পেঁয়াজের দাম দিলাম, কিন্তু তা উৎপাদক বা কৃষক পেলেন না। যদি তারা পেতেন, তাহলে একটা শান্তি পেতাম—যাক, অন্তত যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত কৃষকরা তা পেয়েছেন। না, তা হওয়ার নয়। এ মুহূর্তেও নয়। এখন পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ। সারা দেশের কৃষকরা তাদের কষ্টের আমন ধান ঘরে তুলছেন। মহা আনন্দ, ধুমধাম অবস্থা হওয়ার কথা। ঘরে ঘরে পিঠা-পুলি হবে। নতুন চালের ভাত হবে, মেলা-উৎসব হবে। পৌষ মাসে এটাই হয়। না, এবারো তা হওয়ার নয়। ধানের দাম নেই। বরাবরের ঘটনা। ঘোষণা করা হয়েছিল সরকার এবার চলতি মৌসুমে ছয় লাখ টন ধান কিনবে। কিনবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে। কেজি ২৬ টাকা। ধান বাদে সরকার চালও কিনবে। ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল কিনবে মিল মালিক বা চাতাল মালিকদের কাছ থেকে। ৫০ হাজার টন চাল কেনা হবে ৩৫ টাকা কেজি দরে। এটা আতব চাল, যার চাহিদা বাংলাদেশের সব অঞ্চলে সমান নয়। দেখা যাচ্ছে, সরকারের পরিকল্পনা সাড়ে নয় লাখ টন খাদ্য সংগ্রহের। কিন্তু ঘোষণা পর্যন্তই। এখন পর্যন্ত বাজারে সরকারের দেখা নেই। কবে সরকার নামবে? ধান সব মিল মালিকদের হাতে চলে যাওয়ার, মজুদদারদের হাতে চলে যাওয়ার পর? সরকারের কি সংগ্রহের জন্য অর্থায়নের অভাব ঘটেছে? অবকাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে? ইত্যাদি প্রশ্ন বরাবরের মতো। কত সরকার এল, কত সরকার গেল, কৃষকের এ সমস্যার সমাধান আর হলো না। তারা ফসল ফলালে শাস্তি, বাম্পার ফলনে বাম্পার শাস্তি।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কৃষক থানা (উপজেলা) বাজারে গেছেন পাট বিক্রি করতে। পাটের ক্রেতা নেই। পাটের দাম নেই। মহাজনের গদিতে পাট রেখে বাড়ি যাবেন, তাও হচ্ছে না। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর কত আন্দোলন। পাটের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। পাটের নিম্নতম মূল্য ঠিক করতে হবে। সরকারকে পাট কিনতে হবে। বড় বড় আন্দোলন। আমরা এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। মনে করেছি, পাটের ন্যায্য দাম ‘বর্তমান পাকিস্তানিরা’ দেয়নি। তারাই ছিল সরকার, তারাই ছিল পাটকলের মালিক। শুধু পাট নয়, গ্রামের বাজারে কৃষককে মুলা, টমেটো, বেগুন ইত্যাদি রাস্তায় ফেলে দিতে দেখেছি। অবিক্রীত কৃষিপণ্য মাথায় করে, গরুর গাড়ি করে আবার বাড়ি নিয়ে যাওয়া। এ এক বিড়ম্বনা। অসহ্য বেদনা। ‘নগদের’ দারুণ অভাব। শিল্পপণ্য কেনার টাকা নেই কৃষকের। দেনা শোধের ব্যবস্থা নেই। ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন পরিশোধ, শীতবস্ত্র ক্রয় থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ বন্ধ। ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হলে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারলে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাঙালির হাতে এলে, অবকাঠামোর উন্নতি হলে, কৃষকের ছেলেরা প্রশাসনে এলে এসব সমস্যা আর থাকবে না। স্বাধীনতার ৪৮-৪৯ বছর পরও দেখতে পাচ্ছি একই সমস্যা। অথচ এখন সবকিছু বাঙালির হাতে। প্রশাসন চালায় কৃষকের ছেলেমেয়েরা। অবকাঠামোর উন্নতি অবিশ্বাস্য। সারা দেশে এখন রাস্তাঘাট মাকড়সার জালের মতো। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সোয়া ৮ শতাংশ। সামাজিক সূচকে প্রভূত উন্নতি। গড়ের হিসাবে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯১০ ডলার। তাহলে কৃষক কেন তার ফসলের দাম পাবেন না? শুধু ধান নয়, অন্য শাকসবজিরও কোনো দাম নেই।
গত সপ্তাহের ঘটনা। মানিকগঞ্জ গিয়েছিলাম আত্মীয় গোপালদের বাড়ি










