সরকারি ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুযায়ী রোববার এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। আইনের বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কিনা সেটি নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনে সময় সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো পরিবীক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক। সরকারের কাছে প্রতিবেদনও দাখিল করবেন তিনি। এখন ডিজিটাল যুগ। প্রতিটি কাজ ও নথি কম্পিউটারে সংরক্ষিত থাকে। কম্পিউটারগুলো আবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে তথ্য পাচার ও হ্যাক হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করার এখতিয়ার রয়েছে। তবে আইনের প্রয়োগ নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে। বর্তমান সরকারই সেবার মান বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ করছে। ফলে মানুষের তথ্যপ্রাপ্তি ও তথ্যের নিরাপত্তা একই সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। আশা করি, বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় থাকবে।
সরকার ঘোষিত ২৯ প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় তাদের তথ্যের নিরাপত্তা বিধান জরুরি। এর আগে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কেপিআই ঘোষণা করে সেগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৯৯৭ সালে তত্কালীন সরকার কেপিআই নীতিমালা প্রণয়ন করলেও পরবর্তী সরকার তা কার্যকর করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেও প্রথমে এ নীতিমালা কার্যকর করেনি। পরে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাংলা ভাষায় কেপিআই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সরকারপ্রধানের বাসভবন অথবা সরকারপ্রধান যেখানে বাস করবেন, সেসব স্থাপনাকে বিশেষ শ্রেণীর কেপিআই হিসেবে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এর যথাযথ গোপনীয়তা, সঠিকতা, প্রাপ্যতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যকে সুসংহত করতে গিয়ে যে তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির কারিগরি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পদক্ষেপ দরকার, সেটিই হলো ডিজিটাল সিকিউরিটি। উন্নত বিশ্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তথ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকে আলাদাভাবে দেখে রেগুলেশন করা হচ্ছে। এর কারণ, এসব দেশে প্রাইভেসি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। তথ্যের অবাধ আদান-প্রদানের এ যুগে প্রাইভেসিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়া যায়, সেটি এখন তাদের অনেক বড় চিন্তার কারণ। আধুনিক জীবনে শুধু প্রাইভেসির তথ্যই নয়, সরকারের প্রশাসন, সরকারের জরুরি কাজ সম্পাদন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ, হাসপাতালের চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক, ব্যাংকিং সিস্টেম, সংবাদমাধ্যম, রেল-বিমানের বুকিং—ধীরে ধীরে সবকিছুই তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। আর তাই তথ্যপ্রযুক্তির এ অবকাঠামোকে নিরাপদ করতে প্রাইভেসি প্রটেকশন আইনের বাইরে করা হচ্ছে সাইবার সিকিউরিটি আইন। এ ধরনের আইনে সরকারি (এবং কিছু বেসরকারি, যেমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি) গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে তথ্যপ্রযুক্তির সিস্টেমকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ, জাতীয় সরকার আর স্থানীয় সরকারের মধ্যে দায়বণ্টন, নিয়মাবলির ব্যত্যয় ধরা পড়লে নিজ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেয়া ইত্যাদি নিয়ে বিধান করা হচ্ছে।
জাপান ২০০৫-এ প্রাইভেসি প্রটেকশন আইন প্রচলন করে। সরকারি সংস্থাই বলেন, কিংবা পাড়ার লন্ড্রিই বলেন, অনুমতি ছাড়া কারো তথ্য কেউই অন্য কোনো কাজে ব্যবহার বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করতে পারবে না। প্রাইভেসির তথ্যকে সংগ্রহ, ডাটাবেসে ধারণ, প্রসেসিং কিংবা মুছে ফেলার ক্ষেত্রে সমাজের কোনো অ্যাক্টর কী কী ভূমিকা নেবে, সেগুলোর সুস্পষ্ট বিধান দিয়েই এ রকম আইন করা হয়। জাপানে আইন করে সরকারকে রিপোর্ট দেয়া সব সাইবার ইনসিডেন্ট মাসে একবার জনসমক্ষে প্রকাশ করারও বিধান আছে। কিছু ক্ষেত্রে নতুন নতুন সাইবার ক্রাইম হচ্ছে, যেগুলো বিদ্যমান আইনে শব্দ-সংযোগ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। যেমন কম্পিউটার ম্যালওয়ার তৈরি। জাপান কম্পিউটার অ্যাকসেস কন্ট্রোলবিষয়ক আইন বানিয়ে এসব সাইবার ক্রাইমের নতুন নতুন অপরাধ শনাক্ত করছে, যেগুলো তথ্য সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইংল্যান্ড করেছে কম্পিউটার মিসইউজ আইন। বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটিতে ওপরের ‘শিষ্টের পালন’জনিত বিধানগুলো অনুপস্থিত। বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের ঘটনার কথা সবার মনে থাকার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ডিজিটাল সিকিউরিটির দুর্বলতা আসলেই সমাধান করা হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। আবারো যদি হ্যাকিং হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কেন, সরকারও হয়তো জানতে পারবে না, ভবিষ্যতের কোনো অডিটে যদি এটি ধরা না পড়ে। আর আমাদের অন্য ব্যাংকগুলোর কী অবস্থা? সুইফট ও আরটিজিএস সিস্টেম তো তাদেরও ব্যবহার করার কথা। কীভাবে বুঝব তাদের মধ্যেও একই দুর্বলতা নেই, যেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল সিস্টেমে ছিল? এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তথ্যব্যবস্থার ডিজিটাল নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার আইনি বিধান ও বাধ্যবাধকতা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮-তে নেই এবং সেখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। ডিজিটাল মাধ্যমটিকে আইনের আওতায় আনতে চাইলে সরকার বিদ্যমান পেনাল কোডে ‘ডিজিটাল মাধ্যম’ শব্দ দুটি ঢুকিয়ে দিতে পারে। জাপানে সেভাবেই এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
শক্তিশালী তথ্যনিরাপত্তা আইনের একটি ভালো উদাহরণ হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘জেনারেল ডাটা প্রটেকশন রেগুলেশন’। এ আইনটি কারো বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে। নাগরিকদের সম্পর্কে কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেটা দিয়ে কী করা হবে এবং সেগুলোকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা হবে, তা জানার পূর্ণ অধিকার তাদের দেয়া হয়েছে। পরিশেষে এ আইনের মাধ্যমে নাগরিকরা চাইলে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করার অনুমতি যেকোনো সময়ে প্রত্যাহার করতে পারেন। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮-তে এ ডিটারেন্স অবজেক্টিভ অর্জন করা কি সম্ভব? এ আইন বলবৎ হওয়ার পরও আমরা দেখছি, ব্যক্তিগত আলাপের রেকর্ড মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে। যারা এ ধরনের তথ্যকে সোর্সিং করছে, সেটিকে ব্যাহত করার বিধান সরকার রাখেনি বলেই ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন এখানে কার্যকারিতা অনেকটা হারিয়েছে।
আইনের ১৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ বা ক্ষতিকর মনে হলে তা অনুসন্ধানযোগ্য বলে গণ্য হবে। এখানে ‘কার্যক্রম’ শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় সিদ্ধান্তটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছে। সেক্ষেত্রে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য পেতে কারো সমস্যা না হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা অবশ্যই সংশোধন করতে হবে।
বর্তমান সরকারের একটি ঘোষিত লক্ষ্য ও স্লোগান হচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, কিন্তু কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, প্রবিধান বা নীতিমালা চাপিয়ে দিয়ে সত্যিকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমরা আশা করি, সরকার এমন কোনো আইনকানুন, বিধিবিধান, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে না, যা তার ঘোষিত লক্ষ্য ও স্লোগানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।










