বিশ্বের শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী দেশ এখন বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এর পেছনে কৃষক, সরকার ও ব্যক্তি খাতের বড় অবদান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পাট বীজের জন্য এখনো ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মৌসুমে পাট চাষের জন্য ৮১ শতাংশ বীজ আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হবে। পাটে সমৃদ্ধ একটি দেশের জন্য বিষয়টি দুঃখজনক। আমদানি করা বীজের মাধ্যমে কৃষকের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। শুধু তা-ই নয়, আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে বীজও পান না। এতে পাটের উৎপাদন বিঘ্নিত হয়। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উন্নতমানের অধিক উৎপাদনশীল পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিকল্প নেই। পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের মাধ্যমে সে সুযোগও তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। কৃষি মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
পাটের উৎপাদন বাড়াতে সবার আগে চাই উন্নত পাট বীজের নিশ্চয়তা। সেটি সরকার করতে পারেনি। বছরে আমাদের চাহিদা প্রায় ছয় হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার টন আমদানি করতে হয়। দেশে পাট বীজ উৎপাদনের মূল সমস্যা হলো অন্য ফসলের তুলনায় কম লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা চাষ করতে চান না। পাট বীজে কৃষকদের আগ্রহী করতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের জিনোম আবিষ্কার করেছে। সেই জিনোম ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল পাট বীজ রবি-১ জাত উদ্ভাবনও করেছে, যার ফলন নাকি ভারতের পাটজাতের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ ভাগ বেশি। কৃষক পর্যায়ে এটির চাষ বাড়াতে পারলে পাট বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব। কিন্তু এ জাত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণে কর্মকর্তারা সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেননি।
১৯৭৫ সাল থেকে এ দেশে পাট বীজের আমদানিনির্ভরতা শুরু হয় এবং ক্রমে বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে চোরাপথে হু হু করে এ দেশে ঢুকতে থাকে ভারতীয় নিম্নমানের পাটের বীজ। ক্রমে প্রতারণার শিকার হতে থাকেন এ দেশের পাটচাষীরা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ। পাকিস্তান আমলে এমনকি বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এ দেশের বীজ দিয়েই এখানকার সব জমিতে পাট চাষ সম্ভব হতো। সে সময় আমদানি ও চোরাপথে ভারত থেকে কোনো পাটের বীজ এখানে আসত না।
একসময় পাটের বীজ দেশের কৃষকরাই উৎপাদন করতেন। সাধারণত কৃষক পাট ক্ষেতের একাংশ পাট বীজ উৎপাদনের জন্য রাখতেন। এ পদ্ধতিতে বীজ সংগ্রহে সময় লাগে ১০-১১ মাস। এ সমস্যা সমাধানে বিজেআরআই নাবি পাট বীজ উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—মাত্র এ চার মাসে উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে সক্ষম হয়। কিন্তু এ সময়ে মাঠে বেশি দামের রবিশস্য চাষ না করে পাটচাষে আগ্রহী হন না কৃষক। ফলে চাহিদা বিবেচনায় তোষাপাট বীজ উৎপাদন বাড়েনি। এ কারণে বহু বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে পাট বীজ আমদানি করে চাহিদা মিটিয়েছে বাংলাদেশ। যদি কোনো কারণে পাট বীজ আমদানি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে সারা বছরের জন্য অর্থকরী এ ফসলের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
মানসম্মত পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে পাঁচ বছরের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত পাট বীজ উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। রোডম্যাপ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০২১ সাল থেকে। ধাপে ধাপে তা আগামী পাঁচ বছরে শতভাগ বাস্তবায়ন হবে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত পাট বীজের সংরক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং কৃষকদের সে পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাট বীজের জন্য পরনির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে স্বল্পাকারে কৃষক পর্যায়ে পাট বীজ উৎপাদন পদ্ধতি ও নাবি পাট বীজ উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো, রোডম্যাপ অনুযায়ী অগ্রগতি হচ্ছে না। ২০২৩ সালে এসেও চাহিদার ৮১ শতাংশ পাট বীজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রীও একাধিকবার পাট বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টার কথা বলেছেন এবং বারবার তাগাদাও দিয়েছেন। কিন্তু অগ্রগতি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও সক্ষমতার ঘাটতি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। মাঝে কিছু কর্মকর্তা বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন পাট বীজ সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা লাভের জন্য। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ বিশ্বে পাট উৎপাদনে এক নম্বর আর তারা পাট বীজের জন্য যাবেন বিদেশে। অর্থ অপচয় ও বিলাসী এমন প্রকল্প গ্রহণ না করে উন্নত পাট বীজ তৈরিতে গবেষণা জোরদার ও তা মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
পাট বীজের জন্য বিদেশনির্ভরতা পরিহার করা প্রয়োজন। এর আগে পেঁয়াজের বীজের জন্য ভারতনির্ভর ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দেশটি হঠাৎ করে বীজ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের চাষীরা বিপাকে পড়ে যান। বাংলাদেশ বর্তমানে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু পেঁয়াজের বীজ নয়, গরু ও পেঁয়াজে একসম ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। ফলে ভারত কোনো কারণে পণ্য রফতানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এমন প্রেক্ষাপট থেকে সরকার গরু ও পেঁয়াজ উৎপাদনে জোর দেয়। ফলে বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ ও গরু উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভারত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে রেখেছে। এতে দেশটিতে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য রফতানি মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত যদি কোনো কারণে বাংলাদেশকে পাট বীজ সরবরাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করে তবে বাংলাদেশে পাটের উৎপাদন ব্যাহত হবে। তাই পাট বীজে আমদানিনির্ভরতা এড়িয়ে স্বয়সম্পূর্ণতা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার সে সুযোগকে আরো সম্প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশের সরকারকে এখন অধিক উৎপাদনশীল ও জলবায়ুসহিষ্ণু উন্নতমানের পাটের জাত উদ্ভাবন এবং তার বীজ মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশীয় উৎপাদনশীল পাটের বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রণোদনা প্রদান করা প্রয়োজন। কৃষকরা বহুদিন ধরে ভারত থেকে আমদানি করা বীজের ওপর আস্থাশীল হয়ে উঠেছেন, এর সাফল্য পরীক্ষিত। ফলে কৃষকদের দেশীয় বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বীজের মান ও গুণ তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেশে পাটের চাহিদা মেটাতে হবে। পাটের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উন্নতমানের পাট বীজ সরবরাহ, চাষীদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়ে সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের চাহিদা মেটানোর পরই পাট রফতানির বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। পাটের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। এতে কৃষক, পাটকল মালিক, পাটপণ্য ক্রেতা, পাট ব্যবসায়ী সবাই উপকৃত হবেন।










