গত এপ্রিলের মাঝামাঝি দেশের হাওড় অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে, যদিও কৃষি শ্রমিকের সংকটে প্রথম দিকে ধান কাটার গতি ছিল খুবই মন্থর। তবে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা, বাইরের জেলাগুলো থেকে কৃষি শ্রমিক আসায় বর্তমানে ধান কাটা পুরোদমে চলছে। ২৯ এপ্রিল কৃষিমন্ত্রীর এপ্রিলের বক্তব্য থেকে জানা যায়, হাওড় অঞ্চলে এরই মধ্যে ৬৫ শতাংশ বোরো ধান কৃষক ঘরে তুলতে পেরেছেন। এরই মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। অল্প দিনের মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হবে। এদিকে সরকার ঘোষিত তারিখ ২৬ এপ্রিল বোরো ধান সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু হয়নি মর্মে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে ধানচাষীরা, বিশেষ করে দেশের হাওড় অঞ্চলের ধানচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ৩০ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাওড় অঞ্চলে বোরো ধান সংগ্রহের জন্য ধানচাষীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে এ অঞ্চলে বোরো ধান সংগ্রহ কর্মকাণ্ড শুরু হতে পারে। ফলে বোরো ধানচাষীদের শুধু সরকার ঘোষিত দামের চেয়ে কম দামে নয়, বরং উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ফড়িয়া ও চালকল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরুতে আর কেন দেরি নয়, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গত ৮ এপ্রিল সরকার চলতি মৌসুমে উৎপাদিত বোরো থেকে ছয় লাখ টন ধান, সাড়ে ১১ লাখ টন চাল অর্থাৎ মোট সাড়ে ১৭ লাখ টন বোরো ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীতে চলমান নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ‘মানুষকে খাবারে সহযোগিতা দিতে’ ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ লাখ ২০ হাজার টন বোরো ধান-চাল সংগ্রহের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রয়েছে আট লাখ টন ধান, ১২ লাখ ২০ হাজার টন চাল (সিদ্ধ চাল ১০ লাখ টন এবং আতপ চাল ২ লাখ ২০ হাজার টন)। কেজিপ্রতি ধানের দাম ২৬ টাকা, সিদ্ধ চালের দাম ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী ২৬ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা। চাল সংগ্রহ কার্যক্রম ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা।

চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ২ কোটি ৪ লাখ ৩০ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আবাদি জমির লক্ষ্যমাত্রা ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার সেক্টর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে ২৪ এপ্রিল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাওড় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের সাত জেলা—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে।  

যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ এবং দাম নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে সেগুলো হলো, এক. ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে ধানচাষী, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহী হন। দুই. খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদ গড়ে তোলা। তিন. বাজারে চালের দাম বাড়লে সরকারি মজুদ থেকে খোলাবাজারে (ওএমএস) ও ন্যায্যমূল্যের দোকানে চাল বিক্রির মাধ্যমে দাম স্থিতিশীল রাখা। চার. সরকারের লক্ষ্যমুখী খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা। পাঁচ. কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ও চালকল মালিক পর্যায়ে চাল তৈরির খরচ বিবেচনায় নিয়ে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা।

সরকার নির্ধারিত তারিখে ধান সংগ্রহ শুরু না হওয়া এবারই প্রথম নয়। এর আগেও সরকার নির্ধারিত তারিখে আমন ও বোরো ধান সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় কৃষক, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের তারিখ ২৫ এপ্রিল নির্ধারণ করা হলেও তা দেরিতে শুরু হওয়ায় ধানচাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। মৌসুমের শুরুতেই সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে মজুদ গড়েছেন চালকল মালিক ও মজুদদার (১৮ জুন, ২০১৯, বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

আবাদযোগ্য জমি আছে দেশের এমন কৃষক পরিবারগুলোকে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—এই চার শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। নিজের জমি আছে এমন চাষীদের সিংহভাগই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণীভুক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাত দিয়ে ১৬ এপ্রিলের দ্য ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বোরো মৌসুমে (২০১৯-১৮) ১ কোটি ৬৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৪ জন ধানচাষীর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ ক্ষুদ্র এবং ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ ছিলেন প্রান্তিক চাষী। এছাড়া রয়েছেন ভূমিহীন চাষী, যারা বর্গা বা লিজ নিয়ে অন্যের জমি চাষ করেন। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষী পরিবারগুলো ফসল উৎপাদন কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। এরা ধারদেনা করে ফসল ফলায়। এদের সংসারে নানা অভাব-অনটন লেগেই আছে। এরা চাল বিক্রি করে না। ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের নানা অভাব-অনটন মেটাতে তাদের মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে হয়।

‘ধানের দাম পাচ্ছেন না হাওড়ের কৃষক’ শিরোনামে বণিক বার্তার ১ মের এক প্রতিবেদনে হাওড়াঞ্চলের জেলাগুলোর বেশ কয়েকজন ধানচাষীর সাক্ষাত্কার স্থান পেয়েছে। তারা জানিয়েছেন, এক মণ ধান আবাদ করতে তাদের ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়েছে। সরকার ধান কেনা শুরু না করায় শ্রমিক ও ধান কাটার বেপারির খরচ মেটাতে, সুদসহ মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতে, নিজের পরিবারের খরচ ও চাহিদা মেটাতে তারা বাধ্য হয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৪২ টাকার পরিবর্তে এক মণ ধান ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় ফড়িয়া ও চালকল মালিকদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের ধান উৎপাদন খরচও উঠছে না। তারা আরো জানিয়েছেন, সরকার ধান সংগ্রহ শুরু না করায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিচ্ছেন।

প্রচলিত অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালায় সরকার চাল সংগ্রহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আসছেন চালকল মালিকরা। তারা অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। তারা অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহে চালের উচ্চমূল্য দাবি করেন এবং ধান কেনায় সরকারকে নিরুৎসাহিত করেন অথবা ধানের দাম কম রাখার জন্য সরকারকে চাপ দেন। কারণ সরকার ধান না কিনলে বা স্বল্প পরিমাণে কিনলে ধানের দাম কম থাকে এবং তারা কম দামে ধান কিনে বিপুল মজুদ গড়তে পারেন। এর ওপর সরকার ধান সংগ্রহ কর্মকাণ্ড দেরিতে শুরু করলে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষীদের মৌসুমের শুরুতে ধান বিক্রির বাধ্যবাধকতা বুঝে চালকল মালিকরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে চাষীদের কাছ থেকে ধান কিনতে পারেন। ধান কাটার মৌসুম শেষে যখন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে ধান মজুদ থাকে না, তখন চালকল মালিকরা মজুদ ধান চালে রূপান্তর করে চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে সরবরাহ করেন এবং সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে অবশিষ্ট চাল উচ্চমূল্যে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করেন।

এবারো সরকার নির্ধারিত তারিখের দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরে বোরো ধান সংগ্রহ শুরুর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তা ফড়িয়া, চালকল মালিক ও মজুদদারদের নির্ধারিত দামের অনেক কম দামে ধান কেনা ও মজুদ করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মনে রাখতে হবে বোরো আমাদের প্রধান ধান ফসল। গত ১০ বছরে দেশে চাল উৎপাদনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে উৎপাদিত চালের ৫৪ থেকে ৬০ শতাংশ এসেছে বোরো থেকে। ধানের ন্যায্য দাম না পেলে ধানচাষীরা আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে তারা বোরো ধান চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, এ বছর বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ শতাংশ কম হবে। প্রধান কারণ হলো, গত দুই অর্থবছরে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বোরো ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষক এবার কম জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘চলতি বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে।’ (বণিক বার্তা, ১৪ এপ্রিল)।

সব শেষে বলতে চাই, কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করে অবিলম্বে সরকারি বোরো ধান সংগ্রহ কর্মকাণ্ড শুরু হোক। মনে রাখতে হবে চলমান নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছয় মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হলে এবং অন্যান্য উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে পড়লেও কৃষকরা করোনার মধ্যেও কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রেখে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন। তাই আমাদের সবসময় তাদের স্বার্থের প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক খাদ্য সচিব

latifm43@gmail.com