জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে বহুল আলোচিত একটি প্রত্যয় ‘সংস্কার’। গত সময়ে রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান অব্যবস্থাপনায়, অপেশাদারিত্বে ধসে গেছে, তার সংস্কার জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। গণমানুষের একটু শান্তিতে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে, স্বস্তির জীবনমান নিশ্চিত করতে ইতিবাচক সংস্কার যেসব শ্রেণীর মানুষের প্রাণের দাবি, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথায়, কতটুকু সংস্কার দরকার, কখন আর কে বা কারা সেই সংস্কারের কর্তা হবেন, সেই নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতপার্থক্য। সেসব মতের ভিড়ে, আলাপের ঝুড়িতে একটা আলাপ গুরুত্ব পাচ্ছে কম। অথচ সেই সংস্কার সবার আগে দরকার। নইলে অন্য সব পণ্ডশ্রম।

স্বৈরাচার পলায়নক্ষণ থেকে শুরু করে পরবর্তী দিনগুলোয় লুটপাট, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা মব তৈরি করে সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা নতুন কোনো ঘটনা নয় বরং পুনরাবৃত্তি। আবার প্রতিনিয়ত ধর্ষণের নতুন নতুন ঘটনা অপ্রত্যাশিত হলেও আজও থামানো যাচ্ছে না। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অব্যাহত পরিবর্তন আশাজাগানিয়া তবু সমাজে লুটতরাজ, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও রাজনৈতিক অনাচারের বিরাজমান বাস্তবতা আমাদের সবার জন্য গভীর দুশ্চিন্তার বিষয়। এ দুর্ব্যবহার ও অবিচারের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং মানুষের মধ্যে নৈতিকতা এবং চরিত্রের অভাব মূল কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যতক্ষণ না সমাজের মৌলিক মূল্যবোধ, সততা, দায়বদ্ধতা ও মানবিক গুণাবলিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ‘সংস্কার’ সম্পূর্ণ ও স্থায়ী ফলাফল আনতে পারবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত স্বার্থের লালসা প্রত্যহ জনজীবনকে ক্রমাগত হুমকির মুখে তটস্থ রাখে। এ ধরনের সমস্যা যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন তা কেবলমাত্র অর্থনীতি বা রাজনীতিতেই নয়, বরং সমাজের মৌলিক নৈতিক মূল্যবোধের ওপরও গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অনাচার শুধু সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে না, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে অসংখ্য নৈতিক দ্বন্দ্ব ও প্রতারণার জন্ম দেয়। দেশের যেকোনো ধরনের সংস্কার কার্যক্রম যদি শুধু বাইরের কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে, তবে তা মূল সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হবে, কারণ সমস্যার মূলে রয়েছে মানুষের মনোভাব ও চরিত্রের দুর্বলতা। চরিত্রের দুর্বলতা যে কত ভয়ানক বিষ, তা আমরা আয়নার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি; সেই আয়না হতে পারে নিজ ঘরের কিংবা রাষ্ট্র বা সমাজের আয়না, যাকে আমরা গণমাধ্যম নামে চিনি।

কেবল ব্যক্তিস্বার্থে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবার আশায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই নির্দ্বিধায় মিথ্যা, অন্যায়, অন্যায্যতার সঙ্গে আঁতাত করে চলা মানুষের উদাহরণ আমাদের চারপাশে অনেক। সেই মানুষ নিয়ে আমরা সংস্কার কাঠামো যতই শক্তিশালী করি, তা একটুতেই ধসে পড়বে। কারণ প্রতিটি জাতির অগ্রগতি যেসব স্তম্ভের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের চরিত্র ও নৈতিক গুণাবলি। শক্তিশালী ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলো ব্যক্তিগত ও সামাজিক চারিত্র্যিক উন্নয়ন। যখন ব্যক্তির চরিত্রে সততা, সতর্কতা, দায়বদ্ধতা, সহানুভূতি ও নৈতিক মূল্যবোধ স্বাভাবিক চর্চার মধ্যে থাকে, তখন তারা নিজেদের মধ্যে একটি সুস্থ সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলে, যা সমাজের সব সেক্টরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কেন সর্বাগ্রে চরিত্রের সংস্কার প্রয়োজন সে প্রসঙ্গে কয়েকটি নোকতা উল্লেখ করা যেতে পারে।

এক. সমাজে যখন অযোগ্য নেতৃত্ব ও দুর্নীতির ছোঁয়া পড়ে, তখন মানুষ বিশ্বাসহারা হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তিরা নিজেদের উচ্চতর নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। সমাজে যেভাবে প্রতিটি কোণে অবিচার ও অনিয়ম ছড়িয়ে পড়ছে, তা মূলত মানুষের নৈতিক স্খলনের প্রতিফলন। এর পুরস্কার হিসেবে গত ৫৫ বছরের বাংলাদেশের চেহারার দিকে তাকালেই নৈতিক ভগ্নদশা টের পাওয়া যায়। সর্বমহলে নেতৃত্বের সেসব মানবীয় দুর্বলতা কাটিয়ে চরিত্র সংস্কারের মাধ্যমে এই ইতিবাচক মনোভাব ও মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার সম্ভব, যা সমগ্র সমাজকে একটি সুস্থ ও দায়বদ্ধ ভিত্তি প্রদান করবে।

দুই. প্রতিটি সফল সমাজের মূলে থাকে একটি সুদক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ প্রশাসন। তবে প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি যদি সামাজিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব না দেয়া হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। চরিত্র সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সৎ ও নৈতিক আচার-ব্যবহার গড়ে উঠলে, স্বচ্ছতা ও সুশাসন সহজেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তিন. অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, যেসব সমাজ প্রাথমিকভাবে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক চরিত্রের সংস্কারে বিনিয়োগ করেছে, তারা কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার সহজেই সম্পন্ন করতে পেরেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সত্তরের দশকে সিঙ্গাপুরে দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয় ছিল ব্যাপক। তবে সে সময়ের সঠিক নেতৃত্ব সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে একটি দৃঢ় নৈতিক বন্ধন রচনা করতে সক্ষম হয়েছিল, যা প্রতিটি নাগরিককে দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিশেষ করে সুশাসন ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে যে বিনয় ও নিষ্ঠা দেখানো হয়েছে, তা আজকের বিশ্বের অন্যতম মডেল হিসেবে গণ্য। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান তার ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এসেছে শক্তিশালী সামাজিক মূল্যবোধ, পরিশ্রম এবং আন্তরিকতার ওপর ভিত্তি করেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের মাধ্যমে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও সুশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। কারণ সেখানে শিক্ষাপদ্ধতি থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া প্রতিটি স্তরে এ নৈতিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াও চরিত্র সংস্কারের গুরুত্ব বুঝেছিল। দেশটিতে সামাজিক নৈতিকতা ও পরিবারিক মূল্যবোধের যথাযথ প্রচলনের ফলেই দেশটির উন্নয়ন ও আধুনিকতার লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার নির্দেশিকা স্পষ্টভাবে মেনে চলার পুরস্কারস্বরূপ দেশটি বিশ্ববাজারে উচ্চ প্রতিযোগিতার সঙ্গে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশের আবহমান বাস্তবতায় সমাজের নাগরিকদের চরিত্র সংস্কারের উপযুক্ত উপায় ও কৌশল কী হতে পারে?

সমাজে চরিত্র সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করা যায় ছোট ছোট পরিবর্তন থেকে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে সেসব উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে তা হলো:

এক. শিক্ষা ব্যবস্থা তথা বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকে পাঠ্যক্রমের আবশ্যিক অংশ করে তোলা উচিত। কেবল পাস করার জন্য নয় বরং ছাত্রছাত্রীদের প্রাত্যহিক জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের স্বাভাবিক অনুশীলন নিশ্চিত করতে উদ্বুদ্ধ করা। তবে মাথায় রাখতে হবে, সামাজিক শিখন সূত্র মতে যেহেতু ছোটরা বড়দের দেখে অনুকরণ করে শেখে, তাই বড়দের উচিত হবে আগে নিজেদের চরিত্রের সংস্করণ করে তারপর ছোটদের উৎসাহিত করা। এভাবে সৎ আচরণ, পরোপকার এবং নৈতিকতার চর্চা শুরু করা হলে, ভবিষ্যতে একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গঠনের যাত্রা শুরুর পর একটা লম্বা সময় অতিবাহিত হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে দৃশ্যমান উপযোগী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অথচ সব সংস্কার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি মূল ভিত্তি অর্থাৎ শিক্ষায় সত্যিকার মনোযোগ না দেয়া হয়।

দুই. গণমাধ্যম যেহেতু সামাজিক ঘটনাবলি তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে, সুতরাং সেই মাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চরিত্রের সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের অসৎ চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তার অধঃপতনের ফলে গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা মোটাদাগে সমাজে অশুভ প্রভাব ফেলছে। তাই সেদিকে লক্ষ্য রেখে সাংবাদিকতা ও মিডিয়াতে সঠিক ও নৈতিক মানসম্পন্ন সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নেতিবাচক চর্চা থেকে দূরে রেখে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। কেননা মিডিয়া যদি দায়বদ্ধতার সঙ্গে সমাজের নৈতিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে, তাহলে জনগণ সচেতন হয়ে উঠবে এবং অসুস্থ ভাইরাল কালচার থেকে বের হয়ে আসার প্রবণতা তৈরি হবে।

তিন. নৈতিক চর্চা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজের অন্যতম স্টেকহোল্ডার যেমন নাগরিক সমাজ, এনজিও ও বিভিন্ন সুশিক্ষিত বর্গের মিলিত প্রচেষ্টায় চরিত্র সংস্কারের জন্য পাবলিক ক্যাম্পেইন, কর্মশালা ও সেমিনার পরিচালনা করা যেতে পারে। তবে সেসব সভা সমাবেশ, সিম্পোজিয়াম যেন কেবল বাজেট বার্নিংয়ের মাধ্যম না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আউটপুট ওরিয়েন্টেড কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মধ্যে নৈতিক সচেতনতা ও ভালো আচরণের বীজ বপন করলে অবশ্যই ভালো ফল পাওয়া যাবে।

চার. সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সমাজ ব্যবস্থায় আদিকাল থেকেই নেতৃত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নেতার আদর্শ, নেতার গুণাবলি, নেতার ধীশক্তির ওপর অনেকাংশে সফলতা ব্যর্থতা নির্ভর করে। তাই নেতা যদি সঠিক না হন, নৈতিক অবস্থান যদি তার পোক্ত না হয়, তবে যতই সিস্টেম সংস্কার করা হোক, তাতে ফল আসবে না। তাই সমাজে এমন নেতাদের উৎখাত করা প্রয়োজন যারা নৈতিকতার আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছেন। কেননা আদর্শ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নীতিবান নেতারা যখন জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন, তাদের কথার প্রভাব সাধারণ নাগরিকের ওপর পড়ে এবং জনসাধারণও ওই আদর্শগুলো মেনে চলতে উদ্দীপ্ত হয়। আর যেকোনো জাতির অগ্রগতির মূলে তার নাগরিকদের চরিত্রগত বিকাশের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই যখনই কোনো দেশ সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালায়, তখন সেটি বাস্তবিক আর্থসামাজিক উন্নতির পথ প্রশস্ত করে।

যেহেতু জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় অন্য সব অঙ্গনের সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রাঙ্গণেও পরিমার্জন প্রক্রিয়া দৃশ্যমান, সেখানেও আমাদেরকে নৈতিক ভিত্তিকে পাকাপোক্ত করার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। পুরনো আদলে যেখানে অনেকেই রাজনৈতিক মোড়কে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে সমাজকে বিভাজিত করতে চায়, সেখানে নতুন বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে সুশিক্ষা ও নৈতিকতার প্রতি একটি দৃঢ় শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশীলতা, সততা ও দায়বদ্ধতার চর্চা শুরু করলে, ধীরে ধীরে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

শারীফ অনির্বাণ: শিক্ষক ও পিএইচডি গবেষক