অর্থমন্ত্রী
আ হ
ম মুস্তফা
কামাল এমপি
মহান জাতীয়
সংসদে ২০২১-২২
অর্থবছরের জাতীয়
বাজেট পেশ
করলেন। এক
বছরের সরকারি
আয়-ব্যয়ের
হিসাব নিয়ে
প্রণীত হয়
বাজেট, যা
সংসদে পেশ
করে অনুমোদন
নেয়ার কাজটি
বাধ্যতামূলক, বিশেষত
গণতান্ত্রিক বিধি
ব্যবস্থায়। একটা
সময় ছিল
যখন প্রতি
বছরই বাজেট
পেশ আর
পাস নিয়ে
দেশব্যাপী প্রচুর
শোরগোল হতো।
বাজেট পেশের
দিন কাজকাম
ফেলে রেডিও
বা টেলিভিশনের
সামনে বসত
আবালবৃদ্ধ। অন্যদিকে
বাজেট পেশের
পর পরই
ভাষার অস্ত্র
শানিত করে
বিরোধী ও
সরকারি পক্ষ
মশাল নিয়ে
রাস্তায় নামত।
এক পক্ষের
স্লোগান থাকত
গরিব মারার
বাজেট বর্জন,
অন্য পক্ষের
উল্লাস উন্নয়নের
বাজেট অর্জন।
গগনবিদারী স্লোগানে
কেঁপে উঠত
আকাশ-বাতাস।
অথচ এখন
বাজেট ঘিরে
আগের মতো
তেমন শোরগোল
শোনা যায়
না; নেই
মিছিল, মিটিং
ও স্লোগান।
কখন বাজেট
আসে, কখন
যায় কেউ
খবর রাখে
বলে মনে
হয় না।
বাজেটকেন্দ্রিক কিছু
আলোচনা যে
এখনো হয়
না, তা
নয়; তবে
সেটা ‘টল
টক’ শো
কিংবা বিজ্ঞজনের
বাজেট বিবৃতির
মধ্যে সীমিত।
হতে পারে,
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের
কারণে প্রতিবাদ
বা সমর্থনের
বাহন বদলে
গেছে। এ
পরিবর্তন শুভ
না অশুভ,
সে বিতর্ক
অন্যদিনের জন্য
রাখা গেল।
যাক, যা
বলছিলাম— বাংলাদেশের
বর্তমান অর্থমন্ত্রীর
তৃতীয় ও
করোনাকালের দ্বিতীয়
বাজেট সংসদে
উপস্থাপিত হলো
গেল বৃহস্পতিবার
(জুন ৩,
২০২১)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো,
বাংলাদেশের ৫০তম
বাজেট হিসেবে
সুবর্ণজয়ন্তীতে ও
জাতির পিতার
জন্মশতবার্ষিকীতে এর
আলাদা মাত্রিকতা
সহজেই অনুমেয়—‘স্বপ্ন
স্বপ্ন স্বপ্ন
দেখে মন’।
সারা পৃথিবীর
অর্থমন্ত্রীরা এখন
তীরহারা ঢেউয়ের
সাগর পাড়ি
দেয়ার মাঝি,
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীও
এর ব্যতিক্রম
নন। আমাদের
মন্ত্রী কবি
টেনিসনের কবিতা
টেনে ব্রিটিশ
অর্থমন্ত্রীর মতো
বলতে পারতেন, ‘that
which we are, we are/made weak by time and fate, but strong in will/to strive,
to seek, to find, and not to yield.’
দুই। বাজেট
ভাষণ সাধারণত
দীর্ঘ হয়।
এর কারণ
দুই পর্বে
বাজেট উপস্থাপিত
হয়। প্রথম
পর্বে বিদায়ী
অর্থবছরের সার্বিক
মূল্যায়ন-সংবলিত
সম্পূরক বাজেট
এবং দ্বিতীয়
পর্বে থাকে
আসছে অর্থবছরে
আর্থসামাজিক উন্নয়নে
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ
ও সম্পদ
আহরণের বিবরণসহ
নানা বিষয়-আশয়।
দেখা গেছে
কোনোভাবে অর্থমন্ত্রীর
ভাষণের একটা
বিরাট অংশ
খেয়ে ফেলে
ভূমিকা। এক্ষেত্রে
ব্যতিক্রম ছিল
১৯৭৭ সালের
মাত্র ৮০০
শব্দের এইচ
এম প্যাটেল
প্রস্তাবিত ভারতের
অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট;
সম্ভবত সবচেয়ে
ছোট বাজেট
বক্তব্য। যাই
হোক, পরিসংখ্যানের
পাহাড়ে আবৃত
রসকষহীন এ
ভাষণ চলাকালে
অনেক সংসদ
সদস্যই ঢুলুঢুলু
লাল চোখে
ঢোলেন, কেউবা
হাই তোলেন।
সম্ভবত সেজন্য
সবাইকে উজ্জীবিত
রাখার জন্য
অনেক অর্থমন্ত্রী তাদের
ভাষণে কবিতা,
কৌতুক কিংবা
গানের কলি
ব্যবহার করেন।
ভাষণ প্রাণবন্ত
করার জন্য
এবং বিরোধী
দলকে খোঁচা
দেয়ার লক্ষ্যে
একবার ভারতের
এক অর্থমন্ত্রীর
ছোড়া দুটো
লাইন সংসদে
হাসির রোল
তুলেছিল: ‘গরিবকে
পেট মে
দানা/গৃহিণীকে
টুকিয়া মে
আনা’ (গরিবের
পেটে খাবার,
গৃহিণীর থলেতে
টাকা)।
তবে
ওই দেশেরই
সাবেক অর্থমন্ত্রী
যশোবন্ত সিংহের
কথাটা আজও
কানে বাজে
এবং বর্তমান
করোনাকালে প্রাসঙ্গিক
বলে মনে
করছি: ‘সময়
এসেছে ঝড়ের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
ঘোষণার; তুমি
আর কতকাল
সৈকতে হেঁটে
চলবে?’
তিন। শুরু
থেকে শেষ
পর্যন্ত আ
হ ম
মুস্তফা কামালের
সুলিখিত বাজেট
ভাষণে যেমন
আছে উল্লাস
করার উপাদান,
তেমনি আছে
উদ্বেগের উৎসস্থল;
নেই শুধু
করোনা সংকট
উতরানোর উপায়
নিয়ে পাকাপোক্ত
পরিকল্পনা। আবার
মন্ত্রীর বাজেট
ভাষণে উপেক্ষিত
কিছু গুরুত্বপূর্ণ
দিক আমাদের
দৃষ্টি এড়ায়
না।
প্রস্তাবিত
৬ লাখ
কোটি টাকার
বাজেট বাংলাদেশের
মোট অভ্যন্তরীণ
উৎপাদন বা জিডিপির
প্রায় ১৭
শতাংশ। হাতি
দেখতে যেমন,
খায়ও তেমন;
অর্থাৎ অর্থনীতির
আকার বৃদ্ধির
সঙ্গে সঙ্গে
বাজেটের আকারও
বড় হবে—এটাই
স্বাভাবিক। ৩০
লাখ কোটি
টাকার জিডিপি
নিয়ে বাংলাদেশের
অর্থনীতি এখন
পৃথিবীর বুকে
৪১তম বৃহৎ
অর্থনীতি হিসেবে
দাঁড়িয়ে আছে,
সেকথা অর্থমন্ত্রী
গর্বভরে বলতেই
পারেন। প্রাপ্ত
তথ্য অনুযায়ী
প্রাক্কলিত রাজস্ব
আয় প্রায়
৪ লাখ
কোটি টাকা
(রাজস্ব-জিডিপি
অনুপাত প্রায়
১১ শতাংশ)।
সম্পদ আহরণে
বিদ্যমান প্রশাসনিক
দক্ষতা ও
কর কাঠামো
এবং সংস্কার
সম্পর্কিত অতীত
অভিজ্ঞতা এ
অনুপাতের অনুকূলে
সায় দেয়
বলে মনে
হয় না।
তাছাড়া বিভিন্ন
কর উৎসে
এত ছাড়
দেয়ার পর
কোথা থেকে
কর আসবে, সেটাও
মিলিয়ন ডলার
কোশ্চেন। গেল
অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির
হার নাকি
ছিল ৬
দশমিক ১
শতাংশ, আগামী
বছরের আশা
৭ দশমিক
২ শতাংশ। তবে
১-২
শতাংশ পয়েন্ট
মাইনাস ধরলেও,
এমনকি করোনাকালেও,
বাংলাদেশ পৃথিবীর
মধ্যে অন্যতম
বর্ধনশীল অর্থনীতি।
এমন একটা
সুখবর মরা
মনে আনন্দের
বান আনে
বৈকি।
তার বাজেট
ভাষণে সবচেয়ে
বড় খবর
কৃষি খাতের
জন্য প্রস্তাবিত
প্রণোদনা, রেয়াত
ও অন্যান্য।
করোনার এই
অস্বস্তিকালে চাল,
মাছ, মাংস,
ডিম, শাকসবজি
যথাযথ পরিমাণে
উৎপাদন করে
কিছুটা হলেও
স্বস্তিতে রেখেছে
আমাদের কৃষি
খাত—‘আমরা
চাষ করি
আনন্দে/মাঠে
মাঠে বেলা
কাটে সকাল
হতে সন্ধে।’
স্বভাবতই এ
খাতের উন্নয়নের
জন্য গৃহীত
পদক্ষেপগুলো অভিনন্দনযোগ্য।
তবে স্বাস্থ্য
খাতের জন্য
প্রস্তাবিত অতিরিক্ত
অর্থ বরাদ্দ
প্রশ্নহীন প্রশংসা
দাবি করে
বলে মনে
হয় না। করোনা
প্যানডেমিকের কারণে
আমরা বুঝতে
পেরেছি যে
স্বাস্থ্য খাত
একটা তলাবিহীন
ঝুড়ির মতো।
গেল বাজেটে
বরাদ্দ দেয়া
অর্থের কতটুকু
যথাযথ ব্যবহার
করা হয়েছে,
সে প্রশ্ন
সামনে আসাই
স্বাভাবিক নয়
কি? তাই
সমালোচকরা মনে
করেন, দুর্নীতিতে
আকণ্ঠ নিমজ্জিত
এ খাতের
জন্য অধিক
বরাদ্দ মানে
শেয়ালের কাছে
মুরগি বর্গা
দেয়ার মতো
পরিস্থিতি। তবে
আশার কথা,
তিনি আশ্বাস
দিয়েছেন, তার
মন্ত্রণালয় তীব্র
তদারকির মাধ্যমে
অর্থের অপব্যবহার
রোধ করবে।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী
বলেছেন, এ
বাজেট জীবন
ও জীবিকার
বাজেট। জীবিকার
জন্য তো
বটেই এবং
এর প্রমাণ
ব্যবসা-বাণিজ্য
ও কর্মসংস্থান
সৃষ্টিকে গুরুত্ব
দিয়ে একটা
ব্যবসাবান্ধব বাজেট
উপহার দেয়া।
সবচেয়ে বড়
কথা, ‘Made in Bangladesh’ ব্র্যান্ড
নামে আমদানি
প্রতিস্থাপক শিল্পের
জন্য প্রণোদনা
প্যাকেজ ঘোষণা
একটা নতুন
মাইলফলক। করোনাকালে
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন
ও ভোগের
ওপর গুরুত্ব
দেয়া সমীচীন।
তবে অতীতের
আমদানি প্রতিস্থাপক
‘শিশু
শিল্প যেমন
মুখ থুবড়ে
পড়েছে, সেই
থেকে সাধু
সাবধান! তবে
এ বাজেট
যতটা জীবিকার
জন্য, ঠিক
ততটা জীবনের
জন্য কিনা,
তা নিয়ে
প্রশ্ন তুলেছেন
কেউ কেউ।
জীবনের জন্যই
যদি হবে,
তাহলে করোনার
কারণে দারিদ্র্যে
নিপতিত নতুন
দরিদ্রের বিশাল
বাহিনী নিয়ে
চিন্তাভাবনার কথা
শুনিনি কেন?
কেন কথা
বলা হয়নি
দ্বিতীয় ঢেউয়ের
ধাক্কা সামলানোর
কৌশল নিয়ে?
বাজেটে আগামী
অর্থবছরে দেশের
জনগণের বড়
একটি অংশকে
টিকা প্রদানের
আশাবাদ ব্যক্ত
করা হয়েছে।
কিন্তু কীভাবে
এটি প্রদান
করা হবে,
তা নিয়ে
কোনো পরিকল্পনাই
নেই। এর
জন্য কত
অর্থ ব্যয়
হবে, তার
কি কোনো
হিসাব আছে?
বরাদ্দ কি
দেয়া হয়েছে?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
আয়ের ওপর
ভ্যাট আরোপের
যৌক্তিকতা নিয়ে
প্রশ্ন উঠতেই
পারে। যেখানে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
করোনার মধ্যে
অনলাইন শিক্ষা
কার্যক্রম চালিয়ে
নিয়ে যাচ্ছে
সেখানে অর্থমন্ত্রীর
নীতি ক্ষতির
কারণ হয়ে
উঠতে পারে।
করোনার আগে
থেকে স্থবির
হয়ে পড়া
ব্যক্তি বিনিয়োগ
করছাড়ে বাড়বে
কিনা, তা
নিয়ে সংশয়
রয়েছে। সুষ্ঠু
পরিবেশ কি
নিশ্চিত করা
গেছে? এছাড়া
গত বছরে
প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান
তৈরি করতে
না পারার
ব্যর্থতা স্বীকার
না করে
নতুন কর্মসংসস্থান
তৈরির যে
প্রস্তাব দেয়া
হয়েছে, তার
বাস্তবায়ন নিয়ে
সংশয় রয়েছে।
করোনার মধ্যে
সবচেয়ে বেশি
কার্যকর হয়ে
ওঠা এমএফএস
সেবার ওপর
ধার্যকৃত ভ্যাটের
হার বাড়ানো
অর্থমন্ত্রীর আরো
একটি ভুল
সিদ্ধান্ত। এর
দায় গিয়ে
পড়বে গরিবদের
ওপরই। বরং
তাদের কর
আরো কমানো
উচিত।
পুডিংয়ের স্বাদ
যেমন খাওয়াতে,
বাজেটের স্বাদ
তেমন বাস্তবায়নে।
বাজেট ঘোষণায়
আমরা যত
পারদর্শী, বাজেট
বাস্তবায়নে ঠিক
তত কিনা,
সন্দেহ আছে।
আর তাই
ফি বছর
হোঁচট খাই।
অর্থমন্ত্রী বাজেট
বাস্তবায়ন, সম্পদ
আহরণ, সুশাসন,
দুর্নীতি দমন
(বিশেষত স্বাস্থ্য
খাতে), প্রবৃদ্ধি
ইত্যাদি বিষয়
নিয়ে ইতিবাচক
মন্তব্য করেছেন
তার বাজেট
ভাষণে। আশা
করি, তিনি
সফল হবেন।
অতএব, আপাতত
আমাদের কাজ
হলো মান্না
দের গান
শুনে সময়
কাটানো—‘আশায়
আশায়
তবু এই
আমি থাকি,
যদি আসে
কোনো দিন
সেই সুখ
পাখি—এই
চেয়ে থাকা
আর প্রাণে
সয় না।’
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক, বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










