বোরো দেশের ধান-চালের সর্ববৃহৎ মৌসুম। চালের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই এখান থেকে পূরণ হয়। কাজেই খাদ্যনিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় খাদ্যশস্যের মজুদ বৃদ্ধির জন্য মৌসুমটি গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক বিষয়, বিগত বছরগুলোর মতো এবারো বোরো সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি সরকারের। যা হয়েছে তা অর্ধেকের কিছুটা বেশি। জেলাভিত্তিক তা আরো কম। এর পেছনে রয়েছে কিছুটা সংগ্রহ অভিযানের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি আর বাজারের দামজনিত অভিঘাত। তাছাড়া প্রচলিত অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ পদ্ধতিতে সরকার মিল ও চালকল মালিকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে কৃষি খাতে যতখানি উন্নতি হয়েছে, ততখানি উন্নতি কৃষকের হয়নি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অবস্থা নাজুক হচ্ছে। ধানের বাড়তি দাম যেন উৎপাদকের কাছে পৌঁছতে পারে, তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি চালের দাম যেন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি না করে তা খেয়াল রাখতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি মজুদ বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। তাছাড়া লক্ষ্যানুসারে ধান-চাল সংগ্রহে বারবার ব্যর্থতা ঝুঁকিতে ফেলছে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তাকেও। 

২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম বেশি থাকায় এবং সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কৃষক স্থানীয় বাজারেই ধান বিক্রি করে দেন। যেমন সরকারি গুদামে আর্দ্রতার কথা বলে অনেক সময় ধান ফেরত দেয়া হয়। স্থানীয় বাজারে এসব ঝামেলা নেই। আবার স্থানীয় বাজারে বিক্রিতে কৃষকের পরিবহন ব্যয়, শ্রম ও সময় কম লাগে। নগদ দামও পান কৃষকরা। চালকল মালিকরা এ সমস্যাগুলোরই সদ্ব্যবহার করছেন। অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকারকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তারা, যা কাঠামোগত সমস্যা।

সব দেশেই রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচি রয়েছে। কিছু দেশে কার্যকর সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বিদ্যমান। যেমন আমাদের পাশের দেশ ভারত। দেশটির কৃষকরা একটি মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসে (এমএসপি) সরকারের কাছে নিজেদের পণ্য, প্রধানত ধান ও গম বিক্রি করতে পারেন, যা পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতি বছর নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এমএসপির আওতায় ভারতের কৃষক রাজ্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোয় ধান, চাল, গম সরবরাহ করে থাকেন। ন্যায্য দাম পাওয়ার কারণে কৃষক আগ্রহের সঙ্গে সরকারের কাছে খাদ্যশস্য বিক্রি করেন। ফলে বরাবরই দেশটিতে মৌসুমভিত্তিক সংগ্রহ অভিযান সফল হয়। পদ্ধতিটি আমলে নিয়ে আমাদের মতো করে দেশে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে সরকারকে অটো রাইস মিলে বিনিয়োগের কথা বলছেন, যা বিবেচনীয়।

তবে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রথমেই গুদামগুলোকে উন্নত করতে হবে। খাদ্যশস্য মজুদের জন্য সরকারের তরফ থেকে খাদ্যগুদামের সংকটের কথাও বলা হয়; যা স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। সরকারি গুদামে ছোট কৃষকদের ফসল সংরক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে হবে যেন ফসলের সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে অল্প দামে ফসল বিক্রি না করতে হয়। সরকারের ধান-চাল মজুদ করার সক্ষমতা কম হওয়ায় কারণে বেশির ভাগ সময়ই সরকারের পক্ষে বাজার প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া তুলনামূলক ছোট কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে জোর দিতে হবে। কারণ ছোট ও মাঝারি কৃষকের টিকে থাকার সক্ষমতা কম।

বিদ্যমান ধান-চাল সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় মিলারদের প্রভাব অত্যধিক। নানা অজুহাতে তারা যখন চাল সরবরাহ করেন না, তখন শেষ মুহূর্তে সরকারের কিছুই করার থাকে না। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী মজুদ বাড়ানো ব্যাহত হয়। মিলারদের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতার এহেন কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার সময় এসেছে। সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা ধান সংগ্রহের নির্ধারিত একটি নয়, দুটি মূল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একটি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি গুদামের সংগ্রহের জন্য, অন্যটি কৃষকের কাছ থেকে বেসরকারি অটোরাইস মিলে ক্রয়ের জন্য। চালকলগুলোকে পরিবর্তিত সরকারি নীতিমালা মেনে কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনতে হবে, অন্যথায় ওইসব মিলের উৎপাদিত চাল সরকারি গুদামে  কোনো অবস্থাতেই ক্রয় করা যাবে না। চুক্তি না মানলে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতোও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিদ্যমান। চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। নিত্যপণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমাদের জনজীবনে হিমশিম অবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনসহ আগামীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়তি উদ্বিগ্নতা নিয়ে হাজির হয়েছে। সুতরাং ধান-চালের মজুদ না বাড়ালে আপত্কালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। এমনটি হলে খাদ্য সংকটের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থতায় সরকারি মজুদে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্য মজুদ নজিরবিহীনভাবে কমেছে, বেড়েছে চালের দাম। কাজেই সংগ্রহ অভিযানে প্রাধান্য দিতে হবে মিলার নয়, প্রকৃত কৃষককে। এতে চালের দাম যেমন স্থিতিশীল থাকবে, তেমনি কৃষকও ফসলের দাম পাবেন। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ পরিকল্পনা সফল করতে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে।