১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবন থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’—এই নামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে এ পর্যন্ত অনেক লেখালেখি ও নানা কাহিনী বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার পরেও অনেক কথা থেকে যায়। নানাজনের বক্তব্যের পরও প্রত্যক্ষভাবে এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে এখানে ওই সময়ের ঘটনা বর্ণনা করলাম।
আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলনের যে উদাত্ত আহ্বান জানান, তাতে সারা বাংলাদেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) সব অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এক কথায় সারা বাংলাদেশ অচল হয়ে পড়ে এবং জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারা বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল। এ কার্যকলাপ বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে তখন যাদের অন্ততপক্ষে আট-নয় বছর বয়স ছিল, তাদেরও একথা স্মরণ আছে বলে আমার বিশ্বাস। সারা বিশ্ব এই অসহযোগ আন্দোলনকে অভূতপূর্ব সাড়া বলে মতামত ব্যক্ত করেছে। তখন আমি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে প্রিভেন্টিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তখন সপরিবারে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনিতে বসবাস করতাম। আমি একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করি। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম পোর্টের দৈনন্দিন কাজকর্মের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম পোর্ট ও কাস্টম হাউজকে পরবর্তী সময়ে অসহযোগ আন্দোলন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
২৫ মার্চ ১৯৭১, রাতে রাজধানী ঢাকার নিরীহ জনসাধারণ, বাঙালি সামরিক অফিসার, জোয়ান ও পুলিশ বাহিনীর ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের সংবাদ চট্টগ্রামে পৌঁছলে ২৬ মার্চ সকাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারি কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। এর আগে ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে আনুমানিক ২টা থেকে ৩টার মধ্যে মাইকযোগে প্রচার করা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সারা রাত মানুষের চোখে ঘুম আসেনি। সবাই স্বাধীনতা ঘোষণার কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল। এরই মধ্যে জনসাধারণের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত এক নির্দেশাবলি টেলিগ্রাম আকারে ইংরেজিতে সকাল থেকে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়। দেশের অন্যান্য অংশে কী অবস্থা বিরাজ করছিল তা জানার জন্য মানুষ উদগ্রীব অবস্থায় অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ বরিশালের জনৈক বন্ধু আবদুল মালেক এবং তত্কালীন আগ্রাবাদ কলোনির রেশন শপের মালিক আনুমানিক সকাল ৮টার সময় মোটরসাইকেলযোগে আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত বাণীর এক কপি আমাকে দিয়ে যান। এর বাংলা অনুবাদ করেন তত্কালীন আগ্রাবাদ সরকারি কলোনির সেক্রেটারি শফিউদ্দিন আহমেদ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) এবং তাকে সাহায্য করেন চট্টগ্রামস্থিত আমদানি ও রফতানি অফিসের (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সহকারী কন্ট্রোলার মোজাম্মেল হক। সর্বপ্রথম সরকারি কলোনি মসজিদের (আগ্রাবাদ) মাইকযোগে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার করা হয়। ওই টেলিগ্রামের মর্মকথা ছিল—‘রাজারবাগ ও পিলখানায় (ঢাকায়) শত সহস্র বাঙালি পুলিশ ও আর্মির লোকদের পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। তোমাদের কাছে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো এবং শত্রুদের হাত হতে বাংলাদেশকে মুক্ত করো, জয় বাংলা।’
বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়ে তার নির্দেশাবলি বেতার মারফত দেশবাসীর উদ্দেশে প্রচার করা যায় কিনা, তা নিয়ে অনেকেই অসার চিন্তাভাবনা করি এবং আরেকটি বিষয় ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়, তা হলো সশস্ত্র যুদ্ধে গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা। এ ব্যাপারে তাত্ক্ষণিকভাবে কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরই মধ্যে বেবিট্যাক্সিতে মাইকযোগে আগ্রাবাদ, ফকিরহাট ও দেওয়ান হাট এলাকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করি। আমার সঙ্গে তখন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের ট্রেজারি সেকশনের ফজলুল হক (বর্তমানে সুপার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত) ও মো. আলম নামে আরেকজন সহযোগী ছিলেন। রেডিওর ব্যাপারে অনেকেই উৎসাহ দেখান। পরবর্তী সময়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে তত্কালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এমএ হান্নানের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা হই। চট্টগ্রাম জিপিওর সামনে কিছু লোক ও কর্মীর সঙ্গে আলোচনা অবস্থায় তাকে দেখতে পাই। তখন তার বাসা ছিল জিপিওর দক্ষিণ পাশে আলকরণ মহল্লায়। আমরা একে অন্যের পরিচিত ছিলাম। আমি হান্নান সাহেবকে বিস্তারিতভাবে সব ঘটনা বলি। তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘তোমরাও কি উহা পেয়েছ?’ আমি বললাম, ‘জি পেয়েছি। আপনি যদি এখন দয়া করে আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে যান তাহলে রেডিও অফিসের কর্মকর্তারা আপনার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলে আমি মনে করি।’ কারণ তখন রেডিও অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কাজ করছিলেন। আমার কথা শোনার পর পরই এমএ হান্নান সাহেব আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে আসার জন্য রাজি হন এবং সেখানে ঠিক করা হলো যে এমএ হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি তাড়াতাড়ি আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে যাও ও তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সব ঠিক করো। আমি ১ ঘণ্টার মধ্যে আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে পৌঁছব।’ এই বলেই আমাকে বিদায় দিলেন। তখন আনুমানিক সকাল ১০টা। পরে আমি অতিকষ্টে আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে পৌঁছি কিন্তু অফিসে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে পেলাম না। এরই মধ্যে জানতে পারলাম যে দেশে মার্শাল-ল জারি করা হয়েছে। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনিতে কয়েকজন রেডিও অফিসারের বাসা থাকলেও কারো বাসা আমার জানা ছিল না। তত্কালীন সহকারী কন্ট্রোলার (শিপিং) এককালীন স্কুলবন্ধু ও কলোনির বাসিন্দা আবদুস শুক্কুরের [বর্তমানে ডেপুটি কন্ট্রোলার (শিপিং)] সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারলাম তার বাসার দক্ষিণ পাশে ‘ডি’ টাইপ কোয়ার্টারে চট্টগ্রাম রেডিও কেন্দ্রের রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ার মির্জা নাছির উদ্দিন সাহেব সপরিবারে থাকেন।
আমি তখন কয়েকজন কলোনিবাসীকে নিয়ে মির্জা নাছির সাহেবের বাসায় যাই। তিনি আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। তাকে বিস্তারিত ঘটনা অবগত করি এবং হান্নান সাহেবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করি। তিনি ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি ঘর থেকে বের হতে ইতস্তত করছিলেন। এরই মধ্যে মির্জা নাছির সাহেবের বাসার সামনে অনেক লোক সমবেত হয়েছে। তখন আগ্রাবাদ সরকারি কলোনির চারদিকে বাউন্ডারি ওয়াল ছিল না। দেখতে পেলাম এক ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে লোকজনের ভিড় দেখে মির্জা সাহেবের বাসার সামনে থামলেন এবং বাসায় এসে আমাকে ঘটনার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আমাদের দলীয় লোক মনে করে সব ঘটনা তাদের কাছে প্রকাশ করলাম। আমি বারবার মির্জা সাহেবকে অনুরোধ করছিলাম কিন্তু মির্জা সাহেব যেহেতু নিরাপত্তার অভাবে রেডিওতে যেতে চাইছেন না, তখন ওই গাড়ির মালিক মির্জা সাহেবকে তার গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেবেন বলে আশ্বাস দেয়ায় মির্জা সাহেব পরিবার-পরিজনের আপত্তি সত্ত্বেও আমাদের সঙ্গে বাইরে এসে পড়েন। পরে জানতে পেরেছিলাম, গাড়ির মালিক ছিলেন হাবিবুর রহমান, তিনি আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা (বাড়ি নং-২৭১/ রোড নং-৬)। তার গাড়িখানার নং চট্ট-খ-৪৫ (১৯৬৭) মডেল। এখনো চলমান অবস্থায় আছে। তার সঙ্গী এমএ হাশেম একটি বাণিজ্যিক সংস্থায় কাজ করেন বলে জানা যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর মির্জা সাহেবই বললেন, একজন রেডিও ইঞ্জিনিয়ার না হলে তিনি একা কাজ করতে পারবেন না। রেডিও ইঞ্জিনিয়ার আবদুস ছোবহান সাহেব আগ্রাবাদ কলোনিতে থাকেন বিধায় তাকে সঙ্গে নেয়া হলো। এরই মধ্যে খবর এল, হান্নান সাহেব আগ্রাবাদ রেডিও অফিসে পৌঁছেছেন। হান্নান সাহেবের সঙ্গে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী ছিলেন। আমাদের সঙ্গে একজন ছাত্রকর্মীও ছিলেন, অনেক পরে নাম জানতে পারি। তিনি ছিলেন বাবু রাখাল চন্দ্র বণিক, বর্তমানে তিনি একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে কার্যরত। পরে এমএ হান্নান সাহেবের সঙ্গে সবাই পরিচিত হন। হান্নান সাহেব বঙ্গবন্ধুর বাণীর মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাইলে মির্জা নাছির ও মো. আ. ছোবহান রেডিও চালু করতে রাজি হন। কিন্তু মির্জা সাহেব জানালেন যে চট্টগ্রামের বেতার অপেক্ষা কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচার করা সহজতর হবে। আবার ছোবহান সাহেব আমাদের বললেন, এখান থেকে ব্রডকাস্টিং করা হলে আমরা সবাই ধরা পড়তে পারি। তখন মাঝেমধ্যে নেভির জাহাজ থেকে শহরের দিকে গোলাগুলি হচ্ছিল। আমাদের কারো ধারণা ছিল না যে কালুরঘাটে একটা ব্রডকাস্টিং সেন্টার আছে। তাড়াহুড়া করে আমরা সবাই আগ্রাবাদ রেডিও অফিস থেকে কালুরঘাটের দিকে রওনা হলাম। ছোবহান সাহেবই গাড়ির চালককে পথ দেখিয়েছিলেন। পথে ছোবহান সাহেব আরো প্রস্তাব করলেন যে বাদুড়তলা, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলায় থাকেন রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খান ও দেলোয়ার হোসেন। তাদেরকেও আমাদের সঙ্গে নিতে হবে। ছোবহান উভয়ের বাসা চিনতেন। মোসলেম খানের বাসার সামনে গাড়ি থামিয়ে তাকে অনুরোধ করলে তিনি রাতের শিফটে যাবেন বললে তাকে আর চাপাচাপি করা হয়নি। অবশ্য মির্জা নাছির, হান্নান ও অন্যদের সঙ্গে মোসলেম খানকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং বললেন যে তাকে সবসময় পাওয়া যাবে। পরে দেলোয়ার হোসেন সাহেবের বাসায় গিয়ে তাকে অনুরোধ করলে তিনি আমাদের সঙ্গে যেতে তত্ক্ষণাৎ রাজি হন। অবশেষে আমরা সবাই কালুরঘাটে পৌঁছলাম। তখন কালুরঘাট রেডিও অফিসে কোনো লোকজন ছিল না। একজন পাহারাদার ছিল, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, তার নাম ছিল মমিনুর রহমান। তিনি মির্জা নাছির, আ. ছোবহান ও দেলোয়ার হোসেনকে দেখে গেট খুলে দিলেন। (চলবে)
[নিবন্ধটি দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় ১৯৯২ সালের স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত।]
এমএ হালিম: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা










