বাজারে দ্রব্যমূল্যে আগুন লেগেছে। এমন অভিযোগ ভোক্তাদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে আগামী ১৫ দিন গরু, মুরগির মাংস ও ডিম না কেনার আহ্বান। শবেবরাতেই মাংসের দাম বেড়ে গেছে এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে এবারের রমজানে ফল খাওয়া হবে বিলাসিতা, এ আশঙ্কার কথাও শোনা যাচ্ছে।
গত বছরও রমজান মাসে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের আগুনে পুড়েছে। এ বছর এমনিতেই বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে, এমন পরিস্থিতিতে রমজান মাসে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়বে কিনা এমন আশঙ্কা কুরে কুরে খাচ্ছে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে। রমজানে বাজার কি এভাবেই অস্থিতিশীল হয়ে থাকবে? বাজার নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের কি কিছুই করার নেই?
প্রতি বছর কেন এমনটা হয়? কেন বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কী কারণে দ্রব্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে না। এমন দীর্ঘশ্বাস স্বল্প আয়ের মানুষের। এর মধ্যেই বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বেড়ে গেছে। বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ সামলে সংসার চালানো দিনে দিনে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তার পরও জীবিকার তাগিদে খরচে কাটছাঁট করে হলেও রাজধানী ঢাকায় থাকতে হচ্ছে সীমিত আয়ের কর্মজীবীদের।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ বাড়লে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। রমজান মাস উপলক্ষে টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে নিম্ন আয়ের এক কোটি কার্ডধারী পরিবারের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দুই পর্বের এ বিক্রয় কার্যক্রম ডিলারদের দোকান বা নির্ধারিত স্থায়ী স্থাপনা থেকে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় অনুযায়ী পরিচালনা করা হবে। এভাবে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী টিসিবির মাধ্যমে চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, ছোলা ও খেজুর বিক্রির এ উদ্যোগ যদি সফল হয়, তাহলে অন্তত বাজারে ভারসাম্য আসবে এ আশা করা যায়। কিন্তু এটি আসলে সামগ্রিক সমাধান নয়। যে কারণে টিসিবির কার্ডের সংখ্যা আরো বাড়ানো হতে পারে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভাবলেই চলবে না, এ শহরের মধ্যবিত্তরাও যেন রমজান মাসে স্বস্তি পায় সেজন্য টিসিবির পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে টিসিবিকে অধিক কার্যকর করার বিকল্প নেই সেটিই প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রয়োজনে ২০২১ সালের মতো ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বছর প্রতিকূল সময়ে রমজান মাস নতুন দুশ্চিন্তা নিয়ে এসেছে। সীমিত আয়ের মানুষের খাবার ব্রয়লার মুরগির দাম সর্বকালের রেকর্ড করেছে। গরুর মাংসের দাম আরেক দফা বেড়ে গেছে। যে কারণে আগে গরু বা মুরগির মাংস ভাগা করে বিক্রি করা মহানুভবতার পরিচয় হলেও এখন এটিই যেন চেনা দৃশ্য হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বেশি দামে মুরগি কেনার অভিযোগ করছেন। তবে এক্ষেত্রে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও অনিয়মের সন্ধান পেয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি মুরগির বাজার কাপ্তান বাজারে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় ব্যবসায়ীরা মুরগি কেনার রসিদ দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পোলট্রি খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধসহ সবকিছুর দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে খরচ বাড়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। এক্ষেত্রে পোলট্রি ব্যবসায়ীরা সরকারকে মুরগি ও ডিমের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে দেয়ার অনুরোধ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সাড়া দেয়া উচিত।
বাজারে অস্থিতিশীলতার জন্য ডলার সংকটে এলসি না খুলতে পারা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে সংকটসহ নানা অভিযোগ করা হয়। এদিকে কৃষক খাদ্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, কৃষিজমিতে উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন মাধ্যম হয়ে বাজারে আসার পর বর্ধিত মূল্যে বিক্রি হয়। অর্থাৎ দ্রব্যমূল্যের যে আগুনে ভোক্তাদের পুড়তে হয়, তার উপযুক্ত লভ্যাংশ কিন্তু কৃষক পান না। পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় পথিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার বাড়তি মূল্য পাওয়ার আশায় পণ্য মজুদ করে রাখার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। সব মিলিয়ে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ বটে।
এটা সত্য, ঢালাওভাবে সব ব্যবসায়ীকে দোষারোপ করা যাবে না। কিন্তু একশ্রেণীর ব্যবসায়ী যে রমজান মাস এলেই চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নেন, সেটিও অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তাহলে বাজার কি এভাবেই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সরকারের কি কিছুই করার নেই? সাধারণ মানুষের আর্তনাদ কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুনতে পাচ্ছে?
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অনাবাদি জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর যে আহ্বান জানানো হয়েছে, সেক্ষেত্রেও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। তবে এ পরিপ্রেক্ষিতে যে আশু সমাধান হবে না সেটিও লক্ষণীয়। তবে তার পরও অনাবাদি জমি উৎপাদনে কাজে লাগাতে পারলে নিজেদের ঘরের উঠোন বা ছাদে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করা যাবে। এ উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রী গত বছর বললেও সত্যিকার অর্থে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা ফুটে ওঠেনি। অর্থাৎ আমরা ধরেই নিয়েছি এখনো যেহেতু কোনো সংকট আসেনি, তাই সংকট মোকাবেলায় আলাদা কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই। যখন সংকট আসবে, তখন না হয় দেখা যাবে। এখন কোনোভাবে দিনগুলো অতিবাহিত করতে পারলেই হবে।
এখন বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সিন্ডিকেট। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে যেন সিন্ডিকেট তৈরি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এজন্য শুধু কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করলেই সিন্ডিকেটকে দমানো যাবে না। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে কিনা সেটি নিয়মিত তদারক করতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে রমজান মাসকে বাণিজ্যের উপায় হিসেবে না দেখার মানসিকতা লালন করা। এটি ব্যবসায়ীদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সারা মাস বাজারে না গিয়ে রমজানের আগেই সব বাজার একসঙ্গে করে ফেলার মানসিকতাও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এতে বাজারের ওপর চাপ পড়ে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় দিন এনে দিন খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। একজন ক্রেতা হিসেবে অন্য ক্রেতার কথা চিন্তা করাও ব্যবসায় নৈতিকতার একটি বিষয়। যেটি ক্রেতারা করতে চায় না বলে উন্নত বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সীমা নির্ধারণ করা হয়।
যা-ই হোক, রমজান মাস দুয়ারে কড়া নাড়ছে। শাবান মাসের ২৯ বা ৩০ তারিখেই নির্ধারণ হয়ে যাবে রমজান কবে শুরু হচ্ছে। সংযমী হওয়ার এ মাস নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সময়ে নৈতিকতার যে চর্চা মুসলিমরা করে, তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে না। নিম্ন আয়ের মানুষ কষ্ট করে রোজা রাখে। রাতের শেষভাগে আলো ঝলমলে হোটেলগুলোয় ‘সাহরি নাইট’ আয়োজিত হয়, দিন শেষে ইফতার পার্টির মহোৎসব চলে। সব মিলিয়ে এ সময়ে যে উৎসবমুখর মানসিকতায় হাসিমুখে বাজার থেকে ফেরার কথা, সেটি না হয়ে উদ্বেগের ছায়াই বৃদ্ধি পায়। রমজান মাস এসে আবার চলেও যাবে, চলমান ঊর্ধ্বগতির বাজারে আসন্ন রমজানেও ভারসাম্য আনা যেন মিথে পরিণত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার সতর্ক দৃষ্টিই আমাদের কাম্য।
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










