ডলার সংকটের কারণে ওষুধ, ওষুধ শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে। জটিল পরিস্থিতিতে রোগীর জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত ওষুধের আমদানিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) অতিপ্রয়োজনীয় এসব ওষুধের আমদানি কমেছে ৯১ শতাংশ। ওষুধের পাশাপাশি কমেছে কাঁচামাল আমদানি। একই সঙ্গে কমেছে ওষুধ শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও। দেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। বর্তমানে আমদানিকারকদের কাঁচামাল আনতে এলসি বা ঋণপত্র খুলতে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহে সংকট দেখা দেয়ার উপক্রম হয়েছে। কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খুলছে না ব্যাংকগুলো। কাঁচামালের যে মজুদ আছে তাতে খুব বেশি হলে দু-তিন মাস চলা যাবে বলে জানা যাচ্ছে। অনেক কোম্পানি এরই মধ্যেই সংকটে পড়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ। এক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহে সংকট যাতে দেখা না দেয় সেদিকে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে।

ডলার সংকটের কারণে সম্প্রতি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও মেডিকেল ডিভাইস আমদানির এলসি খোলা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। প্রায় তিন মাস ধরে এসব পণ্যের এলসি খোলা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বাজারে এখন চাহিদা অনুযায়ী এসব পণ্য না পাওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুতকৃত যেসব ওষুধ আমদানি করা হতো তা এখন প্রায় বন্ধ। এলসি খুলতে না পারায় এমনটি হয়েছে। ডলার সংকটের কারণে ওষুধ আমদানির পরিমাণ কমেছে। দেশে প্রধানত ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনিসহ বেশকিছু রোগের ওষুধ আমদানি করা হয়। ঘাটতি পড়লে সব ওষুধেরই পড়বে, কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের পড়বে না। কারণ ওষুধ প্রস্তুতে ব্যবহৃত কাঁচামালের ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। কিন্তু এর বিপরীতে এখন এলসি খুলতে চায় না ব্যাংক। এখন যে কাঁচামাল আছে সেটুকু দিয়ে সর্বোচ্চ তিন মাস চলা যাবে। দু-আড়াই মাস ধরে প্রয়োজনীয় অংকের এলসি খুলতে পারছেন না কাঁচামাল আমদানিকারকরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে পেট্রোকেমিক্যালের দামের ঊর্ধ্বগতি। এছাড়া তুরস্কের বর্তমান অবস্থাও খারাপ। সর্বোপরি বৈশ্বিক অবস্থা ভালো না। ফলে আমরা একা একা ভালো থাকতে পরি না। এছাড়া ডলারের সংকট রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে কাঁচামালের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আমরা খারাপ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছি। এলসি খুলতে চায় না ব্যাংক। আমরা প্রাইভেট ব্যাংকে এলসি খুলতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে খুলতে চায় না। তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের এলসি খুলে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। আর কাঁচামাল সংকট হলে তখন তো পাওয়া যাবে না। আগামী মাস থেকেও সংকট তৈরি হতে পারে। দুই মাসের মতো সময় ধরে চাহিদা অনুযায়ী এলসি খোলা যাচ্ছে না। জীবন রক্ষাকারী মেডিকেল ডিভাইস চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করতে না পারায় হৃদরোগের অস্ত্রোপচার আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে হৃদরোগে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে। মানবদেহের হৃদযন্ত্রের ভালভ রক্ত সঞ্চালনকে স্বাভাবিক রাখে। এ ভালভ অকেজো হয়ে পড়লে অকার্যকর হয়ে পড়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ হৃদযন্ত্র। তখন কৃত্রিম ভালভ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বর্তমানে আমদানিনির্ভর এ ভালভের সংকট খুব বেশি। একই সঙ্গে সংকট দেখা দিয়েছে হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের সময় রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখার অক্সিজেনেটরেরও।

উদ্যোক্তারা এলসি খোলার জন্য পর্যাপ্ত ডলার পাচ্ছেন না। এলসি খোলার অনুমোদন দিতে ব্যাংকগুলো বেশি সময় নিচ্ছে, এতে লিড টাইম দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ আমদানিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, গত অর্থবছরে কভিডের ভ্যাকসিন ও কভিড টেস্ট কিট আমদানির চাপ ছিল। চলতি অর্থবছর এ চাপ নেই। ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ ব্যাপক মাত্রায় কমে যাওয়ার পেছনে এর ভূমিকা আছে। আবার ডলার সংকটের কারণেও ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ ও ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমিয়ে দিয়েছে। ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবে দেশে উৎপাদিত ওষুধের দামও এখন বাড়ছে। এক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানি হ্রাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে খবর মিলছে। ব্যাংকগুলো ওষুধ, কাঁচামাল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খুলতে গড়িমসি করছে কিনা তার তদারকি জোরদার করতে হবে। 

ডলার সংকটের কারণে শ্রীলংকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। চিকিৎসকরা শ্রীলংকার সাধারণ নাগরিকদের কাছে আবেদন করেছিলেন, যেন কোনোভাবেই তারা অসুস্থ না হয়ে পড়েন। কার্যত তৎকালীন পরিস্থিতিতে যদি শ্রীলংকায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ দিতে হবে বলেই মনে করা হচ্ছিল। কারণ ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে তাদের হাতে পর্যাপ্ত ডলার ছিল না। বাংলাদেশের অবস্থা এমন না হলেও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে জরুরি ওষুধপণ্য আমদানিতে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, তা আশঙ্কাজনক। দ্রুতই এর সমাধান প্রয়োজন। 

ডলারস্বল্পতার কারণে সরকার বিশেষত বিলাসপণ্য আমদানিতে কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সহায়তা দিচ্ছে। স্বাস্থ্য ও সুস্থতা খাদ্য ও জ্বালানির মতোই অপরিহার্য। তাই ওষুধের সরবরাহ, প্রাপ্যতা ও দাম যাতে প্রভাবিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করা ছাড়াও বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া রফতানি আয় আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মনোযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাড়ানোর ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিতে হবে। ডলার সংকটের সময় বিলাসপণ্য হিসেবে চিহ্নিত গাড়ি আমদানি অব্যাহত রয়েছে, মানুষের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণে কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে প্রভাব পড়ছে, যা কাম্য নয়। অভিযোগ রয়েছে, আলোচ্য কার্যক্রমে ব্যাংকের মুনাফা বেশি কিন্তু ওষুধ আমদানির এলসিতে মুনাফা কম বলে গড়িমসি করা হয়। এটি দুঃখজনক। এমন প্রবণতা বিরাজ করলে দেশের চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হবে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। 

সহসাই ডলার সংকট কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে আনতে আরো সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো সরকারের নির্দেশনা সঠিকভাবে পরিপালন করছে কিনা, সেটিও দেখা দরকার। একই সঙ্গে নিত্য ও জরুরি পণ্য আমদানি যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। এসবই নির্ভর করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে তার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদারকিও বাড়াতে হবে। কাজটি বাংলাদেশ ব্যাংকের। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে এখন পর্যাপ্ত রিজার্ভ রয়েছে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে ঋণসহায়তাও পেয়েছে। পাইপলাইনে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের উচিত এসব অর্থ দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করা। পাশাপাশি আমদানি ও রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার বা অর্থ দেশে না আনার প্রবণতা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।