রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পাঁচটি পার্ক বাণিজ্যিকীকরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নির্মিত ও সংস্কার করা পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের জন্য প্রস্তাব আকারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো এলাকায় প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি করে খেলার মাঠ প্রয়োজন। রাজধানীর জনসংখ্যা বিপুল কিন্তু আয়তন কম। বোধগম্য কারণে এ মানদণ্ড মানা এখানে সম্ভব নয়। সমস্যা হচ্ছে রাজধানীতে যেসব পার্ক বা মাঠ আছে, তার অনেকগুলোই ব্যবহার অনুপোযোগী, দখল-দূষণে প্রায় পরিত্যক্ত। যেসব পার্ক, মাঠ এখনো দখল হয়নি কিংবা আংশিক দখল হয়ে আছে, সেগুলো ঘিরেও চলছে দখল-বেদখলের প্রতিযোগিতা। যে কয়টি মাঠ ও পার্কের অস্তিত্ব রয়েছে, সেগুলোরও বাণিজ্যিকীকরণ করা হলে তা হবে আত্মঘাতী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা দরকার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার মানুষ বাস করা ঢাকা শহরে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম, মাত্র এক বর্গমিটার। এ থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকা শহরে খেলার মাঠের কেমন অবস্থা। জনসংখ্যার হিসাবে যে শহরে থাকার কথা দেড় হাজার খেলার মাঠ, কাগজে-কলমে সে শহরের দুই সিটি করপোরেশনের কাছে আছে কমবেশি ২৫০টির মতো খেলার মাঠ! অর্থাৎ সব শ্রেণী-পেশা, লিঙ্গ ও বয়সের মানুষ যে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করবে এমন জায়গার রয়েছে তীব্র সংকট। এ শহরে অপরিকল্পিত ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একাধিক ওয়ার্ড, যেখানে একটিও মাঠ নেই। ঢাকায় যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেই প্রবেশের অনুমতি নেই জনসাধারণের। বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কলোনির তত্ত্বাবধানে থাকায় সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পায় হাতে গোনা কিছু নাগরিক। বাস্তবিকভাবে জনসাধারণের প্রবেশ ও খেলাধুলার অনুমতি আছে—সিটি করপোরেশনের হাতে ঢাকায় এমন উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যা মাত্র ৫০টির মতো। এর বাইরে আছে মাঠ দখলের ব্যাপারটি। ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানে একসময় প্রতিটি রোডে আলাদা আলাদা মাঠ ছিল, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। বিভিন্ন সময় এ মাঠগুলো দখল হয়েছে, বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবনের জন্য। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আদর্শ একটি শহরের ১০-১৫ শতাংশ এলাকা জলাশয় এবং ১৫-২০ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। যদিও রাজধানী ঢাকায় সবুজ এলাকা ও জলাশয়গুলো ক্রমেই কংক্রিটের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে রাজধানীর খোলা জায়গা। গত দুই দশকে রাজধানীর খোলা জায়গার পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে, যা দুঃখজনক।
পার্কের বাণিজ্যিকীকরণের পক্ষে কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বেড়েছে। তাই পার্কের সুবিধা অব্যাহত রাখতে সরকারের অপ্রতুল বরাদ্দের সম্পূরক হিসেবে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, সেজন্যই বাণিজ্যিকীকরণ। এটা গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। এ ধরনের যুক্তি গ্রহণ করলে, যে কেউ দাবি করতে পারেন, গণভবন বা বঙ্গভবনের এক অংশে পাঁচতারকা মানের হোটেল, ক্যাসিনো ও খাবার রেস্তোরাঁ স্থাপন করে আয় বাড়িয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি কমানো যেতে পারে। তাই কোনো অবস্থাতেই পার্কের মতো জনসাধারণের স্থাপনার বাণিজ্যিক ব্যবহার যুক্তিসংগত নয়। বিদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা পার্কে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তাদের অর্থায়নে সম্পন্ন কাজের জন্য ফলকে দাতাদের নাম উল্লেখ থাকে বা তাদের প্রিয়জনের নামে উৎসর্গ করা হয়।
খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর ধারা অনুযায়ী খেলার মাঠ ও পার্ক অন্য কোনোভাবে ব্যবহার বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। আর এ আইন লঙ্ঘনে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় সাজার বিধান রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। আর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার প্রতিটি সেক্টরে একটি করে খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। রাজধানীতে একসময় প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক খেলার মাঠ ও পার্ক থাকলেও এখন অবস্থা একেবারেই বেহাল। ডিসিসির খেলার মাঠ ছাড়া পাড়া-মহল্লার মাঠগুলোয় ঘাসের অভাব, বাউন্ডারি না থাকা, তদারকির অভাব, মেলার জন্য স্টল বরাদ্দের কারণে শিশু-কিশোররা সেখানে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে মাঠে খেলা ছাড়াই বড় হচ্ছে ঢাকার শিশুরা।
