অমর একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হওয়ার পথে, দীর্ঘ এক মাস লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যানুরাগীদের মিলনমেলা শেষে মেলায় এখন ভাঙনের সুর চলছে। বস্তুত বইমেলা শেষ হলেও এর রেশ সারা বছরই থেকে যায়। বিশেষ করে বইয়ের সঙ্গে যাদের বন্ধুতা, তারা সবসময় বইয়ের সঙ্গেই দিনের অথবা সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময় কাটান। প্রযুক্তির ক্রমবিকাশে বর্তমানে বইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটেছে। যে কারণে অন্তর্জালের মাধ্যমে এখন বইয়ের পিডিএফ সহজলভ্য হয়ে গেছে। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লেখক, প্রকাশক এবং বই বিপণনকারী সংস্থা। এভাবে বইয়ের বাজার পিডিএফ একচ্ছত্রভাবে দখলের চেষ্টা করলেও এখনো সাহস করে প্রকাশকরা বই প্রকাশ করেন। অন্যদিকে কাগজ এবং মুদ্রণসংশ্লিষ্ট সবকিছুর দাম বাড়ায় এ বছর বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ নিয়ে আশঙ্কা করা হলেও মেলায় অনেক বই প্রকাশ হয়েছে, যদিও তা গত বছরের তুলনায় কম।

বই মূলত আমাদের পাঠাভ্যাসের প্রতীক। নিয়মিত বই পাঠ আমাদের কল্পনা জগতের বিকাশ করে, মনের ছোট ছোট চোখ খুলে দেয়। বই আমাদের ভাবতে শেখায়, ভাবনার রাজ্যে ভালো-মন্দ বোধটুকু জাগ্রত করে। কিন্তু অধুনা সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে আমরা বই পড়া ভুলে যেতে বসেছি। আমরা যা কিছুই করি না কেন, সবকিছুর দৃশ্যায়ন দেখতে চাই। তাই তো অফিসের ডেস্কে বসে রয়েছি, সেটির ছবি তুলে ফেসবুকে না দেখালে যেন আমাদের মনের ভাব প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমাদের দৃশ্যায়ন থেকে বাদ যায় না পাঠকনন্দিত বইয়ের চরিত্রগুলোও। যে কারণে বাংলা ভাষায় সর্বাধিক পঠিত রহস্য সিরিজ ‘মাসুদ রানা’ অবলম্বনে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিনেমা নির্মিত হচ্ছে, কিন্তু সিনেমার নায়ককে দেখে দর্শকরা হতাশা প্রকাশ করছেন। তারা অনুরোধ করেছেন কল্পনার দুঃসাহসী দেশপ্রেমিক মাসুদ রানাকে বইয়ের পাতায়ই সীমাবদ্ধ রাখতে, তাকে নিয়ে চরিত্রের রূপায়ণ না করতে। কিন্তু মাসুদ রানা হয়তো ঠিকই আলোর মুখ দেখবে। এবং অতীতে চরিত্রায়িত হওয়া অন্যান্য সিরিজের মতো এ সিরিজও নির্মিত হয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হবে।

বর্তমানে সংবাদ পাঠের ক্ষেত্রেও মুদ্রিত সংস্করণের চেয়ে ভিডিও বর্ণনায় খবর শোনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে পত্রিকাগুলো সংবাদের সঙ্গেই কিউআর কোড দিয়ে দিচ্ছে, যার মাধ্যমে কেউ চাইলেই সে সংবাদের ভিডিও দেখে নিতে পারে। মূলত বইয়ের পাতা এবং যেকোনো ঘটনার দৃশ্যায়ন এটি নিয়ে বলছিলাম। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, রাতের বেলা ঘুমানোর আগে বই পড়লে তা প্রশান্তির ঘুম পেতে সহযোগিতা করে। কিন্তু ভায়োলেন্সপূর্ণ কোনো সিনেমা দেখে ঘুমালে তা ঘুমের মধ্যে ভয় পাওয়ার কারণ হতে পারে।

একদিকে বই ও সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে গাছ কাটার কারণ দেখানো হয়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খরচ করে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে বই পড়া হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে তেজস্ক্রিয়তার নিঃসরণ হয়, সেটিও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের দিকটি বিবেচনা করতে হবে। যা-ই হোক, আমরা তো গাছ কেটে আসবাবপত্র থেকে টুথপিকও বানাচ্ছি। তাহলে জ্ঞানার্জনের জন্য দীর্ঘদিনের প্রচলিত এ প্রথাকে কেন অবজ্ঞা করব? নতুন বইয়ের যে ঘ্রাণ, সেটি পাঠককে যেভাবে আমোদিত করে পৃথিবীর অন্য কিছু দিয়েও সেটি প্রতিস্থাপিত করা সম্ভব নয়।

তাই ছাপার অক্ষরের যে আবেদন, সেটি কখনই ফুরোবে না। বিশেষ করে কাগজের পাতা স্পর্শ করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বই পড়ার যে অনুভূতি, সেটির সঙ্গে অন্য কিছুরই তুলনা হওয়ার নয়। তবে প্রযুক্তির বিকাশের ফলে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এজন্য লেখকদের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে, আগামীতে পিডিএফ বইয়ের নতুন বাজার তৈরি হবে। কারণ তা না হলে নতুন একটি বই বাজারে বের হওয়ার কিছুদিন পরই পিডিএফ হয়ে যাচ্ছে। আবার কোনো লেখক ছাপার অক্ষরে বই বের না করে সরাসরি পিডিএফ আকারেই বই বের করছেন। এক্ষেত্রে কেউ কেউ একুশে বইমেলায় বের হওয়া বইয়ের প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বছরের মেলার আশায় না থেকে পিডিএফ বের করার উদ্যোগ নেন। আর এটা সত্য, কোনো বই একুশে বইমেলা চলাকালীন প্রকাশ হলে সেটি আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া বইমেলার পর মেলায় প্রকাশিত বই কিনতে পারলে সেটি পাঠকেরও ভালো লাগে। কারণ ট্রাফিক জ্যাম আর ভিড় ঠেলে বই কেনা অনেক পাঠকেরই পছন্দ না।

যা-ই হোক, বই আমাদের নতুন জ্ঞান দেয় কিনা সেটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ বইয়ের মধ্যে আমরা যা পাই সেগুলো পুরনো জ্ঞান। এক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান কীভাবে আসবে, সেটি নিয়ে মনীষীরা বিভিন্ন মত দিয়ে গেছেন। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন কল্পনাকে জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। সক্রেটিস নিজেকে জানার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্লেটো দার্শনিক রাজাদের ধ্যানমগ্ন হওয়াকে বাধ্যতামূলক করেছেন। অ্যারিস্টটল ধারণার জগৎ থেকে উপকরণ নিয়ে বাস্তবানুগ জগৎ নির্মাণে জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞান কী? এ প্রশ্নের উত্তরে মনের ভেতর কল্পিত বস্তুর দৃশ্যায়নকেই মূলত বলা হয়। আর মানুষকে কল্পনার জগতে ভ্রমণ করিয়ে আনার মোক্ষম এক উপায় হচ্ছে বই। এক্ষেত্রে ফিকশন বা কল্পকাহিনীর প্রসঙ্গ এলেও বর্তমানে নন-ফিকশন বা মৌলিক বইয়ের চাহিদাও বাড়ছে। নন-ফিকশন বইও মানুষের ভাবনার রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন তত্ত্ব ও ধারণার বিশ্লেষণ পড়ার মাধ্যমে মানুষ নতুন কিছু ভাবতে পারে। এ ভাবনা দু রকম হয়। একটি ধারণা হচ্ছে, সমাজের প্রতিচ্ছবি হুবহু তুলে ধরা, আরেকটি হচ্ছে কোনটি প্রকাশ করলে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তা বিবেচনা করা। এ পরিপ্রেক্ষিতে লেখকরা সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখে থাকেন। এছাড়া তাত্ত্বিক আলোচনার দৃশ্যায়নের কথা যদি বলা হয়, তাহলে দেখা যায় যে যাদের বই পড়তে ইচ্ছা করে না তারা ইউটিউবে লেকচার শুনে কোনো কিছু বুঝে নেয়। শ্রোতাদের চাহিদা থাকায় এখন অডিও বুকেরও প্রচলন শুরু হয়েছে। বইয়ের পাতায় যে নাটকীয়তার মিশ্রণ পড়া যেত, তা এখন কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতার কানে উঠে আসে। আবার কোনো ঘটনা বর্ণনার পর বইয়ে যেমন ছবি ছাপা হয়, ইউটিউবে পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে হোক বা ভিডিওর মাধ্যমে সে দৃশ্য দেখানো হয়। মোট কথা, বই এখন শুধু পড়ার বিষয়ই নয়, বই বর্তমানে দেখা ও শোনার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে দিন বদলাচ্ছে, পরিবর্তিত এ সময়ে বইয়ের বিপণনও এখন সব মাধ্যম বিবেচনা করেই সাজানো হচ্ছে। এমনকি এখন বইয়ের পাতায় ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তিকেও নিয়ে আসা হয়েছে। সময়ের পটপরিবর্তনের এই যে ধারা ‍শুরু হয়েছে, এর মধ্যেও যারা প্রকৃত পাঠক, তারা বইয়ের সঙ্গে যেভাবেই হোক সংযুক্ত থাকবেন। একুশে বইমেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অন্তর্জালের ছোঁয়ায় পাঠক সারা বছরই এখন বইয়ের সঙ্গে থাকতে পারেন। আর বই পড়ার পর রিভিউ দেয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো ডাক বিভাগের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে রিভিউ দিতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন নিজেদের টাইমলাইনেই রিভিউ দেয়া যায়। এভাবে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের নতুন যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে সেটির সঙ্গে সবাইকেই মানিয়ে নিতে হবে। এভাবে যুগ বদলাবে, কিন্তু নানা মাধ্যমে জ্ঞান চর্চা অব্যাহত থাকবে। আর মানবসভ্যতার বিকাশ এভাবেই হতে থাকবে। জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অনুভূতিসম্পন্ন জীব হিসেবে আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেব। এটাই তো প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষা, তাই নয় কি?

তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক