নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মার্কিন ইলেকট্রনিকস শিল্পকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্য গত বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে চিপস ও বিজ্ঞান আইন ২০২২-এ স্বাক্ষর করেছেন। আইনে বরাদ্দ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব ইলেকট্রনিকস চিপস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক গবেষণায় অর্থায়ন করা হবে, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং নতুন কিছু সেমিকন্ডাক্টর কারখানা তৈরি হবে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেসব সেমিকন্ডাক্টর চিপ ব্যবহার হয় যেমন কম্পিউটার, মোবাইল, গাড়ি শিল্প, বিভিন্ন ধরনের ওয়্যারলেস এবং সেন্সর নেটওয়ার্ক ইত্যাদি, সেসব চিপের শতকরা মাত্র ১২ ভাগ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়। এর বেশির ভাগ আসে পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে। এর মাঝে তাইওয়ান সিংহভাগ চিপ তৈরি করে। সাম্প্রতিককালে তাইওয়ান ইস্যুতে চীন-মার্কিন বৈরিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। যাতে যেকোনো সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফলে জটিল পরিস্থিতি দেখা দিলে বা অন্য কোনো কারণে চিপ সরবরাহ ব্যাঘাত হলে তা মোকাবেলা করা যায়। 

কী আছে এ আইনে?

চিপস অ্যাক্ট হলো ২৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহত্তর আইনের অংশ, যাকে চিপস এবং সায়েন্স অ্যাক্ট বলা হয়। এ আইনে মার্কিন সরকার আগামী পাঁচ বছরে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি এবং বাণিজ্য বিভাগের মাধ্যমে মৌলিক ও ফলিত গবেষণার জন্য অর্থায়ন করবে। এই প্রোগ্রামগুলো জ্বালানি ও শক্তি, মহাকাশ এবং প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশটি যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা মোকাবেলার জন্য প্রযুক্তি বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করবে। আইনপ্রণেতারা আশা করছেন এতে কয়েকটি প্রোগ্রামে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে এবং সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করা যাবে, মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনে নয়া বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষিত হবে। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে মৌলিক গবেষণা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম চাঙ্গা হওয়ার ফলে ইলেকট্রনিক চীপ শিল্পে মার্কিন আধিপত্য ফিরে আসবে।

চিপস আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতার শতকরা ৮৫ ভাগই আসে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থেকে। এতে বেসরকারি খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বেসরকারি খাতের এ অবদানের জন্য ফেডারেল সরকারের অংশীদারত্বমূলক আর্থিক নীতি একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে প্রযুক্তি খাতে বিশ্বব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ৬০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। নব্বইয়ের দশকেও যুক্তরাষ্ট্র তার চাহিদার শতকরা ৩৭ ভাগ চিপস নিজেরা উৎপাদন করত। এজন্য চিপস আইনের দ্বিতীয় প্রধান উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের নিম্নমুখী প্রবণতা রোধ করা। 

ডলারের হিসেবে এ আইন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গবেষণা এবং উন্নয়নবিষয়ক তহবিল। গবেষণা তহবিলের বিশাল অংকের প্রবৃদ্ধি ছাড়াও আইনটি দেশজুড়ে নতুন ২০টি প্রযুক্তি হাব তৈরি করবে। এই হাব যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তি উন্নয়নে সম্পৃক্ত করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং মার্কিনদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্প্রসারণ করবে। যে যে ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়া হবে তা হলো, সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির কারখানা নির্মাণ এবং সম্প্রসারণ, চিপ নির্মাণের জন্য সুযোগ-সুবিধা আধুনিকীকরণ, সংযোজন, চিপের পরীক্ষা করে মান যাচাই এবং গবেষণা ও উন্নয়ন।

প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন: 

চিপস অ্যান্ড সায়েন্স আইনে যতগুলো সেক্টরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য অর্থ আলাদা করে রাখা হয়েছে। চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্টের অধীনে এজন্য ‘‌যুক্তরাষ্ট্রের জনশক্তি এবং শিক্ষা তহবিল’ নামে আলাদা তহবিল করেছে। সম্মিলিতভাবে এ খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে চিপ উৎপাদকরা তাদের জনশক্তির দক্ষতার উন্নয়ন করতে পারবে, নতুন নিয়োগকৃতদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। এতে ইন্ডাস্ট্রিগুলোর দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ হবে। জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মৌলিক গবেষণায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হবে। একটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতে (যা স্টেম নামে পরিচিত, STEM) প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির জন্য এ বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে। এটি একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করবে।

ব্যয়ের আরো কিছু ক্ষেত্র:

এ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মার্কিন আইনপ্রণেতারা আর যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছেন তাহলো- একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রোটো-টাইপিং, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির গবেষণা থেকে উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নিয়োজিত কর্মশক্তি প্রশিক্ষণ, সেমিকন্ডাক্টর চিপ সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যক্রম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নিরাপত্তা, বিশ্বস্ত টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তির উন্নয়ন। উন্মুক্ত ডিজাইনের সফ্টওয়্যার-ভিত্তিক ওয়্যারলেস প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা, নয়া ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তি “লিপ-অ্যাহেডকে তহবিল প্রদান। এছাড়া কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণায় তহবিল প্রদান এবং ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের সমর্থন। পরমাণু, কোষ, পৃথিবীর সিস্টেম এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোধগম্যতা বাড়াতে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞানীদের দিয়ে সম্পাদিত মৌলিক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ প্রদানও এর লক্ষ্য।

আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের সুযোগ:

দেশ থেকে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য যান। এর পরই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাকি প্রযুক্তি ও প্রকৌশল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। যেহেতু এ আইনে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং এ-সংক্রান্ত গবেষণায় তাই ইলেকট্রনিকস এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) শিক্ষার্থীরা বেশি সংখ্যায় এখানে অগ্রাধিকার পাবেন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বর্তমানে ইইই বিষয়ে অধ্যয়নে আগ্রহীদের সংখ্যা অনেক কম। যদিও ইইই বিষয়ে দেশে এবং বিদেশে চাকরির অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে। 

যেহেতু এ আইনের মাধ্যমে শুধু সেমিকন্ডাক্টরেই বিপুল বিনিয়োগ করা হয়নি, আরো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, তাই সাধারণভাবে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের যেকোনো বিষয়ে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়াও কম্পিউটার সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবোটিকস, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, পরিসংখ্যান, মেকানিক্যাল, সিভিল, মেটালার্জি ইত্যাদি ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীদের জন্যও সমান সুযোগ থাকবে। মোটা দাগে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের যেকোনো বিষয়ের দক্ষ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ।

যদিও পুরো আইনটি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট এবং এর অনেকগুলো অংশে বিদেশীদের সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। তবু এর শিক্ষা, বিজ্ঞান, ও গবেষণার অংশ- যার বেশির ভাগ ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা সংস্থাগুলোকে দেয়া হবে, তাতে সারা বিশ্বের যেকোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্র্যাজুয়েটরা এজন্য কোমর বেঁধে নেমে যেতে পারে। 

কীভাবে এটা কাজে লাগানো যাবে

একাডেমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় বৃত্তিলাভের জন্য বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীরা যদি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে কোনো দক্ষ মেন্টর বা গাইডের তত্ত্বাবধানে কোনো গবেষণা প্রকল্পে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে, তাহলে তারা অন্য গ্র্যাজুয়েটদের থেকে ভর্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে। একটা বা দুটো গবেষণাকর্ম বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করতে পারলে নিশ্চিত সুযোগ করে নেয়া যাবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা, দলীয় কাজের অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধানে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) দক্ষতা, আবেগীয় দক্ষতা ইত্যাদি যোগ্যতাও তাদের ভর্তি এবং বৃত্তিলাভে সহায়ক হবে।

শেষ কথা

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার চিপ সরবরাহের ওপর এ নতুন চিপস এবং বিজ্ঞান আইনের প্রভাব বুঝতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। কারণ দেশজ উৎপাদন সুবিধাগুলো তৈরি এবং কাজ শুরু করার জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া যেকোনো উদ্ভাবন মৌলিক গবেষণা পর্যায় থেকে উৎপাদন এবং প্রযুক্তির মূলধারায় নিয়ে সাধারণের জন্য বিপণনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন হয়। কিন্তু যেহেতু এ আইন এরই মধ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর হয়েছে। সুতরাং এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ অবারিত হয়ে পড়েছে। আমরা আশাবাদী বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরাও এ সুযোগ গ্রহণে অন্য কোনো দেশ থেকে পিছিয়ে থাকবে না।


ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মোকাম্মেল: অধ্যাপক, সিএসই  মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট