দুই-তিনদিন আগে আমার এক বন্ধুর দুঃখের কথা শুনলাম। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে শেয়ারবাজারে তার শেয়ারের মোট মূল্য ছিল ২৮ লাখ টাকার মতো। এগুলো প্রাইমারি শেয়ার এবং এর থেকে উদ্ভূত শেয়ার। আজকের দিনে এ শেয়ারের মূল্য ১৭ লাখে ঠেকেছে। এতে সে ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু তার ভাত-কাপড় বন্ধ হবে না। কিন্তু অনেকেই আছেন, যাদের ভাত-কাপড় বন্ধ হবে। এমন ছোট ছোট দুঃখে ভরা এখন বহু মধ্যবিত্তের জীবন। এর অর্থ কী? সমস্যাটি কি ব্যক্তিগত দুঃখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? না, তা আদৌ নয়। শেয়ারবাজারে মূল্যপতন মানে বাজারে মন্দার লক্ষণ। আমি কারসাজির দরপতনের কথা বলছি না। স্বাভাবিক দরপতনের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম যখন হ্রাস পায়, তখন দেখা যায় এর রাজস্ব আয় কম হচ্ছে। তার মানে বেচাকেনা ও উৎপাদন কম। তাহলে হবে কী? রাজস্ব
আয় কম হলে মুনাফাও কম হবে। মুনাফা কম হলে লভ্যাংশ কম হবে, শেয়ারহোল্ডারদের আয় কমবে। আবার কোম্পানির রাজস্ব আয় কমবে। প্রফিট কম হলে সরকার রাজস্ব বা আয়কর কম পাবে। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হবে। বেচাকেনা কম মানেই আমদানি-রফতানি ব্যবসাও কম। আমদানি-রফতানি সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস। যত বেশি আমদানি-রফতানি, তত বেশি সরকারের রাজস্ব আয়।
লভ্যাংশজাত আয় কম হলে লোকের আয় কম হবে। আয় কম মানে বাজারে চাহিদা কমবে। লোক কম টাকা খরচ করবে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে সাদা চোখে যে খবরটির কোনোই গুরুত্ব নেই, অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব প্রচুর।
প্রতিদিন সাদামাটা অনেক খবর ছাপা হচ্ছে, যা সাধারণ পাঠকদের কাছে কোনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। এই যেমন রফতানি আগের মতো বাড়ছে না। আমদানিও কম। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কম। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাজারে ডিপোজিটের টানাটানি। ‘আগোরা’ নামের একটি বিখ্যাত চেইন স্টোর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ‘গ্ল্যাক্সো’ নামের একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ‘গ্রামীণফোন’ সরকারের টাকা, পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না। সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে হচ্ছে না। অতএব, সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ধার করছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট যা ধার করার কথা, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই সরকার তা করে ফেলেছে। বড় বড় প্রকল্পের অর্থ জোগানের জন্য সরকার তার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সব উদ্বৃত্ত টাকা তুলে আনার জন্য আইন পাস করেছে। ভালো খবর শুধু রেমিট্যান্সের। বিদেশ থেকে টাকার প্রবাহ বেশ বেড়েছে। দেশের ভেতরে রেমিট্যান্স প্রাপকদের খরচ বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা, অবশ্যই দেশী পেঁয়াজের দাম। নতুন পেঁয়াজ ওঠার পরেও এই দাম। চীনা করোনাভাইরাসের আছর আদা-রসুনে পড়েছে। চীন থেকে আদা-রসুন আসে। এদিকে ভোগ বাড়ানোর জন্য সরকার বিদেশ ভ্রমণকালে প্রযোজ্য ডলারের কোটা দ্বিগুণ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। লোকে সঞ্চয়পত্র কিনছে না। এতে এখন বহু নিষেধাজ্ঞা। এই যে ছোট ছোট দৈনন্দিন খবর, তা একসঙ্গে করলে একটা অর্থ পাওয়া যায়। আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করলে এসব খবর কোনোই মূল্য বহন করে না সাধারণ মানুষের কাছে।
আপাতদৃষ্টিতে মূল্যহীন একটি খবরের শিরোনাম: ‘বড় করপোরেটদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না’। খবরটি দৈনিক বণিক বার্তার। খবরটিতে ১৭টি বড় কোম্পানির রাজস্ব আয়ের একটি চিত্র দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে এসব কোম্পানির রাজস্ব আয় কমছে। এতে কর-পরবর্তী মুনাফাও কমছে। কেন রাজস্ব আয় কমছে, তার একটা একটা করে কারণও উল্লেখ করা হয়েছে।
দৃশ্যত খবরটি কোনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যাবে এ খবরে লুক্কায়িত আছে একটা মন্দার লক্ষণ। আমদানি-রফতানি, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি, সরকারের রাজস্ব আয়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ, বাজারে বেচাকেনা ইত্যাদির সঙ্গে বণিক বার্তার খবরটি মেলালে মন্দার লক্ষণ অনুভূত হয়। সারা বিশ্বই এখন মন্দাক্রান্ত। প্রতিবেশী ভারত মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের বাজারে চাহিদা কম। লোকের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। তাই ২০২০-২১ অর্থবছরের ভারতীয় বাজেটে লোকের হাতে অধিক পরিমাণ টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত বার্ষিক আয়ে কোনো আয়কর নেই। বহু কর রেয়াতের ঝামেলা থেকে করদাতাদের মুক্ত করা হয়েছে। বড় বড় অবকাঠামোর কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সুশাসনে আনার জন্য পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। শুধু ভারতে নয়, দেশে দেশে এখন মন্দার যে ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরাও কি ‘মন্দাক্রান্ত’ বলে স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করব? এ প্রশ্ন এখন জরুরি। অনেকদিন ধরেই বাজারে নানা খবর আলোচিত হচ্ছে।
বড় ব্যবসায়ী আবদুল মোনায়েমের অবস্থা ভালো নয়। ‘নাভানা’র অবস্থা ভালো নয়। সরকারের কাছে আর্জি, তাদের অধিগ্রহণ করা হোক। ‘অটবি’র সম্পত্তি নিলামে উঠেছে। চট্টগ্রামের অনেক বড় পুরনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো নয়। গার্মেন্ট খাত ‘অ্যাকসেস ক্যাপাসিটি’র শিকার এবং তা এ শিল্পের নেতারাই বলছেন। বস্ত্র খাত, ইস্পাত শিল্প, সিমেন্ট, চিনি ইত্যাদি শিল্পে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এসব শিল্পেও অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি হয়েছে। অনভিজ্ঞ অনেক উদ্যোক্তা না বুঝে অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠিত শিল্প হাউজের অনেকেই হিসাব না করে ‘এক্সপানশন’ করেছে। এক খাত থেকে লাফিয়ে আরেক খাতে গেছে, যেখানে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
ব্যাংকাররা না বুঝে, না শুনে এসবে ঋণ দিয়েছেন। এর একটাই কারণ। তারা মনে করেছেন, এরা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এদের ঋণ দিলে ঝুঁকি নেই। এ কাজ করতে গিয়ে তারা ছোট ও মাঝারি শিল্পকে অবহেলা করেছেন। এসবের পরিণাম কী?
ব্যবসায় মন্দার পরিণতি আমাদের দেশে একটাই। সেটা কী?
আমরা ‘ব্যাংক ফিন্যান্স লেড’ গ্রোথ অনুসরণ করছি। বিনিয়োগের সিংহভাগ টাকা ব্যাংক কর্তৃক সরবরাহকৃত। হরেদরে তা আমরা করেছি। শেয়ারবাজার নেই, বিদেশী বিনিয়োগ নেই। তাই সবাই গেছে ব্যাংকে। ব্যাংক যতটুকু না ব্যবসায়িক বিবেচনায় ঋণ দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি দিয়েছে প্রভাবে। কারণ একটা বাজারে ‘ক্রেডিট’ সরবরাহের ব্যবস্থা অফুরন্ত নয়। টাকা কম, চাহিদা বেশি। যেখানেই পণ্যের অভাব আছে, সেখানেই হবে দুর্নীতি, চুরিচামারি। ‘ক্রেডিট ইজ আ স্কার্স কমোডিটি’। সেই স্কার্স কমোডিটি বণ্টনে আমরা প্রভাবের শিকার হয়েছি। ফলে সর্বত্র অ্যাকসেস ক্যাপাসিটির লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের বাজারের আকার খুব বেশি বড় নয়। আমরা ব্যাংক ক্রেডিটে করেছি রফতানিমুখী শিল্প। রফতানি বাজারে এখন আকাল দেখা দিচ্ছে। দেশের বাজারে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত। নতুন কর্মসংস্থান নেই। যাদের চাকরি আছে তাদের চাকরি যাচ্ছে! গার্মেন্ট খাত, আর্থিক খাত এর উদাহরণ। এসবের পরিণতি কী?
পরিণতি একটিই, যার কথা বললে অনেকে আঁতকে উঠবেন। শেষ বিচারে এসবের বোঝা গিয়ে পড়বে ব্যাংকের ওপর। ব্যবসা ভালো হলে ব্যবসায়ীর লাভ, ব্যাংকেরও লাভ। ব্যবসা মন্দা হলে ব্যাংকের সর্বনাশ। এক পয়সাও ফেরত আসবে না। ব্যবসায়ীর কারখানা বন্ধ থাকলে ব্যাংকার টাকা ফেরত পান এমন উদাহরণ নেই। এ প্রেক্ষাপটে যখন দেখি বড় বড় করপোরেটের বেচাকেনা কমছে, রাজস্ব আয় কমছে, তাদের শেয়ারের দাম কমছে, তখন থমকে দাঁড়াতে হয়। নতুন ভাবনায় পড়ি খেলাপি ঋণ নিয়ে। এ ধরনের ঋণ কমার কথা। এজন্য শ্রেণীবিন্যাসের (ক্লাসিফিকেশন) নিয়মাবলি শিথিল করা হয়েছে। নামমাত্র টাকা দিয়ে এসব পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু এখন যদি ভালো কোম্পানি মন্দার শিকার হয়, তাহলে তো সমূহ বিপদ। সব পদক্ষেপ ভেস্তে যাবে। অতএব, অর্থমন্ত্রীকে এখনই সাবধান হতে হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের আর মাত্র চার মাস বাকি। এ বছরের পারফরম্যান্সের জন্য তাকে এখনই শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে নতুন খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করার ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর নেই।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










