মাতৃভাষার জন্য আমাদের ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রকাশ বিশ্বদরবারে এক অনন্য গুরুত্ব বহন করে। সে কারণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠান খুব স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের মানুষের ভাষার প্রতি মমত্ববোধ এবং গুরুত্ব প্রদানের দৃষ্টান্ত হবে এটিই প্রত্যাশা। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত এ বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক দায়িত্বের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ কোনো দৃশ্যমান কাজ এখন পর্যন্ত সেভাবে দেখা যায়নি। যে দেশ মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য জীবন দেয়ার নজির দেখিয়েছে, সে দেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভূমিকা এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া খুবই দুঃখজনক। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (আমাই) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পায়। এর মধ্যে ইনস্টিটিউট ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। ওই অর্থবছরের বাজেটে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা খাতে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এক্ষেত্রে গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের শতভাগই অব্যয়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইনস্টিটিউট আইনে যেখানে গবেষণা মূল কাজ হিসেবে গণ্য হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ বাদ দিয়ে শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত হতাশার। এভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নিঃসন্দেহে নীতিবিরোধী কাজ। ভাষা নিয়ে গবেষণা না হলে এ প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। আর এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুধু বাংলা ভাষার গবেষণা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণার বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার যে মর্যাদাগত অবস্থানটি রয়েছে, সেক্ষেত্রেও এ প্রতিষ্ঠান আমাদের জন্য মাইলফলক হতে পারে। কিন্তু গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা না হলে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বপরিমণ্ডলে মাতৃভাষা গবেষণায় নেতৃত্ব দেয়ার যে সুযোগটি রয়েছে, সেটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। এটি সত্য যে আমাদের দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় খামখেয়ালির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার বিষয়টি জড়িত রয়েছে, তাই অন্তত এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সরকারের নিবিড় আন্তরিকতা থাকা উচিত।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১০-এর ৭ ধারায় আমাইয়ের দায়িত্ব বিষয়ে বলা হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, এ-সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা; বাংলাসহ অন্যান্য ভাষা আন্দোলন বিষয়ে গবেষণা; বাংলা ভাষার উন্নয়নে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা; বাংলাসহ পৃথিবীর সব ভাষার বিবর্তনবিষয়ক গবেষণা; ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য দেশী-বিদেশী গবেষকদের ফেলোশিপ প্রদান; ভাষা ও ভাষাবিষয়ক গবেষণায় অবদানের জন্য দেশী ও বিদেশী গবেষকদের পদক ও সম্মাননা প্রদান; ভাষা বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান; গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ গবেষণাই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য, এতে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু সেটি না করে সরকারের গতানুগতিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেই প্রতিষ্ঠানটি সময় পার করছে।

এছাড়া ভাষাসংশ্লিষ্ট কিছু প্রশিক্ষণ কর্মশালা, সেমিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করা হয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে, যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের গুরুদায়িত্বের তুলনায় খুবই নগণ্য। অথচ এ প্রতিষ্ঠান হতে পারত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভাষা গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এতে ভাষা গবেষণায় দেশের অবদানও বিশ্বজুড়ে প্রচার হতো। বাংলা ভাষার প্রতি বিদেশী গবেষকদের আগ্রহও বাড়ত। কিন্তু সেটি না করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর করা যায়নি। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাকর।

গবেষণা না হওয়ার বিষয়টি এবং ইনস্টিটিউটটি ইউনেস্কোর ক্যাটাগরি-২ প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটিকে উপস্থাপন করার সম্ভাবনার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরাও বলছেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে কিনা সেটি যাচাই করা প্রয়োজন। সে সঙ্গে ইনস্টিটিউটের কাজ সরকারিভাবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু গড়লেই হয় না, সেটি ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হয়। নাহলে সে প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যাদের গুরুদায়িত্ব রয়েছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানে গতিশীলতা আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ রকম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে গবেষণা না হওয়ার দায় এড়াতে পারে না।

মাতৃভাষা বাংলা আমাদের গর্বের বিষয়, বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য সর্বত্র বাংলা ভাষার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করা এবং সেই সঙ্গে বিশ্বে অন্য যেসব মাতৃভাষা রয়েছে, সেসব ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে সক্রিয় রাখা প্রয়োজন। এ ইনস্টিটিউটকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কার্যকর করা গেলে তা দেশের জন্যই সুনাম বয়ে আনবে। একদিকে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মাতৃভাষা চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে এ প্রতিষ্ঠান। মূলত এটিই ছিল এমন প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি তার উদ্দেশ্য পূরণের পথে এগোতে পারেনি। এটি প্রতিষ্ঠানের সফলতার কোনো নিদর্শন নয়। 

জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সরকারি এ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করুক, এটিই আমাদের কাম্য। ভাষা পরিবর্তনশীল, বিভিন্ন উপায়ে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি ভাষার জন্ম হয়, পরবর্তী সময়ে সে ভাষা গতিলাভ করে। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের মুখ নিঃসৃত ভাষা হিসেবেই আমরা মাতৃভাষা পেয়ে থাকি। এক্ষেত্রে মাতৃভাষার পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য ভাষা শিখতে হয়। সব মিলিয়ে বিশ্ব নাগরিক পরিচয় ধারণ, উন্নত দেশের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগ রক্ষাসহ নানা কাজে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মাধ্যম এ ভাষা। তাই ভাষার বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা, বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা এবং গবেষণার রাজ্যে নতুন দুয়ার উন্মোচনের জন্য মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা করা উচিত। আমরা সে জায়গায় এখনো পিছিয়ে রয়েছি, কিন্তু আমরা আশা করি যে উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটি খুব শিগগিরই বাস্তবায়ন হবে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা একান্তভাবে প্রয়োজন।