১৪ ডিসেম্বর, বাঙালির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। বিজয়ের প্রাক্কালে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর বেদনার স্মৃতি বহন করে দিনটি। ১৯৭১ সালের এ দিনে হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা থামিয়ে দিতে চেয়েছে বাঙালি জাতির অগ্রগতি। শুধু শিক্ষকের হাতের খড়িই নয়, সাংবাদিকের হাতে ধরা কলমটিও স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল তারা।

সে সময় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পড়ে ছিল এ দেশের সূর্যসন্তানদের মরদেহ। এর মধ্যে একমাত্র নারীদেহটি ছিল কবি ও সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি শিলালিপি সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেছেন সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে। এছাড়া সাপ্তাহিক বেগম, আজাদ, সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তানে লিখতেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে নিজ বাসা থেকে আলবদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সেলিনা পারভীন। সেই সকালে ঢাকাজুড়ে ছিল কারফিউ। যুদ্ধের শেষপর্যায়ে অস্থির রাজধানীতে নিজের বাসার ছাদে বসে লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে লেখাই ছিল তার প্রতিবাদ ও সাহসের ভাষা। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস ও একটি লরি এসে থামে বাসার সামনে। মুখ ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তি গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তার নাম জানতে চাইলে সেলিনা পারভীন কোনো দ্বিধা না করে নিজের পরিচয় দেন।

পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সেলিনা পারভীন ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘মামার সঙ্গে খেয়ে নিয়ো সুমন, আমি এখনই ফিরে আসছি।’ কিন্তু সেই ফিরে আসা আর হয়নি।

এরপর শুরু হয় বিভীষিকা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার চারদিন পর যখন রায়েরবাজার বধ্যভূমির একটি গণকবর থেকে সেলিনা পারভীনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, তখন তার চোখ ও পেটে বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেদিনই আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শুধু সেলিনা পারভীনই নন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের শিকার হয়েছেন অসংখ্য লেখক ও সাংবাদিক। ১০-১৪ ডিসেম্বর তালিকা ধরে ধরে দেশের বিশিষ্ট কলমযোদ্ধাদের তাদের নিজ নিজ বাসস্থান থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রায়েরবাজার ও মিরপুরের মতো বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় নির্ভীক মানুষগুলোর নিথর মরদেহ।

শুধু হত্যা নয়, অনেক সাংবাদিক কারাবরণ ও চরম নির্যাতনের শিকার হন। যা প্রমাণ করে সাংবাদিকরা শুধু সংবাদ পরিবেশক ছিলেন না। কলমকে তারা শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) তথ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, যিনি ১০ ডিসেম্বর অপহৃত হন। একই ভাগ্য বরণ করেন দৈনিক সংবাদের সহযোগী সম্পাদক প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার ও দৈনিক পূর্বদেশের বার্তা সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমদ। এছাড়া তালিকায় রয়েছেন দৈনিক পূর্বদেশের সহকারী সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব, ক্রীড়া সাংবাদিক এসএ মান্নান, দৈনিক মর্নিং নিউজের সহকারী সম্পাদক আবুল বাশার চৌধুরী, দৈনিক পাকিস্তান পরে বাংলাদেশ অবজারভারের সাব-এডিটর চিশতী শাহ আহমদ হোসেন। ২৫ মার্চ রাতে দৈনিক সংবাদ অফিসে অগ্নিসংযোগে নির্মমভাবে নিহত হন সহকারী সম্পাদক শহীদ সাবের। ঢাকা ছাড়াও টাঙ্গাইল প্রতিনিধি শিবসদন চক্রবর্তী ও ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক শেখ আব্দুল মান্নান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন।

শামীমা ইসলাম: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা