গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বাড়ছিল। যা সবশেষ অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এসে কমতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন তেল ও গ্যাস দু’টির দামই কমতির দিকে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কমছে না। জ্বালানির দাম না কমায় দেশে ব্যবসার খরচ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে।

মূলত, দেশের ৮২ শতাংশ রফতানির যোগান দেয়া আরএমজি (তৈরি পোশাক) খাত বা এর মতো যারা রফতানিমুখী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েছে। কারণ, ব্যবসা চালিয়ে নিতে তাদের ডিজেল-নির্ভর হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আবার এভাবে পণ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচ করে অনেকেই লাভবান হতে পারবেন না, বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হচ্ছে না। অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে, আবার অনেকে পুরো জনশক্তি কাজে লাগাচ্ছে না। এতে করে কাজ ও কাজের সুযোগ হারাচ্ছে মানুষ। একই সঙ্গে, রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও এর দামের ওপর নির্ভর করছে পুরো উৎপাদন শিল্প ও সেবা খাত।

বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ যেন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ হতে পারে সেজন্য সরকারকে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে এ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যেন আমরা জ্বালানির দাম কমার সুযোগ নিয়ে উৎপাদন খরচ কমাতে পারি। এতে করে আমাদের দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে, উদ্ভাবন ও রফতানি বাড়বে, দেশের অর্থনীতিতে এই শিল্প ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা অবদান রাখতে পারবেন।

বর্তমানে জ্বালানির চাহিদা পুরোপুরি মেটানো যাচ্ছে না। আমাদের সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের হিসাব করে দেখতে হবে, ২০৪০ বা ৪১ সালে জ্বালানির চাহিদা কেমন হবে! আমাদের এখনই ঠিক করতে হবে, আমরা কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করবো বা কী ধরনের জ্বালানি আমাদের প্রয়োজন। বিশেষ করে, জ্বালানি খাতের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে জ্বালানির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মনে করুন আমরা বললাম, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবো, তো এর পাশাপাশি আমাদের জ্বালানির নিরাপত্তা ও এর সাপ্লাই-চেইন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে জ্বালানি অনুসন্ধান ও সেখান থেকে এর সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। আগামীর বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে, এজন্য এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের পলিসি এখনই ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের সব প্রস্তুতি এখন থেকেই রাখতে হবে, নয়তো জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ব আমরা।

জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে আমরা সরকারকে এরই মধ্যে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছি। এর মধ্যে প্রণোদনা হিসেবে করছাড়ের বিষয়টি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা করছাড় পেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে যাবে। আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। জ্বালানি ব্যবহার নিরবচ্ছিন্ন করতে কয়লা-ভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্টের দিকে যাওয়া যেতে পারে। যেখানে জার্মানি, ভারত বা চীনের মতো দেশ, যারা ২০৬০ সাল পর্যন্ত কয়লা-ভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যবহার করবে বলে কপ-২০২১ সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; সেখান থেকে তারা সরে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পর সারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাদের অভ্যন্তরীনভাবে কয়লা ব্যবহারের সক্ষমতা আছে, তারা ২০৬০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। আমরা এ বিষয়টি এগিয়ে নিতে চাইছি। এছাড়া, সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে কাজ করছি আমরা। ২০-২২ হাজার বর্গফুটের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে কীভাবে তা গ্রিডে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, কীভাবে আমাদের দেশের গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে কাজ করছি আমরা। বাপেক্সের সঙ্গে একযোগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে কাজ শুরু করেছি আমরা।

এনার্জিপ্যাক নিয়ে যদি বলি, আমরা প্রযুক্তি-নির্ভর কাজ করে থাকি। আমরা মূলত ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন ইকুইপমেন্ট বাংলাদেশে বানাই এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তা রফতানি করি। যাতায়াত সুবিধার কারণে নেপাল ও ভারতে আমাদের রফতানির পরিমাণ বেশি। এতে করে আমাদের বিক্রয় পরবর্তী সেবা ও ওয়ারেন্টি দিতে সুবিধা হয়। সাফটা চুক্তির অধীনে ভারতে শুল্কমুক্ত রপ্তানি করতে পারছি আমরা। এছাড়া আমরা ঘানা, সুদান, ইয়েমেন, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করেছি। আমাদের বিস্তৃত পণ্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ট্রান্সফর্মার, ইন্সট্রুমেন্ট ট্রান্সফর্মার, সুইচ গিয়ার, মেটারিং পেডাল, কন্ট্রোল ইকুইপমেন্টস, ডিসকারেক্টর বাইপাস সুইচ ইত্যাদি।

তৈরি পোশাক শিল্পের সহযোগী শিল্প হিসেবে আমরা যে উন্নয়ন করছি তাকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারকে ‘নীতিগত সুরক্ষা’ দিতে হবে। উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে হলে, তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি আরও ৬-৭টি খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নীতিগত সমর্থন দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। এতে করে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, আবার বিদেশেও ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট ও কন্সট্রাকশন সম্পর্কিত কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে মানুষ।

আমরা মূলত ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট ও কন্সট্রাকশন), সাবস্টেশন ও পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে কাজ করি। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আয়, উৎপাদন ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমরা প্রতি বছর ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করব, এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। দু’টি ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে- ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল; এই দুই খাতেও আমরা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই। সামনের দিনে এই দুই খাতের অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। সামনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ আসছে, ওই সময় এ দুই খাতের চাহিদা থাকবে। 

লেখক: সিইও, এনার্জি প্যাক