যেহেতু উন্নত দেশগুলোর শিল্পনীতির আধিপত্যের কাছে নব্য উদারনৈতিকতাবাদ নতজানু হচ্ছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর স্বার্থ তাই উপেক্ষিত হচ্ছে। নব্য উদারনৈতিকতাবাদ স্বর্ণযুগে যেমন হতো, সে রকম বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যবাদের একটি সূক্ষ্ম ধরন আবার বিশ্বের অর্থনৈতিক নীতিসংক্রান্ত বিতর্কে শক্তিশালী দেশগুলোর স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

যদি উন্নয়নশীল দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়, তবে মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনের মতো নব্য উদারনৈতিকতাবাদ এবং শিল্পনীতি সম্পর্কিত বিতর্কের ভিন্ন রূপ প্রকাশ পাবে। কেননা ১৯৮০-এর দশকের নব্য উদারনৈতিক ওয়াশিংটন সমঝোতা (Washington Consensus) অন্তত বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর জন্য দৃশ্যগ্রাহ্য সুবিধা বয়ে এনেছিল। নব্য উদারনৈতিক যুগ থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করলে তা আমাদের জন্য উপকার করতে পারে।

মুক্তবাজার ও বিশ্বায়ন নিয়ে নব্য উদারনৈতিকতাবাদীদের নীতিগত নিরাপস অবস্থানকে অনেক বৈশ্বিক সমস্যার জন্য দায়ী করা হয়। যেমন ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ, শিল্পোৎপাদনের হ্রাস, পুনঃপুন আর্থিক সংকট, এমনকি পরিচয়ের রাজনীতির উত্থানের জন্য তাদের দায়ী করা হয়। নব্য উদারনৈতিকতাবাদের নেতিবাচক দিকগুলো গুরুতর বিতর্কের দাবি রাখলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, বিশেষত বিশ্বের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর উন্নয়নে। দেব প্যাটেল, জাস্টিন স্যান্ডেফুর ও আমি মনে করি, অতি-বিশ্বায়নের ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে গত ২০০ বছরে বিদ্যমান ভারসাম্যহীন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভারসাম্য নিয়ে এসেছে এবং এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সামর্থ্য অর্জন করেছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসকে ত্বরান্বিত করেছে।

বাণিজ্যের বিশ্বায়ন উন্নয়নশীল দেশগুলোর রফতানি বাড়িয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করেছে। চীন ও ভারতের সাফল্যগাথা বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলোকেই তুলে ধরে। একদা সংরক্ষণবাদী ও প্রতিযোগিতাবিমুখ ভারত প্রায় ২৫ বছর ধরে রফতানিতে ১৩ শতাংশ গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (ডলারের পরিপ্রেক্ষিতে) অর্জন করেছে কেবল তার বিখ্যাত আইটি পরিষেবা দিয়ে নয়, বরং তার উৎপাদন আউটপুট দিয়েও তা প্রমাণ করেছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্যকে অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলোকেই পরিস্ফুটিত করে।

পাশ্চাত্যের জাত্যভিমানী রাজনীতিবিদ এবং চিন্তাবিদরা কেবল তাদের নিজের দেশের ভেতর নব্য উদারনৈতিকতাবাদের প্রভাব বিবেচনা করবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এর ইতিবাচক কল্যাণমূলক প্রভাবগুলোকে উপেক্ষা করার বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে বিরক্তিকর হিসেবে ধরা দেয়। যেকোনো ধরনের বিশ্বজনীনতা (কসমোপলিটান) যদি তা সর্বাধিক সংখ্যক লোকের জন্য সর্বাধিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে উপযোগিতাবাদী নীতি অবলম্বন করে পরিচালিত হয় অথবা জন রলসের সবচেয়ে কম সুবিধাভোগীদের উপকার করার দিকে মনোনিবেশের দিকে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে, তাহলে সাব-সাহারান আফ্রিকা ও এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি আনার জন্য বিশ্বায়নকেই কৃতিত্ব দেবে।

সত্য বলতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বুদ্ধিজীবীরাও নব্য উদারনৈতিকতাবাদের অবসানকে উদযাপন করেছেন। যদিও এর ইতিবাচক প্রভাবের দিকগুলোকে অবহেলা করার কারণগুলো এখন অস্পষ্ট রয়ে গেছে। এটি হয়তো ল্যান্ট প্রিচেট কথিত সাংগঠনিক অনুকরণপ্রবণতার অতি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে, যার ফলে উন্নত দেশগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যবাদকে আরো শক্তিশালী করে।

একই ধরনের দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পনীতির পুনর্জাগরণের বেলায়ও দেখা গেছে। এছাড়া মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাবকে এক পাশে রেখে বাইডেন প্রশাসনের স্বাক্ষরিত জলবায়ু আইনটি সম্পর্কে বেশির ভাগ কথোপকথন মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার উত্তেজনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাবের দিকে মনোনিবেশ করেছে।

ধরুন, এসবের পরিবর্তে মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনটি মূল্যায়ন করা হয়েছে সাধারণ নিম্ন বা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের চাহিদা অনুযায়ী, যেখানে তারা একটি নিট জ্বালানি আমদানিকারক ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষাপটে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাবের দিকে দৃষ্টি দেয়া। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত ও অর্থনীতিকে সহজতর করার মাধ্যমে মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনটি জ্বালানির দাম কমাতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রসারিত করতে পারে, তাদের আর্থিক অবস্থানকে শক্তিশালী ও জলবায়ু প্রশমনের প্রচেষ্টাকে জোরদার করতে পারে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে মার্কিন মূল্যস্ফীতির ভূমিকা উপেক্ষিত হয়েছে।

আমরা ভুলে যাই যে পুনর্নবীকরণযোগ্য বিপ্লব প্রথম এবং সর্বাগ্রে একটি জ্বালানি শক্তির বিপ্লব। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর এনার্জি গ্রিডে প্রবেশাধিকার বাড়ানো হলে ব্যাপক কল্যাণমূলক লাভ তৈরি হবে। তাছাড়া যেহেতু বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে, বিশেষত বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, সেজন্য পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার জ্বালানি ব্যয়কে যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে পারে, যা এ দেশগুলোর জনসাধারণকে আর্থিকভাবে উপকৃত করবে।

সবুজ রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যয় কমানো অত্যন্ত জরুরি। প্রধান অর্থনীতিগুলোর এরই মধ্যে চাপ থাকা ব্যালান্স শিটের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন আশা করা এখন অবাস্তব চিন্তা। বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ধনীদের থেকে দরিদ্রদের কাছে বড় আর্থিক প্রবাহের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে দেবে। এখানে বাস্তবমুখী সমাধান হলো, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি যেন জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে দ্রুত প্রতিযোগিতা করতে পারে। শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, মার্কিন মূল্যস্ফীতি আইনের মতো শিল্পনীতি সমর্থন এ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারে।

সাশ্রয়ী মূল্যের প্রতিযোগিতামূলক পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি শক্তি ছাড়া সবুজ রূপান্তরের সূচনা সম্ভব নয়। কিন্তু এক ধরনের ন্যায়সংগত রূপান্তর অর্জনের জন্য আমাদের অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে নতুন প্রযুক্তিগুলোয় সবার অংশগ্রহণ রয়েছে এবং সেটা কেবল বেসরকারি মূলধনের মালিকানাধীন স্বার্থের মাধ্যমে যেন পরিচালিত না হয়। এ লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব নীতিমালা এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হবে।

শিল্পনীতির প্রতি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যুক্তিযুক্তভাবে নব্য উদারনৈতিকতাবাদী কৌশলের তুলনা করাটা শিক্ষণীয়, যা মূলত বিশ্বে কার্বনের মূল্যের ওপর নির্ভর করে থাকে। মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনের বিপরীতে এটি স্পষ্ট নয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পনাটি বিশ্বকে সস্তায় পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি শক্তির সরবরাহ করতে পারবে কিনা। যা স্পষ্ট তা হলো ইউরোপের কার্বন সীমান্ত কর উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্বন জাতীয় পণ্য রফতানিকে কমাবে। এ কারণেই ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে নিম্ন আয়ের অর্থনীতির জন্য নব্য উদারবাদীদের মার্কিন নীতি বেশ ভালো।

যদিও মার্কিন মূল্যস্ফীতি কমানোর আইনের সম্ভাব্য সংরক্ষণবাদী লক্ষ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য কম প্রাসঙ্গিক বিষয়, তার পরও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যেকোনো ধরনের ভাঙন বিশ্বের দরিদ্রতম অর্থনীতিগুলোর জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনকে অবশ্যই এমন কোনো জীবনধারার দিকে এগোতে হবে যা পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি শক্তিতে ভর্তুকি দেয়ার অনুমতি দেয় এবং একই সঙ্গে অন্যদের ওপর আরোপিত বোঝা কমায়। কিন্তু পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যয় নিজেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্ভাবনার ওপর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। আজকের নীতিগত বিতর্কটি নব্য উদারনৈতিকতাবাদের ব্যর্থতা এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটবে সে সম্পর্কে বিভ্রান্তি দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে কিন্তু নব্য উদারনৈতিকতাবাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা সম্ভব এবং একই সঙ্গে এর বিরোধী উত্তরসূরিকে আলিঙ্গন করা সম্ভব।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম: সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নন-রেসিডেন্ট ফেলো, বর্তমানে ভারতের তামিলনাড়ু সরকারকে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার এবং সবুজ রূপান্তর বিষয়ক পরামর্শদাতা 

ভাষান্তর: আবিদ মঈন খান