নিয়মিতভাবেই রফতানির উদ্দেশ্যে জাহাজীকৃত পণ্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি। সে রফতানির বিপরীতে আয় প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রকাশ করে রফতানির বিপরীতে রাজস্ব আয়ের হিসাব। কারো তথ্যের সঙ্গেই কারো তথ্যের মিল নেই। মঙ্গলবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে তিন সংস্থার পরিসংখ্যানের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে রফতানি হিসাবের গ্রহণযোগ্যতা বা আস্থা এবং এর সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যানে নীতি প্রণয়নেও সমস্যা হয়। ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক আরোপ করা হলে তার কার্যকারিতা থাকে না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেয়, সেখানেও জটিলতা সৃষ্টি হয়। রফতানি আয় দেশে না আসার পেছনে অসাধু বাণিজ্যিক চর্চার অভিযোগটিও একেবারে অবহেলার মতো নয়। যেকোনো দেশ থেকে অর্থ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও ফাঁক গলে অসাধু ঘটনা ঘটছে বলে খবর মিলছে, অনুসন্ধানে কয়েকজন চিহ্নিতও হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের নজরদারি আরো জোরদার ও তথ্য সমন্বয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সব তথ্য ও পরিসংখ্যান সমন্বয় হওয়া উচিত।

রফতানি ও প্রকৃত রফতানি আয়ের পার্থক্যের সমস্যা ভারত ও পাকিস্তানেও বিদ্যমান। এক্ষেত্রে উভয় দেশই তিন মাস পর রফতানি আয়ের তথ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ এপ্রিলের রফতানি আয়ের তথ্য জুলাইয়ে প্রকাশ হয়। এতে আয়ের সমন্বয় ঘটে এবং ওই মাসের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়। শুধু তা-ই নয়, ভারতে রফতানির তথ্য সমন্বয়ে স্বতন্ত্র বোর্ড রয়েছে যেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ হিসাব করে কোন মাসে কত রফতানি আয় আসে সেটি। এটি এপ্রিল না মে মাসের রফতানি আয় তা স্পষ্ট হওয়া যায় না। তাছাড়া যেসব কারণে রফতানি আয় কম আসতে পারে সেগুলো আমলে নিয়ে পরিসংখ্যান শুদ্ধ করার প্রচেষ্টাও লক্ষ করা যায় না। বিশ্বের প্রতিটি দেশ রফতানি আয়ের একটি তথ্য প্রকাশ করে। আর বাংলাদেশে তিনটি উৎস থেকে এটি প্রকাশ করায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্রুতই এটি দূর করা প্রয়োজন। রফতানি আয়ের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যদের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ভিন্ন তথ্যের জটিলতা কমে আসবে। তবে কোনো রফতানিকারক কর্তৃক অর্থ ফেরত আনতে না পারা বা বিলম্ব হওয়ার যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন করতে না পারলে তাদের সব সুবিধা বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে যৌক্তিক ও উপযুক্ত কারণে কেউ অর্থ ফেরত আনতে না পারলে তার সব ধরনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আলাদা সেল থাকা আবশ্যক। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দক্ষ প্রতিনিধিদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কমিটিকে অবশ্যই কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে রফতানি আয়ের প্রত্যাবাসন তদারকি এবং উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে।

রফতানি আয় কম আসার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অর্থ পাচার। সাধারণত আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার হয় বেশি। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রফতানির ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) অর্থ পাচারের অন্যতম কৌশল। এছাড়া ভুয়া রফতানি এলসি এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করা প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজটি যেহেতু অপেক্ষাকৃত জটিল, সেহেতু পাচার রোধের বিষয়টিতে জোর দেয়া উচিত বেশি। অন্যদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রফতানি আয়ের পরিপূর্ণ ও যথাযথ তথ্য নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে রফতানি আয়ের সমন্বয়ের বিষয় থাকলে দ্রুতই সেটি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রফতানি আয় দেশে ফেরত না আসার সঙ্গে অনেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্রের অভিযোগ করছেন। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবি তদন্ত করে দেখবে বলে প্রত্যাশা।

রফতানি আয় প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশকিছু নিয়ম, শর্ত ও নির্দেশনা রয়েছে। বিদ্যমান নিয়মে রফতানি পণ্য জাহাজীকরণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ দেশে আনতে হয়। কারো অর্থ না এলে তিনি নগদ সহায়তা ও ব্যাংকিং সুবিধা পান না। কিন্তু নিয়মটি খুব বেশি কড়াকড়ি করে পালন করা হয় না। তাছাড়া রফতানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকাতে রফতানি পণ্যবাহী যানগুলো ট্র্যাকিং ও স্ক্রিনিং করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রফতানি পণ্য পাঠাতে ব্যবহৃত জাহাজ ও কনটেইনারের ওপর বিশেষ নজর দিতে বৈদেশিক লেনদেনে জড়িত অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপেও সুফল মিলছে না। এক্ষেত্রে রফতানি আয়ের প্রকৃত হিসাব পেতে সেন্ট্রাল ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ইপিবি ও উদ্যোক্তাদের তথ্য সন্নিবেশ ও যাচাইয়ের সুবিধা থাকবে। তবে প্রতিটি ইস্যুই যথাযথভাবে যাচাই হতে হবে।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, রফতানিতে ডিসকাউন্টের চর্চাও রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের গরমিলের বড় কারণ। নির্ধারিত পণ্যের সঙ্গে রফতানি হওয়া পণ্যের মানে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ক্রেতারা ডিসকাউন্টেড মূল্যে পণ্য গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় জাহাজীকরণ হওয়া পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইপিবি যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, সেখানে ডিসকাউন্টের কোনো হিসাব থাকে না। তবে প্রাপ্ত অর্থে ডিসকাউন্টের প্রতিফলন দেখা যায়। আবার অনেক সময় মূল ঋণপত্রের বিপরীতে আংশিক রফতানি হয় আমদানিকারকের অনুমতি নিয়ে। এক হাজার পিস পণ্যের ঋণপত্রের রফতানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৬০০ পিস। কিন্তু বিল অব এন্ট্রির ঘোষণা অনুযায়ী রফতানি হয় এক হাজার পিস হিসেবে। কিন্তু যখন অর্থ পরিশোধ হয় ৬০০ পিসের, স্বাভাবিকভাবেই তা কম হয়। এনবিআর তার অধীন সংস্থার মাধ্যমে রফতানি পণ্যের জাহাজীকরণ বা শিপমেন্টের পরিসংখ্যান আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করে। আর এনবিআর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশের সামগ্রিক রফতানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ইপিবি। তাছাড়া রফতানির বিপরীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রাপ্তির হিসাব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থবছর শেষে তিন প্রতিষ্ঠান থেকে মেলে তিন ধরনের পরিসংখ্যান। এতে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে, বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের দেখা উচিত তারা রফতানির পরিমাণ-সংক্রান্ত কী তথ্য পাচ্ছে। কম বা বেশির বিষয়গুলো শনাক্তের পর কারণগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। রফতানি ও অর্থপ্রাপ্তির পার্থক্য কমিয়ে আনতে এ তিন সংস্থার সমন্বিত প্রয়াস জরুরি।

আমদানি বিল পরিশোধ ও রফতানি বিল দেশে আনছে কিনা তা তদারক করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে ড্যাশ বোর্ড চালু করে। ওই সময় থেকে অনলাইনে রফতানি তথ্য সংগ্রহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল রফতানির অর্থ যথাসময়ে ফেরত নিয়ে আসা। এটি একটি মনিটরিং টুলস। এর মাধ্যমে একটি ব্যাংকের কোন এলসিতে কী পণ্য কেনাবেচা হচ্ছে, কী পরিমাণ অর্থায়ন করতে হচ্ছে, কবে পেমেন্ট হবে সব তথ্যই জানা যাবে। সহযোগিতার অভাবে ব্যবস্থাটি পরিপূর্ণভাবে কাজ করছে না বলে খবর মিলছে। রফতানি বাবদ প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ সবসময়ই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেরিতে আসে। কভিডের সময়ে অর্থ পরিশোধের সময়সীমা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে প্রাপ্ত অর্থে। প্রত্যাবাসন সক্ষমতা বাড়াতে রফতানিকারকদের চুক্তিগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা জরুরি। সেজন্য দ্রুত এ-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ বা ভিয়েনা কনভেনশনে সই করা প্রয়োজন।