দেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই সরকার কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই বাংলাদেশীদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্বের পরিসর আরো বাড়িয়েছে। বর্তমানে ১০১টি দেশের দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ পাবেন বাংলাদেশীরা। আগে ৫৭টি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে আরো ৪৪টি দেশকে যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টির কার্যকারিতা ও আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বৈত নাগরিকত্ব পাওয়া সবচেয়ে সহজ। এর সঙ্গে অর্থ পাচারের বিষয়টিরও সম্পর্ক আছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে অবৈধ উপায়ে সম্পদ ও অর্থ পাচার করার অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে। ফলে নতুন সুযোগের ফলে অর্থ পাচার আরো উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আবার প্রবাসে অবস্থান করা বাংলাদেশীরা অনেক সময় নাগরিকত্বের সংকটে ভোগে। তাদের জন্য এ প্রক্রিয়া কতটা সুফল দেবে, সেটি দেখার বিষয়। আশা করি সরকার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবে। কেন, কী কারণে সরকার দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগের সম্প্রসারণ করছে এবং এর ফলে যেসব সম্ভাবনা ও জটিলতার উদ্ভব হবে, তার সমাধান কীভাবে করা হবে, তারও ব্যাখ্যা প্রদান করা আবশ্যক। পাশাপাশি প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কানাডা, সুইজারল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে চিন্তা করে না। এর পেছনে অন্যতম কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের দেশে সম্পদের প্রবাহ। বিনিয়োগ ও অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে দেশ দুটি নাগরিকত্ব বিষয়ে ছাড় দিয়ে আসছে। তবে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন দেয় না। জার্মানি, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে খুবই কঠোর। জার্মানিতে কারো দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রমাণ হলে সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল পর্যন্ত করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোয়ও দ্বৈত নাগরিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মূলত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়া দ্বৈত নাগরিক হওয়ার বিষয়টি কার্যকরের সুযোগ নেই। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের তেমন একটি চুক্তি রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশীরা উভয় দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন। প্রশ্ন হলো নতুন ঘোষিত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব চুক্তি রয়েছে কিনা।
প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও আফগানিস্তানে অবশ্য দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশ তাদের নাগরিকদের অন্য দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব নেয়ার কোনো সুযোগ রাখেনি। বিশেষত ভারতের মতো দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও নাগরিকত্ব নেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কোনো ভারতীয় নাগরিক মার্কিন নাগরিকত্ব নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। ‘ওভারসিজ সিটিজেনস অব ইন্ডিয়া’ (ওসিআই) নামে নতুন একটা ক্যাটাগরি প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারত ২০০৫ সালে প্রথম এ-সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেয়, যেটিকে অনেক ভাষ্যকারই দ্বৈত নাগরিকত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন, যদিও আইনগতভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব সে দেশে স্বীকৃত নয়। তাই নিবন্ধন, বিশেষ ভিসা প্রদান (অথবা নো ভিসা রিকোয়ার্ড), ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের নীতিমালা, অর্থ বিনিয়োগে ও রেসিডেন্সি (আবাস) ভিত্তিক ব্যক্তি আয়কর নিরূপণের নীতিমালার মাধ্যমে অনেক নাগরিক সুবিধা দেশান্তরিত অভিবাসীদের দেয়া হয়। বাংলাদেশ এমন নীতি অনুসরণ করতে পারে। এতে অর্থ ও সম্পদের পাচার রোধের পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকসংক্রান্ত উদ্ভূত সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে। প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশী কিন্তু নাগরিকত্ব বাংলাদেশের নয় তাদের জন্য ভারতের আদলে বাংলাদেশে পারসন অব বাংলাদেশ অরিজিন (পিবিও) ধরনের কার্ড চালু করা যেতে পারে। তারা সাধারণ বাংলাদেশী নাগরিকের চেয়ে কিছু সুবিধা কম পাবে। এতে তাদের ভোগান্তি কমবে এবং দেশে বসবাসরতদের সঙ্গে বৈষম্যও তৈরি হবে না।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বাংলাদেশের আইন কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১-এর ১৪ ধারায় দ্বৈত নাগরিকত্ব অথবা জাতীয়তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১-এর ১৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, এই ধারার বিধানাবলি সাপেক্ষে যদি কোনো ব্যক্তি এ আইনের বিধানাবলির অধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন এবং একই সময়ে অন্য কোনো দেশের নাগরিক বা অধিবাসী হয়ে থাকেন, তিনি যদি না ওই দেশের আইন অনুযায়ী তার নাগরিক অথবা অধিবাসী মর্যাদা পরিত্যাগ করে ঘোষণা প্রদান না করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া হতে বিরত হবেন। এক্ষেত্রে সাংঘর্ষিকতা বিদ্যমান। ২০০৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রবর্তন করেছে, তবে সেই নির্দেশ যথেষ্ট স্বচ্ছ বা স্পষ্ট নয়।
দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা আবশ্যক বলে অর্থনীতিবিদ ড. সাজ্জাদ জহির বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন তা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকও। প্রথমত, তারা সহজেই এক দেশ থেকে অর্থ আনা-নেয়া করতে পারে। আইনিভাবে অধিক সুদের আশায় যেমন তারা উন্নত দেশের ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে পারে, তেমনি উন্নত দেশের ব্যাংকে সুদের হার বাড়লে বা মুদ্রার বিনিময় হার অবমূল্যায়নের শঙ্কা জাগলে সহজেই আইনি বা বেআইনি পথে তা বিদেশী মুদ্রায় নিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাদের চারণভূমি ন্যূনতম দুই দেশে বিস্তৃত হওয়ার ফলে এবং সে দেশগুলোর সরকারের স্বার্থ সবসময় পরিপূরক না হওয়ায় দ্বৈত নাগরিকদের পক্ষে এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে আইনানুগভাবে বসবাস করাও সম্ভব। তৃতীয়ত, দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে নিজ সঞ্চয়ে গড়া অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রয় করে উন্নত দেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তীব্র থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি, সামাজিক সংযুক্তিতে দ্বৈত নাগরিকরা অন্যদের থেকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে দ্বৈত নাগরিকদের অধিক প্রভাব থাকলে দেশে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা এবং ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ খেলাপি করে বিদেশে পুঁজি পাচার ঘটার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, সংকটকালে দ্বৈত নাগরিকরা দেশ থেকে চলে যাবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকালে ভিড় জমালেও তাদের অধিকাংশকে সংকটকালে উন্নত দেশমুখী হতে দেখা যায়। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও শক্তিশালী দেশের প্রতি দ্বৈত নাগরিকদের আইনি আনুগত্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে তাদের ওপর বাংলাদেশের আইনের প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নতুন নাগরিকত্বের দেশগুলোয় দ্বৈত নাগরিকরা নিজের বংশধরদের ভবিষ্যৎ দেখে। তাই দ্বৈত নাগরিকদের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সেই উন্নত দেশের মাটিতে এবং তা বাস্তবায়নে সহায়ক নীতি প্রণয়নে তারা উদ্যোগী হবে। এতে বাংলাদেশের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশে দ্বৈত নাগরিকত্বের চল আছে। কিন্তু বিষয়টি মূলত বিনিয়োগ পরিবেশের আলোচনায় এবং ভিসার বাধা হ্রাস করে বিত্তবানদের অবাধ চলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনের আঙ্গিকে নাগরিকত্ব আইন ও অভিবাসন নীতির সংশোধনী এবং দ্বিপক্ষীয় কর চুক্তি ও সমধর্মী পশ্চিমা উদ্যোগ এ বার্তা দেয় যে দ্বৈত নাগরিকদের উত্থানের পেছনে উন্নত দেশগুলোর স্বার্থ জড়িত। এটা অনুমেয় যে বিশ্বপরিসরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এই দ্বৈত নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এত আয়োজন। উন্নয়নশীল কিছু দেশে এ প্রস্তাবের পক্ষে তথ্য দেয়া সম্ভব। যেমন ফিলিপাইনসে ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব রক্ষা ও পুনঃঅধিগ্রহণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এককালীন ফিলিপিনো নাগরিকদের মাঝে যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়া হয়। আরো উল্লেখ্য, কর সাশ্রয়ে সুযোগসন্ধানী পুঁজির বহিঃপ্রবাহ নিয়ে শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রে দুজন কংগ্রেসম্যান সে দেশের নাগরিকদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের একটি বিল ঊত্থাপন করলেও এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
দুই রাষ্ট্রের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও দ্বৈত নাগরিকরা আয়কর এড়ানোর সুযোগ পেয়ে থাকেন। আয়কর নিরূপণের ক্ষেত্রে কর বিভাগ প্রায়ই রেসিডেন্সি স্ট্যাটাসে জোর দেয়। সরলীকৃত এক পদ্ধতিতে, ছয় মাসের অধিককাল যদি কেউ এক দেশে অবস্থান করে তাকে সে দেশের আবাসী (রেসিডেন্ট) গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে কর ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তা নীতি ও কার্যনির্ধারণের ঘাটতি থাকায় কর ফাঁকির সুযোগ রয়ে যায়। বাংলাদেশে কর কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিদেশী পাসপোর্ট, ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্ট্যাম্প ও একটি এনআইডি পেলেই নাগরিক সেবা দিতে উদগ্রীব! এর পেছনে অদৃশ্য সরকারি নীতিতে দ্বৈত নাগরিকদের প্রভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতে অবশ্য কিছুটা পিছু হটে পরিবর্তন আনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ওসিআই (ওভারসিজ সিটিজেনস অব ইন্ডিয়া) ও পিআইওতে (পারসনস অব ইন্ডিয়ান অরিজিন), যে দুটো পরে একীভূত হয়েছে, তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ভারত সরকার অধিকতর ভালো অবস্থানে আছে। অধিকন্তু ভারতের কর কর্তৃপক্ষকে ‘রেসিডেন্সি’ নির্ধারণে এবং ওআইসি থেকে কর আদায়ে কঠোর হতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো নিরসনের উদ্যোগ বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।
বিদ্যমান বাস্তবতায় দ্বৈত নাগরিকসংক্রান্ত বিধান পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দ্বৈত নাগরিকদের কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করলে উপরোক্ত সমস্যা এড়ানো যাবে, তার যথাযথ বিশ্লেষণও আবশ্যক। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সরকার কেন এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হোক না কেন, তাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। নতুবা মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাবে, যা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাম্য নয়।