শহীদ তাজউদ্দীন পার্কে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুল শেষে তারা খেলার মাঠে দোলনায় দোল খাচ্ছে, নাগরদোলা ও অন্যান্য খেলার সরঞ্জাম দিয়ে খেলছে। খেলা শেষে তাদের খাবার দেয়া হয়। অথচ এই পার্কের একাংশে আগে বাণিজ্যিক শিশুপার্ক ওয়ান্ডারল্যান্ড ছিল, একটা খাবারের দোকান ছিল। এখন এর সবই অতীত। প্রশ্ন ওঠে, ভালো উদাহরণ থাকতে সিটি করপোরেশন কেন বাণিজ্যিকীকরণের মতো পথে পা বাড়াল। এতে উন্মুক্ত স্থান ক্রমে কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হবে। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার মতো কোনো স্থানই আর অবশিষ্ট থাকবে না। বিদেশে পার্কের পাশেই রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ ভ্যানগাড়িতে কফি, আইসক্রিম, সোডা ও বিভিন্ন খাবারের ভেন্ডিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ভ্যানগাড়িতে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব গাড়িতে রক্তসহ অন্য যেকোনো নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ধরনের একটি ভ্রাম্যমাণ ভ্যান গুলশান, বনানী, বারিধারার সব পার্ক থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে পারে। স্মার্ট বাংলাদেশের পথ এটাই, জনসাধারণের পার্কে বাণিজ্যিক স্থাপনা উল্টোযাত্রা।
বড় বিষয় হলো, ঢাকায় পার্ক ও মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের নামে বর্তমানে বিভিন্ন ক্লাব ও সংস্থা এগুলোর দখল করেছে। সাধারণ মানুষের প্রবেশে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পরিকল্পনা, আইন ও ন্যায্যতার দৃষ্টিতে এগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন যেকোনো উদ্যোগই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এগুলো এলাকাবাসী ও সাধারণ জনগণের মাঠ। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় কাউন্সিলর এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে পার্ক ও মাঠ রক্ষায় একটি কমিটি করে দেবেন। সে কমিটিই ঠিক করে দেবে এসব গণপরিসর রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার জন্য কী করতে হবে। তারা যদি মনে করে, এসব রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান বিলবোর্ড-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই করা সম্ভব। অথবা অন্য কোনো উপায়েও সে ব্যয় ওঠানো যায়। যেমন ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে টাকার বিনিময়ে দোকান বরাদ্দ দিয়ে পার্কের পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসী বলছে, এ টাকা তারাই করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে দিতে আগ্রহী। আসলে মানুষ পার্কে যায় সবুজ, নির্মল ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশের জন্য। সিটি করপোরেশনের কাজ এ গণপরিসরগুলোয় উদ্যান ও উন্মুক্ত স্থানের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
রাজধানীতে খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা দেখলেই একটি শ্রেণীর মধ্যে তা অবৈধ দখলের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নানা অছিলায় কিংবা দোকানপাট বসিয়ে মাঠ-পার্ক দখল করতে শুরু করে। শুধু ব্যক্তি নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানও উন্মুক্ত স্থান দখলে নামে বিভিন্ন সময়ে। একবার দখল করলে তা উচ্ছেদ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। সিটি করপোরেশনই এখন এ কাজে সহায়তা করছে। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই কেবল তারা নড়েচড়ে বসে। নিজ দায়িত্ব থেকে তাদের নিজস্ব মাঠ ও পার্কের সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে খেলাধুলা ও ভ্রমণের উপযোগী করে তোলার তাগিদ অনুভব করে না। শুধু সিটি করপোরেশনের মাঠই নয়, বিভিন্ন সরকারি কলোনির অনেক মাঠ ও পুকুরও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাঠ ও পুকুর ভরাট করে বড় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। এসব মাঠ ও পুকুরে শিশু-কিশোর থেকে সব বয়সীরা খেলাধুলা ও সাঁতার কাটত। আমরা মনে করি, আগামী প্রজন্মের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য নতুন করে জায়গা অধিগ্রহণ করার দরকার নেই। উভয় সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা মাঠ-পার্ক দখলমুক্তকরণ এবং সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কেও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাদের অধীনে থাকা খেলার মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ করতে হবে।










