প্রকৃতির বুকে সাদাপাথর যেন মুক্তার মালা, একে ছিঁড়ে ফেললে সৌন্দর্যের সুতো চিরতরে ছিন্ন হবে। প্রকৃতি বিধাতার এক অনন্য সুন্দর দান। প্রকৃতির মাঝে ঘেরা রয়েছে অনেক রহস্য। একেকটা রহস্য যেন অন্যতম সৌন্দর্যের ধারক। যতই দেখা হয় ততই কম মনে হয়। অথচ এই প্রকৃতির মর্ম আমরা বুঝি না৷ প্রকৃতির সৌন্দর্যের কদর করতে জানি না আমরা। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পরিচর্যার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। তবে আগ্রহ রয়েছে এর সৌন্দর্য দেখার প্রতি। মানুষ যদি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে না পারে তাহলে সুদূর ভবিষ্যতে এই সৌন্দর্য বিলীন হয়ে যাবে, থেকে যাবে শুধু স্মৃতি।
বাংলাদেশ প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্যে ঘেরা একটি দেশ বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। এখানের চট্টগ্রাম, সিলেট, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, সেন্টমার্টিন, সাজেক ইত্যাদি জায়গায় রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ নিদর্শন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে মনে হয় কোনো চিত্রকারের রঙ তুলিতে আঁকা একটি দৃশ্য। এ রকমই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উদাহরণ সিলেটের সাদাপাথর। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেটের জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, পিয়াইন নদী ও এর আশপাশের এলাকা সাদাপাথরের জন্য বিখ্যাত। পাহাড়ি নদীর তলদেশে বা পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা সাদা সাদা চকচকে পাথর শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, নিয়ম-নীতি না মেনে অবৈধভাবে চলছে সাদাপাথর চুরি ও উত্তোলন। এভাবে চলতে থাকলে অচীরেই ধ্বংস হয়ে যাবে প্রকৃতির অনন্য এই দান।
বাংলাদেশের সাদাপাথর মূলত আসে নদী বা পাহাড় থেকে। স্রোতের সাথে এসে নদীর তীরে জমা হয়, যা হাজারো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এগুলো বৈধ খনির মাধ্যমে উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও বছরের অনেকটা অংশজুড়েই চলে অবৈধ উত্তোলন। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাতের আঁধারে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাথর চুরিতে জড়িয়ে পড়েন৷ একসময় এই স্থানের চিত্র ছিল অন্যরকম। পর্যটকরা এসব সাদাপাথরের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন, নদীতে গোসল করতেন বা ছোট নৌকায় ভ্রমণ করতেন। অথচ এখনকার দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন সেখানে দেখা যায় গর্ত, কাঁদা আর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে মারাত্মক পরিবর্তন।
সিলেটের সাদাপাথর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অন্যতম নিদর্শন। অথচ সাদাপাথর চুরির অর্থনৈতিক পরিমাণ রয়েছে বিশাল অংকে।
১.সরকারের পতনের প্রথম তিন দিনে চুরি (সিলেটের দুটি কেয়ারি থেকে)
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সময়কালে শাসন পরিবর্তনের কারণে আইন-শৃঙ্খলা শিথিল হলে দুটি কুয়ারি থেকে প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার সাদাপাথর লুট করা হয়।
২.জাফলংয়ে এক রাতের লুটতরাজ:
৫ আগস্ট রাতে মাত্র এক রাতেই জাফলং থেকে প্রায় এক কোটি ঘনফুট পাথর চুরি হয়ে যায়। বর্তমান বাজার অনুযায়ী ওই পাথরের মূল্য ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
৩. দুই সপ্তাহে পিয়াইন ও গোয়াইন নদী এলাকায় চুরি:
২৮ জুলাইয়ের পর পরিমাপ অনুসারে জাফলং এলাকায় ৩.৭৪ কোটি ঘনফুট পাথর ছিল সংরক্ষিত। এর মধ্যে দুই সপ্তাহে প্রায় এক কোটি ঘনফুট পাথর চুরি হয়, যার আনুমানিক মূল্য ১০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি কোম্পানীগঞ্জের কেয়ারি থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের পাথর লুট হওয়ার তথ্য রয়েছে।
৪. ২২ দিনে কোম্পানীগঞ্জ পর্যটন কেন্দ্র থেকে চুরি:
২০২৪ সালের মে-জুনে, কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথরের পর্যটন কেন্দ্র থেকে ২২ দিনের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের পাথর চুরি হয়। প্রতি রাতেই ৫০-১৫০টি নৌকায় পাথর উঠিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকার চুপ কেন? কবে ভাঙবে তাদের ঘুম? হাজার হাজার কোটি টাকার পাথর লুটের পরও সরকার নীরব ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতির শোধরানোর কোনো চিহ্ন নেই, অথচ দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে পাথর চুরির ঘৃণ্য ব্যবসা। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থাকছে ফাঁকা আর পূরণ হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ।
পাথর চুরিতে ব্যবহার করা অভিনব কৌশল:
সাদাপাথর চুরি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি সুসংগঠিত হয় একটি চক্রের মাধ্যমে। সাদাপাথর চুরির জন্য ব্যবহার করা হয় অভিনব চুরির কৌশল। অধিকাংশ সময় রাতের আঁধারে নদী থেকে পাথর তোলা হয়। আইন অনুযায়ী ভারী যন্ত্রের সাহায্যে পাথর তোলা নিষেধ, অথচ চক্রগুলো এক্সক্যাভেটর, বুলডোজার, ড্রেজার ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টায় হাজার হাজার কেজি পাথর তুলে ফেলে। এমনকি তারা সীমান্ত এলাকার ব্যবহারও করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় ভারতীয় দিক থেকে পাথর এনে চোরাই পথে বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ করে। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সাথে আঁতাত করে। যার ফলে তদারকি হয় দুর্বল। এসব পদ্ধতিতে সাদাপাথর চুরির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের অনন্য সুন্দর প্রাকৃতিক সম্পদ সাদাপাথরকে ধ্বংস করে ফেলছে।
পাথর চুরির পেছনের কারণ:
সাদাপাথর একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এর বৈচিত্র্য সবাইকে বিমোহিত করে। এর চুরির পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। তার মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো অর্থনৈতিক লোভ। নির্মাণ শিল্পে সাদাপাথরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এর বাজারমূল্য অনেক বেশি। আইনে প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি সম্পর্কে অনেক বিধান থাকলেও নেই কোনো বাস্তব প্রয়োগ, যার ফলে মানুষ যেন অন্যায় করার লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতিতে জড়ানো প্রশাসনের আগাগোড়া এর মূল কারণ। অবৈধ ব্যবসায় জড়িত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি স্থানীয় প্রশাসন বা রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে সুরক্ষা পায়। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে সচেতনতার অভাব। সাধারণ জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যে সাদাপাথর চুরি প্রকৃতির জন্য কতটা ক্ষতিকর।৷
পাথর চুরির ফলে পরিবেশের ওপর প্রভাব:
প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্য সাদাপাথর চুরির ফলে প্রকৃতির ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। নদীর তলদেশের প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হয়ে নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। মাঠসহ জলজ প্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে। আশপাশের জীববৈচিত্র্য ও গাছপালা হুমকির মুখে পড়ছে। এছাড়াও পড়ছে পর্যটনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব। পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে পর্যটকদের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা হোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌকা ভাড়া ইত্যাদি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ওপর রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষতি। সরকারের বৈধ খনি থেকে যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, তা হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হলে, ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগও কমে যাবে। প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সম্প্রতি জাফলং এলাকায় সরজমিনে দেখা যায়, পিয়ান নদীর মাঝখানে বিশাল গর্ত যা আগে পাথরে ভরা ছিল। কিছু এলাকায় পানি প্রবাহ এতটাই বদলে গেছে যে, ছোট নৌকা চলাচলই কঠিন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে ২০-৩০টি ট্রাক পাথর চুরি করে বের হয়ে যায়। তবে খুব কম ক্ষেত্রে চোর ধরা পড়ে। একজন স্থানীয় দোকানদার বলেন, ‘আগে প্রতিদিন শত শত পর্যটক আসত। এখন মানুষ আসে কিন্তু নদীর রূপ বদলে গেছে। পাথরের জায়গায় শুধু রয়েছে ধুলো আর পানি, তাও ময়লা।"এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কতটা হুমকির মুখে। এ সমস্যার দ্রুততর সমাধান না করা হলে একসময় সাদাপাথর বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সরকারের দায়িত্বহীনতা নাকি পর্যাপ্ত প্রচেষ্টার অভাব?
সমস্যাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। প্রশাসনও যেন এর সঙ্গে পেরে উঠছে না। পাথর চুরি ঠেকাতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও চক্রগুলো দ্রুত নতুন কৌশল বের করে ফেলে। একাধিকবার অভিযান চালিয়ে যন্ত্রপাতি জব্দ করা হলেও কয়েকদিন পর আবার অবৈধ উত্তোলন শুরু হয়। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকায় পাথর পাচার ঠেকানো কঠিন হয়।
পাথর চুরি রোধে সমাধান:
যদিও সমস্যা প্রতিনিয়ত গুরুতর হচ্ছে, তবু এর সমাধানের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অবৈধ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও উচ্চ জরিমানা নির্ধারণ করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তি যেমন সিসিটিভি, ড্রোন নজরদারি ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নদী ও খনি এলাকায় নজরদারি করতে হবে। সাদাপাথর চুরির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ভবিষ্যতের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করা। পাথর উত্তোলনে জড়িত শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে করে তারা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিতে লিপ্ত না থাকে। সীমান্ত সহযোগিতা এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে পাথর পাচার বন্ধ করা যেতে পারে। যদিও সমস্যার সমাধান একদিনে করা সম্ভব নয় তবুও উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
প্রকৃতি মানুষকে তার অনন্য সৌন্দর্য দিয়ে বিমোহিত করে। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পরিচর্যা না করতে পারলে সেই সৌন্দর্য নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। ইতিহাসে এমন হাজারো উদাহরণ রয়েছে। সিলেটের সাদাপাথর যেন এমনই এক প্রাকৃতিক নিদর্শন। শিগগিরই এর অস্তিত্ব ধরে রাখার ব্যবস্থা না করা হলে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে। সাদাপাথর রক্ষার ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে আমাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা সাদাপাথর যেন প্রকৃতির অমূল্য হাসি, আর সেই হাসি আজ চোরের হাতের মুঠোয় হারিয়ে যাচ্ছে।
নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।










