকাংশ আলোচনায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। বাংলাদেশে শিল্প-কারখানাগুলো এতদিন ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ উভয় উৎস থেকে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করেছে বলতে গেলে বিনা ব্যয়ে। এ কারণে বাংলাদেশে শিল্পে পানির প্রচুর অপচয় হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারেও বাংলাদেশের শিল্পগুলো অনেক পিছিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে খবর আসছে পানিস্বল্পতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার। এতে কারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে উঠছে। গতকাল বণিক বার্তায় তেমনি একটি খবর প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে পানি সংকটে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমছে। খুবই উদ্বেগজনক খবর। ২০২১ সালের জাতীয় নীতিমালায় শিল্পাঞ্চলে পানিসম্পদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই বৃষ্টির পানি ও ভূপৃষ্ঠজলের দিকে নজর দিতে হবে।

দ্রুত ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি রাজধানীর বাইরের শহরগুলোতেও এ চিত্র ব্যতিক্রম নয়। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে গত ৪০ বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২০ মিটার কমে গেছে। এ তীব্র পানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামের কালুরঘাট শিল্প এলাকা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষত ইস্পাত ও গ্লাস কারখানাগুলোয় পানি সংকটের কারণে বর্তমানে ঝুঁকিতে আছে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ। এ কথা সত্য, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতার কারণে শিল্প খাতে অধিক পরিমাণ পানির ব্যবহার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আশার কথা, এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র শিল্প থেকে শুরু করে ইস্পাত শিল্পও রয়েছে। পানি সাশ্রয় ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারে সব শিল্প-কারখানাকে উৎসাহিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। 

বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার এবং শিল্প-কারখানায় পরিবেশবান্ধব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা একবিংশ শতাব্দীতে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হয়ে উঠেছে। পানির আরেক নাম জীবন। পৃথিবীতে যত চিরন্তন সত্য বিদ্যমান রয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। আমরা জানি যে পৃথিবীর বিশাল অংশ পানি দিয়ে আবৃত। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ পানির মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ পানি পানযোগ্য। পৃথিবীর সব শিল্প-কারখানাতেই পানির প্রয়োজন এবং প্রতিটি শিল্প-কারখানাতেই বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এ শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত হয় সুপেয় পানি। কারণ কারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতিতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করলে তা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে শিল্পপতিরা কারখানায় সুপেয় পানি ব্যবহার করে থাকেন। 

সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য পানি অপরিহার্য। বিশুদ্ধ পানি সুবিধা একটি মৌলিক মানবাধিকার। সাত শতাধিক নদী নিয়ে গঠিত ব-দ্বীপ আমাদের বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অদক্ষ পানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে পানি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম বিভিন্ন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র, যেগুলো পানির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্যও চাই পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। 

ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে পানি নিয়ে আসন্ন সংকট সমাধানে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে সবার কাজ করা উচিত। শিল্প খাতের কারখানাগুলোর ছাদের ওপর পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে, যা সহজেই বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যায়। এবং এর মাধ্যমে ব্যবসার জন্য ক্রমবর্ধমান পানির প্রয়োজনসংশ্লিষ্ট সমস্যা মেটাতে এ খাত টেকসই সমাধান নিয়ে আসতে পারে। 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার একটি বড় এলাকা শুষ্ক হিসেবে পরিচিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক এবং পূর্বাঞ্চলের পুরো অংশেই পানির ঘাটতি রয়েছে। যদিও পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তার মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম, কিন্তু দেশটির সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। সেজন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে পানির চাহিদা পূরণ করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য শ্রীলংকার গ্রামাঞ্চলে নানা উপায় অবলম্বন করা হয়। এ সংরক্ষণের কাজ ২৬ বছর ধরে চলছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুরো শ্রীলংকায় প্রায় ৪৫ হাজার ছোট-বড় ট্যাংক আছে। এছাড়া পুকুর, কুয়া ও জলাধার পরিষ্কার করা হয় এবং মানুষ এগুলো দূষিত করে না। বিভিন্ন হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা ও মন্দিরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কলম্বোর মতো বড় শহরগুলোয় পানির প্রধান সরবরাহ আসে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে। এর মধ্যে বৃষ্টির পানি একটি বড় উৎস।

পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে মাত্র দুই বছরে নারায়ণগঞ্জের একটি অ্যাপারেলস ৭০ শতাংশ এবং গাজীপুরের একটি ফ্যাব্রিকস কারখানা ২৭ শতাংশ পানি ব্যবহার কমিয়েছে বলে আইএফসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগে সংশ্লিষ্ট অ্যাপারেলসটিকে প্রতি মাসে ১ হাজার ২০০ টন কাপড় ওয়াশ ও ডাইয়ের জন্য ২৪ দশমিক ৯৬ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করতে হতো। এখন পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে মাত্র ৬ দশমিক ৯৬ কোটি লিটার। প্রতি কেজি কাপড়ে আগে ১২০ লিটার পানি ব্যবহার করতে হলেও এখন ফ্যাব্রিকস কারখানাটির প্রয়োজন পড়ছে ৮০ লিটার। সম্প্রতি বাংলাদেশ পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক শিল্পে সংরক্ষণ খরচসহ পানির ছায়ামূল্য প্রায় ৭৭ দশমিক ৮৫ টাকা। পোশাক শিল্পে গ্রিন কারখানা তৈরির প্রবণতা বেড়ে ওঠায় পানি ব্যবহারেও তারা সাশ্রয়ী হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। সুযোগ রয়েছে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পরিবেশ রক্ষা ও ব্যয় সাশ্রয়ের। 

ভূগর্ভস্থ পানি কম ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে নীতিমালা তৈরিতে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং নদ-নদীর পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের প্রতি মনোযোগী হয়, সেদিকে নজর দেয়া দরকার। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা কাজে লাগানোর উপায় বের করতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশে বৃষ্টিপাত বেড়েছে। এ বছর রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে সারা দেশে। শিল্প-কারখানাগুলো তাদের ফ্যাক্টরি সাইড, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত পানি ব্যবহারের জন্য বাড়তি অর্থ আদায়ের পদক্ষেপ নিলে এক্ষেত্রে সাফল্য আসতে পারে। ঢাকায় এবং কিছু রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে পোশাক প্রস্তুতকারকরা এখন সরকারকে পানির জন্য কিছু মূল্য পরিশোধ করেন। আর নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে নলকূপ স্থাপনের জন্য কিছু ফি দিতে হয়। এক্ষেত্রে পানির ব্যবহারিক মূল্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।

টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পানি সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় অনেক স্মার্ট শিল্প খাত কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যৎ বিপর্যয় প্রতিহতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে শিল্প খাতগুলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। বহু অনিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রা হ্রাস এবং পানিদূষণের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয়। তাদের পানির প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। এক্ষেত্রে টেকসই ব্যবসায়িক অনুশীলন প্রচার ও নিশ্চিতের জন্য সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশের বহু প্রতিষ্ঠান নিজেদের শিল্প কার্যক্রমে পানি ব্যবস্থাপনার কার্যকরী উদাহরণ সৃষ্টি করছে। সবাইকে এ উদাহরণগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে।