পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইরান, ভারত, ইনকা, মায়ার মতো প্রাচীন চীনের সভ্যতা। ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর এক নতুন চীনের যাত্রা হয়। নানা রকম সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক পরাশক্তি। জিডিপির হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফসল নয়া চীন এখন পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে চীনের শক্তি-দুর্বলতা, সাফল্য-ব্যর্থতা ও ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে লিখেছেন আনু মুহাম্মদ

গত অধ্যায়েই বলেছি, চীনে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি বা ‘উল্লম্ফনের’ কর্মসূচি নিতে গিয়ে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, ব্যবস্থাপনার সমস্যা ছিল, কিছু এলাকায় খাদ্য ঘাটতির কারণে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও ছিল। মাও সে তুং নিজেও এ সময়ে বিভিন্ন রকম ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু এ সময়ে চীনে দুর্ভিক্ষ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে মনগড়া পরিসংখ্যান দিয়ে যেভাবে প্রচার চালানো হয় তাতে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। এসব প্রচারণা অনেক সময় এ পর্যন্ত যায় যে মাও সে তুং নিজেই এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিলেন! তিনি চেয়েছিলেন এভাবে মানুষ মরুক, তাহলে উন্নয়নের সুবিধা হবে!!

মাও সে তুংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা ও কুৎসার বড় ক্ষেত্র দুটি। এর মধ্যে একটি হলো Great Leap Forward বা উল্লম্ফন এবং আরেকটি হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বস্তুত মাও-উত্তর চীনে ১৯৭৮ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় প্লেনারি মিটিংয়ের পর থেকে মাওবিরোধী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তত্পরতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় আন্তর্জাতিক প্রচারণা।

উল্লম্ফন বা ১৯৫৮-৬২ সময়ে গৃহীত কর্মসূচির কারণে দুর্ভিক্ষ এবং তাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বহু লেখা, গবেষণা ও প্রচার আছে। বিশেষ করে ৮০ দশক থেকে এ বিষয়ে প্রচারণা আরো বৃদ্ধি পায়। চীনে মাও-পরবর্তী সরকারগুলোও তাতে যোগ দেয়। এসব প্রচারণায় দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। মৃতের সংখ্যা বিষয়ে বিভিন্ন গালগল্প ছাড়াও গবেষণার সূত্র উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সালে উত্তর আমেরিকার দুজন জনসংখ্যাতত্ত্ববিদের দুটি গবেষণা। পরে অমর্ত্য সেনের মাধ্যমে এটি অনেক বেশি প্রচার পায়। সেন এসব পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বও দাঁড় করান।

এসব গবেষণার পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন বছরে মৃত্যুহার তুলনা করা। এ তুলনামূলক গবেষণা শুরু হয় ১৯৮২ থেকে, তারপর তা পেছনের বছরগুলোতে যায়। চীনে ১৯৮২ সালের আদমশুমারিকালে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে তাদের ১৯৫০ দশক ও তার পরবর্তী সময়ে জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। এ জরিপ ফল থেকেই জানানো হয়, ১৯৫৩ ও ১৯৬৪ এ দুই শুমারি বর্ষের গণনার চেয়ে আরো বেশি জন্ম হয়েছিল।

১৯৫৩ সালের জরিপে আরো বড় নমুনা সংখ্যা থেকে জন্মহার পাওয়া গিয়েছিল হাজারে ৩৭ জন, তা উপেক্ষা করে ১৯৮২-এর জরিপ থেকে ৫০ দশকের জন্য জন্মহার হিসাব করা হয় হাজারে ৪৩-৪৪। এর ফলে ১৯৫৩ ও ১৯৬৪-এর মধ্যে অতিরিক্ত জন্ম দেখা যায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের।

তবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের মৃত্যুহার তুলনা করতে অস্বাভাবিকতা ঠিকই নজরে আসে। ১৯৫৮ সালে মৃত্যুহার ছিল ১২, ১৯৫৯ সালে তা বেড়ে হয় ১৪.৬, ১৯৬০ সালে তা অনেক বেড়ে হয় ২৫.৪ এবং পরের বছর তা আবার নেমে ১৪.২ এবং ১৯৬২ সালে তা আবার ১০-এ পৌঁছায়। ১৯৬০ সালে এ মৃত্যুহার অস্বাভাবিক, কোনো সন্দেহ নেই। তবে ভারতের প্রখ্যাত গবেষক উষা পাটনায়েক জানিয়েছেন, এ একই বছর ভারতে এ হার ছিল ২৪.৮, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন কেউ তোলেনি। উষা পাটনায়েক ১৯৮২ থেকে পেছনে গিয়ে স্মৃতিশক্তিনির্ভর উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত টানার বিরোধিতা করে কাণ্ডজ্ঞানের একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন এভাবে, ‘যখন ব্রিটেনের উপনিবেশ আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৬-৪৭ সালে দুর্ভিক্ষে ১০ লাখ মানুষ মারা গেলেন পুরো দুনিয়া তা জানত, যখন ১৯৪৩-৪৪ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়, তখনো এ খবর সবার জানা ছিল। কিন্তু চীনে দুর্ভিক্ষে তিন কোটি মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হয় অথচ তা সে সময়ে কেউ জানল না, এমনকি চীনে তখন অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিক, বিভিন্ন ব্যক্তি-সাংবাদিক-সংস্থা যারা চীনের দিকে সর্বক্ষণ নজর রাখত নানা ভুল-ত্রুটি ধরার জন্য তারা কেউ জানল না তা কী করে হয়? যারা এগুলো বলেন, তারা বেশ চালাক কিন্তু তারা আসলে নিজেদের নির্বোধ আকারেই হাজির করছেন।’

জোসেফ বেল এ বিষয়ে আরো অনুসন্ধান করেছেন। তিনি কয়েকটি গবেষণা-প্রচারণার উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয় উপেক্ষা করে যুক্তি ছাড়া শুধু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। পাশাপাশি তাদের গবেষণাতেই ধরা পড়েছে ১৯৪৯-১৯৭৫ সময়কালে কী দ্রুত হারে মৃত্যুহার কমেছে। ১৯৪৯ সালে যেখানে আয়ুসীমা ছিল ৩৫, সেখানে ১৯৭৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৬৫। চীনা ইতিহাস বিশেষজ্ঞ কার্ল রিসকিন বলেছেন, ‘চীনে সেসময় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সেটা ব্যাপক আকার নিতে পারেনি। চীনের বিপ্লব-পূর্ব কালের সঙ্গেও তার তুলনা করা যায না।’ জোসেফ বেল বহু উদ্ধৃত দ্য চায়না কোয়ার্টারলি-র কথা উল্লেখ করেছেন, যার প্রকাশনায় সিআইএ অর্থ জোগান দিত বলে সম্পাদকও এক পর্যায়ে স্বীকার করেছেন।

দংপিং হান ৫০ দশকের শেষ দিক থেকে গ্রামাঞ্চলে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভূমি সংস্কারের মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলের শতকরা ৬০ ভাগ গরিব ভূমিহীন মানুষ জমি, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং অধিকার পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় উল্লম্ফনকালে অলস ও ঢিলা মৌসুমকে উদ্যোগ, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি দিয়ে ব্যস্ত ও কর্মচঞ্চল মৌসুমে পরিণত করা হয়েছে। ১৯৫৮, ৫৯ ও ৬০ সালে গ্রামের মানুষ বহু রকম কাজে যুক্ত হয়েছেন, জলাধার, পানির কূপ, নদী ও খালখনন, সেচনালা তৈরি ইত্যাদি। এগুলো জাতীয় পর্যায় থেকে একেবারে গ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছিল।’

অধিক আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বেইজিংয়ে সিসাংলিং জলাধার, উত্তর চীনের প্রধান পাঁচটি নদী সংযুক্ত করতে হাই নদী প্রকল্প, হুনানে ইয়েলো রিভার স্যানমেনজিয়া প্রজেক্ট, লিন কাউন্টিতে রেড ফ্ল্যাগ ইরিগেশন চ্যানেলসহ অনেক প্রকল্প। বহু অঞ্চলে ছোট-বড় জলাধার নির্মাণ এবং সেচব্যবস্থার তত্পরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে এটা ঠিক, এতসব নির্মাণযজ্ঞে ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা ছিল, সমন্বয়ের সমস্যা ছিল।

পিকিং (বেইজিং)-মস্কো বিরোধ শুরু

যখন চীন একদিকে দ্রুতগতিতে উন্নয়নের পথ খুঁজছে, অন্যদিকে ভেতর-বাইরে মতাদর্শিক লড়াই চালাচ্ছে, সর্বোপরি যখন প্রতি মুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্ঘাত ও আক্রমণের আশঙ্কা বাড়ছে, তখনই চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে ফাটল ধরে। প্রথমদিকে মতাদর্শিক বিতর্কের মধ্যে বিরোধ সীমাবদ্ধ থাকলেও ৬০ দশকের মাঝামাঝি দুদেশের সম্পর্ক বৈরী পর্যায়ে চলে যায়। দেশে দেশে তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনকেই বিপর্যয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করে।

বিরোধের শুরু ৫০ দশকের শেষ থেকে। সোভিয়েত পার্টির নেতৃত্বে মতাদর্শিক পরিবর্তন থেকেই এর সূত্রপাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠনের শেষ পর্যায়ে, ১৯৫৩ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা জোসেফ স্ট্যালিন মৃত্যুবরণ করেন। ৫ মার্চ তাঁর মৃত্যুর পর পরই পার্টিতে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এ দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিজয়ী হন এক পর্যায়ে স্ট্যালিনের সবচেয়ে বড় তোয়াজকারী হিসেবে পরিচিত ক্রুশ্চভ। এ সময়ের ঘটনাবলির একটি চিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মার্ক্সের গ্রুন্ডিসি অনুবাদক ও গবেষক মার্টিন নিকোলাসের গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়।

সেই সময়ের ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে মার্টিন নিকোলাস লিখেছেন,

‘৬ মার্চ সকাল হওয়ার আগেই এল বেরিয়ার নেতৃত্বাধীন প্যারামিলিটারি স্টেট সিকিউরিটি পুলিশ মস্কোর আর্মি ইউনিটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বেরিয়ার অনুসারীরা মস্কো ও ক্রেমলিনের ওপর সর্বাত্ম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। একই রাতে স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত সচিব জেনারেল পস্ক্রেবিশেভ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। তিনিই পার্টির পরবর্তী নেতৃত্ব বিষয়ে স্ট্যালিনের মতামত সম্পর্কে অবগত ছিলেন।... দিন শেষ হওয়ার আগেই পার্টি সেক্রেটারিয়েটের ১০ জন সদস্যের  পাঁচজন এবং কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত প্রেসিডিয়ামের ৩৬ জন সদস্য এবং প্রার্থীদের ২২ জনকে পদচ্যুত করা হয়। ৫২টি সরকারি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ২৭টি বাতিল করা হয়। প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন বেরিয়া নিজে, সর্বোচ্চ পদে অর্থাৎ প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োজিত হন জিএম মেলানকভ। এর পরই ছিলেন ক্রুশ্চভ। মার্শাল জি ঝুকভকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়।... ঘটনাবলির ধাপগুলো হচ্ছে বেরিয়া পুচ (১৯৫৩), ক্রুশ্চভ ও মেলানকভ (১৯৫৩-৫৫), ২০তম কংগ্রেস, ১৯৫৬ এবং ক্রুশ্চভ-ঝুকভ নেতৃত্বাধীন ক্যু, ১৯৫৭।

অর্থাৎ ক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে খুব গোছানো, সহিংস, দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম ছিল।

১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত ২০তম কংগ্রেস ছিল সোভিয়েত পার্টির মতাদর্শিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টার আনুষ্ঠানিক পর্ব। এর আগপর্যন্ত ক্রুশ্চভ নিজেও স্ট্যালিন ও তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। ক্রুশ্চভপন্থীদের অবস্থান কিছুটা সংহত করার পর ২০তম কংগ্রেসে শুরু হয় স্ট্যালিনবিরোধী কুৎসা, অপপ্রচার এবং সেই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক মতাদর্শিক পরিবর্তন। তবে স্ট্যালিনবিরোধী কুৎসায় পার্টির মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলে ক্রুশ্চভ বাধ্য হয়ে এক পর্যায়ে এসব বক্তব্য থেকে সরে আসেন। ১৯৫৭ সালে পার্টি তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। কিন্তু মার্শাল ঝুকভের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর সমর্থনে ক্রুশ্চভ ক্ষমতায় টিকে যান। ক্রুশ্চভ বিরোধীদেরই বরং আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়।

১৯৫৭ সালে মস্কোতে সারা বিশ্বের ৮১টি পার্টির সম্মেলনে যে ঘোষণা গৃহীত হয়, তাতে চীনের সম্মতি ছিল। ১৯৬০ সালে প্রচারিত এক যুক্ত বিবৃতিও তৈরি হয় পিকিং ও মস্কোসহ সবার সম্মতিক্রমেই। কিন্তু এরপর থেকে চীনের বক্তব্য অনুসারে, সোভিয়েত পার্টি এ ঘোষণা ও বিবৃতিকে অমান্য করে সংশোধনবাদী পথে যাত্রা শুরু করে। চীনা পার্টির দৃষ্টিতে সোভিয়েত পার্টি দেশের ভেতর নব্য বুর্জোয়ার পথ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’, ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা’ এবং বুর্জোয়াদের সঙ্গে নিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ’ নীতিমালার মধ্য দিয়ে বিপ্লববিরোধী অবস্থানে অধপতিত হয়। মতাদর্শিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক প্রথমে দুই পার্টির মধ্যে চিঠি ও প্রতিনিধি বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্রমেই দূরত্ব বাড়তে থাকায় তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই চীনের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সোভিয়েত সমর্থন ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত সমর্থন এবং বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞদের আন্তরিক ও মূল্যবান অবস্থান চীনের অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছিল তখন। কিন্তু বিতর্কের এক পর্যায়ে সোভিয়েত সরকার এসব সমর্থন প্রত্যাহার করায় বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে।

১৯৬৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চীনের ‘পিপলস ডেইলি’ ও ‘রেড ফ্ল্যাশ’ পত্রিকায় পার্টির অবস্থানের ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়,

‘আমরা নিজেদের প্রশ্ন করেছি: আমাদের কি সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিএসইউ) নেতৃত্বকে অনুসরণ করা এবং তাদের কাজের সঙ্গে নিজেদের ইচ্ছাকে সংগতিপূর্ণ করে তোলা উচিত? সেক্ষেত্রে সিপিএসইউ নেতৃত্ব অবশ্যই আনন্দিত হতেন, কিন্তু আমরাই সংশোধনবাদী হয়ে পড়তাম। আমরা নিজেদের এ প্রশ্নও করেছি: আমাদের পক্ষে কি সিপিএসইউ নেতৃত্বের ভুলগুলো সম্পর্কে নীরব থাকাই উচিত কাজ হবে? আমরা বিশ্বাস করেছি, সিপিএসইউ নেতৃত্বের ভুলগুলো আকস্মিক, ব্যক্তিগত বা সামান্য ভুলমাত্র নয়। বরং সেগুলো সবই নীতিগত ভুল, যা সমগ্র সমাজতান্ত্রিক শিবির ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকেই বিপদের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম অংশ হিসেবে কীভাবে আমরা এ ভুলগুলো সম্পর্কে নির্লিপ্ত ও নীরব থাকি? তা করলে আমরা কি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও সর্বহারা আন্তর্জাতিকতা রক্ষার কর্তব্য থেকেই বিচ্যুত হতাম না?’

 

আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়