২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে ওভার ওয়েটের কারণে। অথচ তারা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি লাগেজ বা প্যাসেঞ্জার নেয়নি! বিষয়টি নিয়ে তাদের ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি খুব চিন্তায় পড়ে যায়। এর রহস্য উদ্ঘাটনে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের তুলনায় আমেরিকানরা বর্তমানে (গবেষণা চলাকালে) গড়ে ২০ পাউন্ড বেশি ভারী হয়েছে! অথচ তারা এতদিন বিমানযাত্রীদের গড় ওজন একই রকম বিবেচনা করে আসছিল। পরে তারা যাত্রীপ্রতি ১০ পাউন্ড কম মালামাল নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যেন অতিরিক্ত ওজনের কারণে আর কোনো বিমান দুর্ঘটনায় না পড়ে।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের দেশেও যারা বিমান ভ্রমণ করে বা করার সামর্থ্য রাখে, তাদের পরিবারের সদস্যদের শারীরিক গঠন বিগত কিছু বছরে বেশ বদলে গেছে। বিশেষত ফাস্টফুডে আসক্ত কিশোর ও তরুণদের মোটা হওয়ার প্রবণতা রীতিমতো ভাবনার বিষয়। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর বাসায় তার এক সাবেক সহকর্মী সপরিবারে বেড়াতে আসে। ছেলের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়া উপলক্ষে কয়েক দিনের জন্য তারা এসেছিল। বিমানযোগে তারা ঢাকা থেকে রাজশাহী পৌঁছায়। আমার সেই বন্ধু ছেলেটাকে গিফট করার জন্য পোশাক কিনতে গিয়ে পুরো রাজশাহী শহর ঘুরে তার মাপের কোনো (রেডিমেড) প্যান্ট খুঁজে পায়নি! আর তিন ক্লাস নিচে পড়া তার বোনটাও যে শারীরিক গঠনে শিগগিরই তার ভাইকে ছাড়িয়ে যাবে তাও ছিল সহজেই অনুমেয়।

এ রকম পরিবর্তনের বিষয়গুলো এখন আর একক কোনো দেশ, অঞ্চল বা পরিবারের বিষয় নয়। বিশ্বায়নের যুগ বলে কথা! এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ পুরুষদের কোমরের গড় সাইজ ছিল ৩২ আর মেমসাহেবদের ২৭ ইঞ্চি। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পর সেই গড় বেড়ে পুরুষদের হয় ৩৬ আর মহিলাদের ৩০ ইঞ্চি! এ তথ্য প্রকাশের পর ফ্রান্সে ১২ হাজার নাগরিকের শারীরিক পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেল, তারা লম্বায় বেড়েছে তবে আগের তুলনায় স্লিম হয়েছে। এর পরই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় পোশাকের স্ট্যান্ডার্ড (লং, মিডিয়াম, স্মল) সাইজ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

যুক্তরাজ্যে ১২ সাইজের একটি ড্রেস এখন ২০ বছর আগের তুলনায় দেড় ইঞ্চি লম্বা। অথচ নব্বইয়ের দশকে বিমানের সিটের সাইজ যে ২৬ ইঞ্চি ছিল এখনো সেটাই বহাল রয়েছে। মানুষ লম্বায় বাড়লে ওজনও বাড়ে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোটা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের সাইজ বাড়া সত্ত্বেও কিছু ট্রেন কোম্পানি তাদের সিট ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত কমিয়ে ফেলেছে, স্মার্ট করার অজুহাতে সিটগুলো আরো কাছাকাছি এনেছে। ক্রেতাদের সত্যিকারের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে চাইলে এমন অসংখ্য (অদৃশ্য কিন্তু প্রভাববিস্তারকারী) বিষয়ও নজরে আসা দরকার, যা হয়তো আপনার প্রতিযোগীরা এখনো কল্পনা করতেও পারছে না।

একজন বিক্রয়কর্মী বা মার্কেটারকে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করতে হয় ক্রেতাদের বদলে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে। তবে শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা পরিবর্তনগুলো যতটা সহজে ধরা যায়, মানসিক পরিবর্তনগুলো ততটাই অধরা। আমাদের দেশে আবার এগুলো নিয়ে খুব একটা গবেষণাও হয় না। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রাথমিক ধাপ হলো প্রতিনিয়ত চোখ-কান খোলা রাখা। বিষয়গুলোকে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করা। [লেখকের গ্রন্থ ‘ফেইলিওর ইন সেলস: বিক্রয় চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার’ বই থেকে সংকলিত]

 

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক