করোনা অভিঘাত মোকাবেলায় অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি এবং দরিদ্র-ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার এরই মধ্যে ৯৫ হাজার কোটি টাকার ওপর ছয়টি প্রণোদনা বা সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে ঘোষিত প্যাকেজগুলোর বেশির ভাগই  সমাজের দুস্থ ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে খুব একটা সুবিধা দেবে না বলে অনেকেই বলছেন।

সরকার ঘোষিত সর্বশেষ প্রণোদনা প্যাকেজে দরিদ্র নাগরিকদের নগদ অর্থ প্রদান এবং কৃষি খাতের দিকে মনোযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রথম প্যাকেজ রফতানি তথা তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সাহায্য করার জন্য। তবে এরই মধ্যে এই নিয়ে মালিকরা ও সরকার এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে আছে। আর তার ফাঁকে অনেক গার্মেন্ট কারখানা থেকেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করার খবরও বেরিয়েছে। কবে নাগাদ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ দেখা যাবে এবং কবে নাগাদ সব শ্রমিক তাদের বেতন পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শ্রমিকদের চাকরি সুরক্ষারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্য প্যাকেজগুলো নিয়ে এরই মধ্যে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে এগুলো মূলত অপেক্ষাকৃত সচ্ছল শ্রেণীরই সুবিধায় আসবে।

এ প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বশেষ প্যাকেজ ঘোষণাকে সুবিবেচনাপ্রসূতই মনে হয়। এ প্যাকেজে অতিদরিদ্র মানুষদের হাতে নগদ অর্থ দেয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার ২০১৪ সালে বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর ওপর করা একটি জরিপকে ভিত্তি হিসেবে ধরে তার সঙ্গে এখনকার অবস্থা মিলিয়ে প্রতি পরিবারের জন্য তিন মাস ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দেয়ার কথা বিবেচনা করছে বলে জানা গিয়েছিল। ওই জরিপে দেশে বস্তিতে ৫ লাখ ৯৫ হাজার পরিবার আছে বলা হয়েছিল। অন্যান্য বিবেচনা সংযুক্ত করে তা এখন ৩৪ লাখ পরিবার বলে হিসাব করা হচ্ছে।

পত্রিকায় দেখেছি নোবেল বিজয়ী দুই অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং তার সহযোগী এস্তার দুফলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিকভাবেই দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের হাতে নগদ অর্থ দেয়াকেই যথাযথ পদক্ষেপ বলে অভিমত দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের কর্মসূচির স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং যথোপযুক্ত লোকদের হাতে তা পৌঁছানোর নিশ্চয়তা বিধান। গত কয়েক দিনে ক্ষমতাসীন দলসংশ্লিষ্টদের সরকারি ত্রাণ চুরির যে খবর এসেছে এবং কেবল সরকারি দলের লোকজন বা তাদের সঙ্গে যুক্তরাই ত্রাণ পাচ্ছেন বলে তথ্য মিলেছে, তাতে এ নিয়ে আশঙ্কা থাকতেই পারে। খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানকেও দেখলাম এই নিয়ে কথা বলতে। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো শুরুতেই এই ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন, এমনকি ত্রাণ সাহায্য বিতরণ দেখভালে জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে সচিবদের প্রাধান্য দিয়েছেন। 

সরকারের নতুন প্যাকেজে কৃষি খাতের জন্য যে ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা হচ্ছে ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ দেয়া। যে চারটি খাতের দিকে আগে সরকার নজর দেয়নি বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে কৃষি খাত একটি। তবে সরকার অন্যান্য খাতের মতোই এখানেও ঋণ দেয়ার কথাই ভেবেছে বলে অনেকেই নাখোশ। তাদের মতে, যেখানে লকডাউন এবং বাজারে চাহিদা হ্রাসের কারণে কৃষকরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে শুরু করেছেন এবং তাদের ওপর দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে কৃষকদের জন্য অন্যান্য শিল্পের মতো ঋণের ব্যাপারটি যথোপযুক্ত বলে তারা মনে করেন না। ছোট ও মাঝারি কৃষকরা এ থেকে লাভবান হবেন নাকি আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন, সেটা তাদের মতে ভাবা দরকার। তাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে বড় আকারের শিল্প ঋণগ্রহীতারা আইনের ঊর্ধ্বেই থাকেন, তারা ঋণখেলাপি হলেও তাদের তেমন অসুবিধা হয় না; তাদের ঋণ বেশির ভাগ সময় অবলোপনও হয়। অন্যদিকে সামান্য কৃষিঋণের কিস্তি না দিতে পারলে কৃষকদের কোমরে দড়ি বেঁধে দেয়ার উদাহরণ আমাদের অজানা নয়। ফলে কৃষকদের ঋণের বদলে এককালীন বা নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক সাহায্য দেয়া যায় কিনা, সেটা বিবেচনা করা দরকার বলে অনেকেই বলছেন।

সরকার এসব প্যাকেজের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশী সূত্র থেকে অর্থ ধার বা অনুদান গ্রহণেরও চেষ্টা করেছে এবং করছে। সেজন্যই অনেকে বলছেন, নাগরিকদের জানা প্রয়োজন কীভাবে এসব অর্থ ব্যয় হবে, কীভাবে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা তৈরি করা হবে। তাদের অনেকেরই বিশ্বাস, অন্য যেকোনো সময়ে সরকারের যে কাঠামো আছে, তা এই সময়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা এটি একটি বিশেষ সময়। বিশেষ সময় তাই বিশেষ নজরদারির দাবি রাখে।

সাধারণ হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র। বিশেষ সময়ে বা আপত্কালে এ সংখ্যা ১৫-২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। সনাতনী কায়দায় তাদের, বিশেষ করে অতিদরিদ্রদের সহায়তার জন্য সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনীকে কাজে লাগানো হয়। এতে আমরা অতীতে রংপুরে মঙ্গা মোকাবেলা, বিশেষ এলাকায় বা সময়ে সাময়িক বেকারত্ব হ্রাসসহ অনেক উপকারও পেয়েছি।

সরকার ২০১৫ সালে সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র তৈরি করেছিল। সেই অনুসারে বাংলাদেশ পরিসখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসকে সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের একটি তালিকা হালনাগাদের দায়িত্বও দেয়া হয়। সেই রিপোর্ট আগস্টে বের হওয়ার কথা। তাছাড়া চলতি বাজেটে ৮১ লাখের কিছু উপরে লোকের জন্য ৭৪ হাজার কোটি টাকা এই কাজে বরাদ্দ আছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে মূলত সমাজকল্যাণ আর ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ ১০টি মন্ত্রণালয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রয়েছে অধিকন্তু ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’। বাংলাদেশে বিভিন্ন আপদ মোকাবেলা অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এখানে টাকার জোগান নয়, যথাক্ষেত্রে বা প্রকৃতজনদের মধ্যে টাকার বণ্টনই বড় সমস্যা। ত্রাণ মন্ত্রণালয় যদিও উপজেলা প্রশাসনকে গ্রামে কর্মরত এনজিওগুলোর সঙ্গে প্রচলিত তালিকা যাচাই-বাছাই করে নিতে বলেছে, তবে এ পর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রায়ই বাধা আসে। এমনকি উপজেলা প্রশাসনও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। অবশ্য সরকার চাইলে এবারও অন্যবারের মতো পিকেএসএফের সঙ্গে নিবন্ধিত ২০২টি বা বিশেষ বিশেষ কিছু এনজিওকে ব্যবহার করতে পারে। এতে সুফল মিলবে বৈকি। ২০০৭ সালে সিডরের পর ব্র্যাক, টিএমএমএস, আশা, ব্যুরোসহ ছযটি সংস্থা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা এবং দরিদ্রদের সহায়তায় বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। তদুপরি রয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নিয়ন্ত্রণাধীন হাজার হাজার ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান। কিছুদিন আগেই দেখলাম ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরবিআই তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০ হাজার কোটি রুপি গ্রামাঞ্চলে কর্মরত সমবায় সমিতি এবং ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার তারল্য বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ করেছে।

ব্র্যাক এরই মধ্যে শহুরে দরিদ্রদের ওপর তাদের তালিকাকে হালনাগাদ করেছে বলে খবর বেরিয়েছে। এক্ষেত্রে আবার ‘মোবাইল ট্র্যাকিং’-এ প্রাপ্ত তথ্য এমনকি এমএফএস বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ডাটাবেজও যাচাই-বাছাই করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কৃষির সমস্যা বরাবরের মতোই অনেকটা আপত্কালে চাহিদা হ্রাস। সেই সঙ্গে রয়েছে পণ্য পরিবহনে জটিলতা এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম না পাওয়া। বিভিন্ন দেশে তাই স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ধরে রাখার জন্য পণ্য সহায়তা বা সাহায্যের প্যাকেজে সবাইকে ডিম, দুধ আর অন্যান্য কৃষিপণ্য দেয়া হয়। বোরো মৌসুম শুরু হলেই সরকারের ধান-চাল ক্রয়কে চাঙ্গা করে কৃষকের পক্ষে ‘প্রাইস ট্রান্সফার’ করতে হবে। ২০০৭-০৮ সালে সিডর ও আইলা-পরবর্তীতে তত্কালীন সরকার এটা করে অনেক উপকার পেয়েছিল। এবারো  মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আট লাখ টন ধান ও ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। বেশ ভালো। তবে সামগ্রিক ত্রাণ বিশেষ করে প্রণোদনা বিতরণে এনজিও বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে সত্যিকারের উপকার নিশ্চিত করা যাবে না। গ্রামীণ অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়নে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার বিকল্প নেই। সাতজন জেলা প্রশাসক ও ২৫ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে অতিসম্প্রতি কথা বলে জানতে পারলাম এমনকি তাদেরই রয়েছে হালনাগাদ তথ্য। অনেকে এটাও মনে করেন যে ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থায় তাদের পক্ষে এত টাকা সত্যিকার ক্ষতিগ্রস্তদের খুঁজে বের করে, পরিপূর্ণ ঋণঝুঁকি বিবেচনা করে আদায়যোগ্য ঋণ হিসেবে বিতরণ সম্ভব নয়। সেখানেও বরাদ্দের কিছু অংশ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।   

                

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক