আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুফল ভোগ করলেও তারা সেকেন্ডারি কিংবা টারশিয়ারি সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। এ পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ, আমাদের দেশে টারশিয়ারি বা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরকেন্দ্রিক, বিশেষত রাজধানীকেন্দ্রিক। অন্যদিকে শহরে সুসংগঠিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো না থাকার কারণে শহুরে জনগণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এমনকি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে শহুরে বস্তিবাসীর সুযোগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক কম। আবার আর্থসামাজিক অবস্থানের কারণে অনেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সমান সুযোগ পায় না। স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্যও লক্ষ করা যায়। এছাড়া প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট ‘স্বাস্থ্যসেবায় অসমতা’ বিষয়ে ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, সমগ্র বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অসমতা বিদ্যমান ও মূলত ধনীরাই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বেশি মনোযোগী। অন্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সম্পদ সম্পর্কিত বৈষম্য থেকেই স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির বৈষম্য সৃষ্টি হয়। আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পর্কিত জ্ঞান ও সচেতনতাও বৈষম্য সৃষ্টির সম্পূরক কারণ।

সম্পদশালীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে গত দশকে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স সম্প্রতি গত এক দশকে বিশ্বের ধনী জনগোষ্ঠীর সম্পদ পর্যালোচনা ও সামনের ১০ বছরের সম্পদ বণ্টন কেমন হবে, তার ওপর একটি গবেষণা চালিয়েছে। ওয়েলথ এক্সের এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের (৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের অধিকারী) সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে, বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। কাজেই এটি স্পষ্ট, বাংলাদেশে শ্রেণীবৈষম্য বাড়ছে। আবার বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণেও ধনী-দরিদ্র বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরো দরিদ্র হয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অসমর্থ হচ্ছে। অনেক সময় আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য রোগাক্রান্ত হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আবার নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গার্মেন্ট কর্মী, দিনমজুরদের হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে হাসপাতাল খোলা রাখার সময় (ওপেনিং আওয়ার)। আমাদের দেশে সব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বহির্বিভাগ থেকে সেবা প্রদান করা হয় মূলত সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। বহির্বিভাগের খোলার সময় ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর কর্মঘণ্টা একই সময় হওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে না। ফলে তারা মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রদানকারীদের (যেমন ওষুধের দোকানি, হাতুড়ে ডাক্তার ইত্যাদি) কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে। আবার নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ চিকিৎসা সেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে।
ফলে তাদের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় স্বাস্থ্যসেবার পেছনে। তাছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অনেক সময় তারা হাসপাতালের কর্মীদের বিরূপ আচরণের শিকার হওয়ার নজিরও রয়েছে।

অর্থনীতির বিভিন্ন তত্ত্ব থেকে জানা যায়, স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের সরকারের মধ্যে রাজধানীকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের একটি প্রবণতা থাকে। ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামীণ জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর পরও রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বাইরে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে গুণগত স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করছে।

নারী ও কিশোরীর অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নারী সেবা প্রদানকারীর অনুপস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে চান না। নারীদের আলাদা অপেক্ষার রুম (ওয়েটিং রুম), স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট না থাকার কারণে অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যান না। আবার অনেক হাসপাতালে গাইনোকলজিস্ট ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের অনুপস্থিতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ যন্ত্রপাতির অভাবও গর্ভবতী নারীদের সেবা গ্রহণে অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় হাসপাতালে মায়েদের জন্য আলাদা ব্রেস্টফিডিং কর্নার বা কিশোরীদের আলাদা কিশোর-কিশোরী কর্নারের অনুপস্থিতির কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ভয়ে তারা হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণ করতে চান না। অন্যদিকে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যাতায়াত একটি বড় কারণ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ না করার পেছনে। তদুপরি তাদের জন্য আলাদা লাইন না থাকায় তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ হাসপাতালে প্রতিবন্ধীদের জন্য র্যাম্প, হুইলচেয়ার, প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ওয়েটিং রুমের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই হাসপাতালবিমুখ হয়ে পড়েন।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, হিজড়া সম্প্রদায়ের অনেকেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মচারী ও চিকিৎসকদের কাছ থেকে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। তারা সরকারি ও বেসরকারি সেবাকেন্দ্রে না গিয়ে ফার্মেসির কাছে গিয়ে চিকিৎসাপত্র ছাড়াই ওষুধ নেয়। খুব বেশি অসুস্থ বোধ না করলে হাসপাতালে যায় না। এমনকি বেশির ভাগ ফার্মেসির বিক্রেতারা তাদের প্রতি ভালো আচরণ করে না এবং তাদের ওষুধ সরবরাহ করতে চায় না।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব, ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং সুবিধার অভাব, অপর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দীর্ঘ অপেক্ষার সময়, সঠিক অস্ত্রোপচার সুবিধার অনুপস্থিতি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাব স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির বৈষম্য আরো ত্বরান্বিত করছে। বিশেষ করে সহায়ক কর্মীর (সাপোর্ট স্টাফ, যেমন— আয়া, ক্লিনার, ফার্মাসিস্ট, এমএলএসএস, ল্যাব টেকনিশিয়ান ইত্যাদি) ক্রমাগত ঘাটতি ডাক্তারদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করেছে।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য-তথ্য সেবাপ্রাপ্তি পুরোপুরি উন্নত নয়। এ কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক সেবা ইত্যাদির পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। ফলে করোনা মহামারী চলাকালীন লোকজনের মধ্যে ব্যাপক অসেচতনতা দেখা যায়। এছাড়া কুসংস্কারের কারণেও স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য দেখা যায়।

উল্লিখিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান, সাম্যের ভিত্তিতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিম্নোক্ত পদক্ষেগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে।

সমতার ভিত্তিতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, অ্যাটাচমেন্ট বা ডেপুটেশনের মাধ্যমে অন্যত্র বদলি বন্ধ করা, প্রতিটি উপাজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে ওপরের দিকের সব হাসপাতালের সেবাদানকারীদের কিশোর-কিশোরী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তথা সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সহনশীল করে তুলতে হবে। এছাড়া রোগীর সন্তুষ্টি ও সেবা প্রদানের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক এবং রোগীদের প্রতি কর্মীদের সামগ্রিক মনোভাব উন্নত করতে হবে। সাপোর্ট স্টাফের ঘাটতি মেটাতে ক্লিনিং এবং অন্যান্য সাপোর্ট সার্ভিসের আউটসোর্সিং করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদার ভিত্তিতে ওষুধ ক্রয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং চাহিদার ভিত্তিতে হাসপাতালগুলোতে বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। এ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকারে বাধা কমাতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে নারী, কিশোর, বয়স্ক, হিজড়া ও প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে জনবল ও মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উৎপাদনশীলতা (ইফিশিয়েন্সি), কার্যকারিতা (ইফেকটিভনেস) এবং সামগ্রিক মান উন্নত করার জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধার জন্য শক্তিশালী পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা, সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিতে সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলো খোলা রাখার সময় বৃদ্ধি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিদরিদ্র, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্কদের বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্যসেবার খরচ বহন করতে পারে না, তাদের সহায়তা প্রদানে জরুরি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। তাছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণের ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’কে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অদূরভবিষ্যতে সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা চালুর মাধ্যমে এ বৈষম্য হ্রাস করা যেতে পারে।

আমরা যদি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে চাই অবশ্যই আমাদের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাপ্রাপ্তির বৈষম্যগুলো দূর করতে হবে। কেননা এ বৈষম্য দূর ব্যতীত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ‘পপুলেশন কাভারেজ’ উপাদানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই আমাদের স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসাপ্রাপ্তির বৈষম্য দূর করার
জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনগণের অংশগ্রহণ,
সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব ও সমন্বয় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে
বলে আশা করছি। 

 

ড. নাসরিন সুলতানা: অধ্যাপক ও পরিচালক

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়