ছোট ও মাঝারিদের নিয়েই হচ্ছে বিপদ, বলতে গেলে পদে পদে বিপদ। তাদের কথা অর্থনীতি বলে না। তাদের কথা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান শোনে না। অর্থনীতি যদি হয় বাজার অর্থনীতি (মার্কেট ইকোনমি), তাহলে তো বিপদ দ্বিগুণ। আর আগ্রাসী বাজার অর্থনীতি হলে তো কথাই নেই। আমার কথার সত্যতার প্রমাণ একটি সাম্প্রতিকতম খবর। খবরটি দৈনিক বণিক বার্তার। এই খবরে বলা হচ্ছে ‘প্রণোদনার অর্থ বড়রা পেলেও হতাশায় ছোটরা’। খবরটিতে প্রণোদনা প্যাকেজকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে—বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত, সিএমএমই, রফতানিমুখী শিল্পের বেতন-ভাতা, কৃষি খাতে চলতি মূলধন এবং সর্বশেষ নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষি ও ব্যবসায়ী। এই পাঁচটি খাতের মধ্যে দুটো বড় বড় শিল্পের-প্রভাবশালীদের। এগুলো হচ্ছে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত এবং রফতানিমুখী শিল্পের বেতন-ভাতা। দেখা যাচ্ছে, এ দুটি খাতে ব্যাংকগুলোর ‘পারফরম্যান্স’ চমত্কার। প্রথম খাতটিতে প্রায় ৭১ শতাংশ টাকা ব্যাংকগুলো ‘ডিসবার্স’ করছে এবং দ্বিতীয় খাতটিতে শতভাগ। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষি ও ব্যবসায়ী। তাদের অর্থপ্রাপ্তির পরিমাণ প্রণোদনা প্যাকেজের মাত্র ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ। খারাপের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে কৃষি খাতে চলতি মূলধন। তৃতীয় অবস্থানে সিএসএমই (ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি)। তারা মোট বরাদ্দের মাত্র ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পেয়েছে। বলা বাহুল্য, প্যাকেজ বাস্তবায়নের সময় শেষ হয়েছে আগস্টে। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও ছোট বা মাঝারিদের এই করুণ অবস্থা। এই যে হতাশাজনক চিত্র, তা কি নতুন চিত্র? এটা অপ্রত্যাশিতও নয়। ব্যাংকের মালিক বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী, যারা রাজনীতিকও বটে। প্রধান নির্বাহীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আজ্ঞাবহ। আর সরকারি ব্যাংকের মালিক? মালিক সরকার। কিন্তু এসবের ‘বোর্ড’ বড় বড় ব্যবসায়ী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এমনকি এসবের ‘এমডি’ ‘ডিএমডি’ কে হবে তাও তারা ঠিক করেন। সাম্প্রতিক সময়ে একটি সরকারি ব্যাংকের ‘চেয়ারম্যান’ সাহেবকে পত্রপাট বিদায় করা হয়েছে। এ অবস্থায় কী করে আমরা আশা করি যে বড় বড় গ্রাহকের স্বার্থ আগে না দেখে ব্যাংক কর্মকর্তারা ছোটদের স্বার্থ দেখবেন? এ কারণেই তাদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার প্রায় ৭১ শতাংশই বিতরণ করা হয়েছে। আমি বলব এটা বরাবরের ঘটনা।

ব্যাংক সবসময়ই বড়দের স্বার্থ দেখে। শিল্পপতিদের স্বার্থ দেখে। বস্তুত আধুনিক ব্যাংক বড়দের জন্যই। ব্যাংক বড়দের তোষণ করে, লালন-পালন করে, এর দ্বারা বৈষম্য সৃষ্টি হয়। আমদানি-রফতানি এখন বড় ব্যবসা। এটি নাকি এখন টাকা পাচারেরও সহযোগী—প্রধান শক্তি! কারণ ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমেও বিদেশে টাকা পাচার করা হয় এবং তা বহুদিন আগে থেকেই।

ব্যাংকের এ ধরনের কার্যক্রম পাকিস্তান আমল থেকেই (১৯৪৭-৭১) কার্যকর। ওই আমলে ব্যাংকের মালিক ছিলেন ধনী ‘পশ্চিম পাকিস্তানি’ ব্যবসায়ীরা। তারা ব্যাংকের এদেশীয় কর্মচারীদের দ্বারা ‘আমানত সংগ্রহ করে ২২ পরিবারের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা পাঠাত। দেশীয়রা পেতাম শূন্য। বহু লড়ালড়ির পর স্বাধীনতার কিছু আগে বাঙালির দুটো ব্যাংক হয়—ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন (উত্তরা ব্যাংক) ও ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক (পূবালী ব্যাংক)। কিন্তু এরই মধ্যে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সব ব্যাংক জাতীয়করণ হয়। শুরু হয় নতুন পর্ব। কৃষিঋণে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো মফস্বলে শাখা  খোলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অভিযোগ ওঠে সরকারি ব্যাংকগুলো কৃষি ও ছোট ছোট ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। ব্যাংকাররা বলেন, তাদের ক্ষমতা নেই। সৃষ্টি হয় ১৯৮৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক’, সরকারি উদ্যোগে। ছোট ছোট ঋণ দেয়ার কথা তাদের। সরকারি ব্যাংকগুলো বড় বড় ঋণে জড়িয়ে পড়ছে। শিল্পঋণ দেয়ার জন্য হলো বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও ‘বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (বিএসআরএস)। বড় বড় শিল্পঋণ দিয়ে এ দুটি প্রতিষ্ঠান ফতুর হয়। অবশেষে ২০০৯ সালে এ দুটোই একত্র করে তৈরি করা হয় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। এদিকে ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে সরকার বেসরকারি খাতে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়। অনুমোদিত হয় দুটো ‘বিনিয়োগ কোম্পানি’ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংক। বেসরকারীকরণের আওতায় ছাড় পাওয়া দুটো ব্যাংকসহ ছয়টি প্রথম জেনারেশনের ব্যাংক কাজ শুরু করে ১৯৮৩ সালের দিকে। পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে এসব ব্যাংক ও বিনিয়োগ কোম্পানি বড় বড় ব্যবসায়ীর পাল্লায় পড়ে এক সংকটের মধ্যে পড়ে। দেখা গেল বড় বড় শিল্প ও ব্যবসার মালিক ব্যাংকাররা বেনামি সব ঋণ নিয়ে খেয়ে ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং বড় বড় গ্রাহকের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে আপাতত বিপদ থেকে উত্তরণ ঘটে। বলা বাহুল্য, কোনো ‘ক্রিমিনাল’ বিচার হয়নি। এদিকে দুটো বিনিয়োগ কোম্পানির ধনী মালিকরা অবৈধভাবে ‘ব্যাংক ব্যবসা’ করে নিজেদের মধ্যে সব টাকা ভাগাভাগি করে নেন। সরকার বাধ্য হয়ে দুটোকে বেসরকারি ব্যাংকে রূপান্তর করে। বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতির এসব কাণ্ডকারখানা দেখে সরকার একটা পথ ধরে। বিসিসিআই নামে (ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল) একটি পাকিস্তানি মালিকানাধীন বিদেশী ব্যাংক বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র দুই নম্বরী ব্যাংকিং করে লাল বাতি জ্বালায়। এর থেকেই জন্মলাভ করে আজকের ইস্টার্ন ব্যাংক (আজকের অন্যতম সফল বেসরকারি ব্যাংক) ও বেসিক ব্যাংক। বেসিক ব্যাংককে ছোট ছোট ঋণের জন্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এটিও শেষ পর্যন্ত কপট ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে আজ ধ্বংসের কিনারায়। এদিকে আমরা ফারমার্স ব্যাকের কথা জানি। কী করে এটি বড়লোকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারি মালিকানায় পদ্মা ব্যাংক হয়। বলা দরকার আল বারাকা ব্যাংক সম্পর্কে। এ ব্যাংক থেকে সাবেক একজন বড় ব্যাংকার প্রায় শতকোটি টাকার ঋণ নিয়ে বিদেশে চলে যান। তিনি সম্ভবত আর দেশে আসেননি। ব্যাংকটি নানা বড় অনিয়ম করতে করতে প্রথমে ‘ওরিয়েন্টাল ব্যাংক’ হয়। এখন তার নাম আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, যা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কৃষিঋণ সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে (বিকেবি) দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সৃষ্টি হয় রাজশাহী অঞ্চলের জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। বিকেবি বড় বড় ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণে ঢুকে এখন দুর্দশাগ্রস্ত। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঘটমান এসব কাণ্ডকারখানার মধ্যেই দেশে গড়ে ওঠে বিশাল এক এনজিও সাম্রাজ্য, যারা গরিবের কথা বলে বিদেশ থেকে টাকা আনে। দেখা গেল তাদের অধিকাংশই নিজেদের স্বার্থে নিয়োজিত। এদের কেউ কেউ এখন বেসরকারি খাতের একেকটি সাম্রাজ্য। যেসব কথা বলে তারা বিদেশ থেকে টাকা সাহায্য-অনুদান এনেছে, তার ধারেকাছেও তারা এখন নেই।

এদিকে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা কী, তা পরিষ্কার দৃশ্যমান। তাদের পুঁজির স্বল্পতা রয়েছে। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ (খারাপ ঋণ) বাড়ছেই। দক্ষ ব্যবস্থাপনা তাদের নেই। অনেক ব্যাংকের প্রভিশনিংয়ে (সংরক্ষণ) ঘাটতি রয়েছে। বলা যায় ব্যাংকিং খাত এক ক্রান্তিলগ্নে। সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়ে খাতটিকে সচল রেখেছে। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়েছে। ব্যাংক মালিকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে। তাদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বড় বড় গ্রাহককে নানা সুযোগ দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বড় বড় গ্রাহকের বিরাটসংখ্যকই ব্যাংক থেকে অপ্রয়োজনীয় ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে ‘ডাইভার্ট’ করেছে। অনেকের প্রথম উত্তরাধিকার সংকটে, তাদের ক্যাশ ফ্লো সংকটজনক অবস্থায়। বলা যায়, নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমানের সংকটকে আমরা ভবিষ্যতের সংকটে পরিণত করছি। এর মাশুল দেবে পরবর্তী প্রজন্ম। ব্যাংকের মালিকানা চলে যাচ্ছে বড় বড় করপোরেটের হাতে। ব্যাংক এখন ঋণ দেয় বড়দের। ছোট ও মাঝারিরা ঋণ পায় না—এ অভিযোগ এখন সর্বত্র। ব্যাংকগুলো বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে ঋণ দেয়। দেশের অনুন্নত অঞ্চলে তারা যায় না। সেসব অঞ্চলকে ঋণ দিয়ে উন্নত করে না। তারা কৃষিঋণ দিতে চায় না। কৃষকরা, ছোট ছোট কৃষকরা প্রাকৃতিক কারণে ঋণের টাকা ফেরত দিতে না পারলে ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি এজেন্ট’ তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে থানায়-জেলে নিয়ে যায়। অথচ বড়রা টাকা ফেরত না দিলে তাদের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। গ্রেইস পিরিয়ড দেয়া হয়। এসব কারণে ব্যাংকিং খাত এখন বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তারা এ খাতকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছেন। তাদের কাছে ছোট ও মাঝারিদের কোনো মূল্য নেই। বাজার অর্থনীতি, উগ্র বাজার অর্থনীতির আওতায় তারা ব্যাংকিং খাতকে ক্রমেই জনস্বার্থবিরোধী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। তাই আমার আশঙ্কা খেলাপি ঋণ শেষ পর্যন্ত ‘কস্ট অব ডেভেলপমেন্ট’-এ পরিণত হতে পারে। এমনকি ভালো ঋণের অবস্থাও তা-ই হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে মার্কিন সরকার ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে যেভাবে ব্যাংকিং খাতকে রক্ষা করেছিল, আমাদেরকেও তা করতে হতে পারে। এ প্রক্রিয়াকে কভিড-১৯ আরো ত্বরান্বিত করল বোধহয়।

 

ড. আর এম দেবনাথ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক