বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী একজন নেতা ছিলেন, যার করণে তিনি লিগাল ফ্রেম ওয়ার্কের (এলএফও) মতো অগণতান্ত্রিক বিধিনিষেধের অধীনেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। যদিও তার দলীয় অনেক নেতাই এলএফওর অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু সব আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু ও তার দল পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সাথে সাথে তিনি পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করতে সমর্থ হন। স্বাভাবিক কারণেই তিনি সরকার গঠন করবেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন সেটাই ছিল স্বাভাবিক। শেখ মুজিব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরি করবেন।
এসব ধারাবাহিকতায় ভুট্টো শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার যে উচ্চাভিলাষ ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার তা ধূসর হয়ে যায়। আর তখন তিনি কূটকৗৈশলের আশ্রয় গ্রহণ করেন। পাঞ্জাব ছাড়া পাকিস্তানের অন্য প্রদেশগুলোতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর তেমন কোনো সমর্থন ছিল না। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশ ছিল অবহেলিত। তাদের মধ্যে যথেষ্ট অসন্তোষ বিরাজমান ছিল। ওইসব অবহেলিত প্রদেশে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা সমাদৃত ছিল। ছয় দফা ছিল সব মেহনতি মানুষের মুক্তির চাবিকাঠি, শুধু বাঙালির না। এ কারণে বঙ্গবন্ধু সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ছয় দফার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপসে প্রস্তুত ছিলেন না। আর ভুট্টো শঙ্কিত ছিলেন ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচিত হলে (১) সামরিক বাহিনী চিরতরে কর্তৃত্ব হারাবে, (২) ভুট্টো নিজে কখনো পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারবেন না। (৩) আর পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের ওপর থেকেও কেন্দ্র একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
তখন ভুট্টো কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। যদিও ভুট্টো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত ছিলেন, একজন প্রতিশ্রুতিশীল আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু সুশিক্ষিত মানুষের মতো আচরণ তিনি করেননি। তার নিজের জনগণের সঙ্গেও না, আর বাঙালি জনগণের সঙ্গে তো কখনই না। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু আন্দোলন করেছেন সব নিপীড়িত মানুষের জন্যে। ১৯৭৩-এর সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ তার এ বিখ্যাত উক্তির মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় তিনি কত বড় মাপের নেতা ছিলেন। তিনি মানবিক ও কূটনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনদরদি একজন নেতা ছিলেন। আর এভাবেই তিনি বিশ্বজনমতকে একচ্ছত্রভাবে তার পক্ষে নিয়ে আসেন। আর পর্যায়ক্রমে বাঙালির নেতা থেকে বিশ্বনেতায় পরিণত হন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক রাজনৈতিক সহকর্মী হাজি গোলাম মোর্শেদ আমার সাথে এবং বিডিনিউজের সাথে সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কখনো কারো সম্পর্কে কটু মন্তব্য না করলেও পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘খুব চালাক’ মনে করতেন।’ এ কথা খুবই সত্য ভুট্টো রাজনীতিতে সবসময় চালাকি আর কূটকৗৈশলের আশ্রয় নিয়েছেন। ভুট্টোর পুঁজি ছিল রাজনীতিতে বাঁকা পথ ও শঠতা। পক্ষান্তরে শেখ মুজিবের পুঁজি ছিল সততা ও সোজা পথ। তিনি বাঁকা পথের আশ্রয় নেননি কখনো, যার কারণে জনগণ সর্বদা তার পাশে থেকেছে। জনগণ মুজিবের নীতি আদর্শের জন্য রক্ত দিতে কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ভুট্টো পাকিস্তান পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছে।
ভুট্টোর লেখা ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’ বইটি করাচি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সে সময় চূড়ান্ত পর্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, এ ভয় পাকিস্তানিদের মনে জায়গা করে নিচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নেতা সে সময় প্রকাশ্যেই দেশের পূর্বাংশে প্রলয়কাণ্ডের জন্য ভুট্টোকে দোষারোপ করছে। পূর্ব পাকিস্তানের এ রাজনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয়ের জন্য ভুট্টো নিজে আদৌ দায়ী নন, সব দোষ শেখ মুজিবের, এ কথাই ভুট্টো ইনিয়েবিনিয়ে বলেছেন দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি বইটিতে। ভুট্টো কখনই নিজের ভুলটি স্বীকার করে সেটি শুধরে নেয়ার চেষ্টা করেননি।
তবে তার গ্রন্থে একটা কথা স্বীকার করেছেন, ‘নির্বাচনে জয়লাভের পর বঙ্গবন্ধু ছয় দফা প্রশ্নে কোনো রকম আপসে আগ্রহী ছিলেন না। তাতে পাকিস্তান বিভক্ত হলেও তার কোনো আপত্তি ছিল না।’ এটাই ছিল বাস্তবতা যে বঙ্গবন্ধু অনেক আগে থেকেই স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, তা রক্তের বিনিময়ে হলেও।
দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি গ্রন্থে ভুট্টো লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে দুই পাকিস্তান মিলে এক ফেডারেশনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন।’ ভুট্টোর এ কথা সত্য না, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বিভিন্ন লেখায়। তোফায়েল আহমেদ এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘ভুট্টো নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা ঘৃণাভরে নাকচ করে দেন।’
জুলফিকার আলী ভুট্টো ২২ ডিসেম্বর মিঁয়াওয়ালী জেলের প্রিজন গভর্নর হাবিব আলীকে জরুরি বার্তা প্রেরণ করে যে ‘শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক।’
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী এর সত্যতা পাওয়া যায়। তারা লিখেছিল, ‘রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান, ২২ ডিসেম্বর (রয়টার্স), পূর্ব পাকিস্তানি স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে আজ পশ্চিম পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।’ জেল থেকে স্থানান্তরের পর ২৬ ডিসেম্বর ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথমবার দেখা করেন। তখন তিনি (বঙ্গবন্ধু) সিহালার পুলিশ রেস্ট হাউজে গৃহবন্দি ছিলেন। সেখানেই জুলফিকার আলী ভুট্টো তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এ সাক্ষাতের একটি বিবরণ আছে স্টানলি ওয়ালপার্টের ‘জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্তান’ (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩) গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘বিস্মিত বঙ্গবন্ধুকে ভুট্টো মিনতি করে বলেন, “মুজিব ভাই, আমরা সবাই মিলেমিশে থাকব, তেমন কোনো সম্ভাবনাই কি আর নেই? দেশ এক না হোক, কনফেডারেশন-জাতীয় একটা ব্যবস্থা করা যায় না?” জবাবে বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেছিলেন, তাকে আগে স্বদেশে ফিরতে হবে, সবার সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
ভুট্টো ফালাচিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে কুিসত ভাষায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আক্রমণ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এই মহিলার সঙ্গে করমর্দন করতেও তার গা রি রি করে ওঠে।’ সে সময় ভারতে আটক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য তিনি জোর তদবির চালাচ্ছেন, সিমলায় ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। তার নিজের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ভর করছে এই শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলের ওপর। ফালাচির সঙ্গে ভুট্টোর সাক্ষাত্কারটি প্রকাশিত হলে ভারতে এ নিয়ে মহা হইচই দেখা দেয়, তাদের শীর্ষ বৈঠক ভণ্ডুল হওয়ার জোগাড়। ভীতসন্ত্রস্ত ভুট্টো তার এক প্রতিনিধিকে ফালাচির কাছে পাঠান আজব এক অনুরোধ নিয়ে। তার আবদার, ফালাচি ভুট্টোর যে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন, তা সত্য নয়, পুরো ব্যাপারটাই তার, অর্থাত্ ফালাচির কল্পনার ফসল, ফালাচিকে এ কথা বিবৃতি দিয়ে জানাতে হবে। তবে ফালাচি ভুট্টোর সে প্রস্তাবে রাজি হননি।’
একটা গল্প চালু আছে যে ২৬ ডিসেম্বর ভুট্টো যখন দেখা করতে আসেন তখন ভুট্টোকে দেখেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কি, আপনিও কি বন্দি।’ ভুট্টো বলে ওঠেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট।’ বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বললেন, ‘আপনি কী করে প্রেসিডেন্ট হলেন? আমি তো আপনার চেয়ে দুই গুণ বেশি ভোট পেয়েছি?’ ভুট্টো হেসে বললেন, ‘তাহলে আপনি প্রেসিডেন্ট হয়ে যান।’
ওপরের এ গল্পের সত্যতা আমি জানি না, এ ধরনের কোনো কথা সেদিন হয়েছিল কিনা। তবে বঙ্গবন্ধু যে জেলে ছিলেন সেই জেলের প্রিজন গভর্নর হাবীব আলী যা বলেছেন তা কিছুটা অন্য রকম। তিনি বলেছেন, ‘ভুট্টো যখন আসেন তখন এক কর্নেল এসে মুজিবকে বলছিলেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসবেন। তারপর সেখানে ভুট্টো এলেন এবং মুজিবকে সালাম দিয়ে বললেন যে এখন আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক।’ তার পরই শেখ মুজিবের প্রশ্ন ছিল, ‘ভুট্টো, আমাকে প্রথমে বলেন, আমি কি একজন বন্দি অথবা মুক্ত মানুষ।’ তখন ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন, আপনি একজন বন্দিও না, আবার মুক্ত মানুষও না।’ তখন শেখ মুজিব বললেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি আপনরি সাথে কোনো কথা বলব না।’ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন যে ‘আপনি একজন মুক্ত মানুষ।’ এরপর শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তারপর তিনি অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায় ইত্যাদি। কিন্তু শেখ মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।’ এরপর শেখ মুজিবকে একটা যৌথ ইশতেহার দেয়া হয়েছিল স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করলেন।’ (অনেকটা একই রকম বর্ণনা পাওয়া যাবে রবার্ট পেইনের The Tortured and Damned গ্রন্থে। তবে তিনি এ কথা লেখেননি যে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ‘আপনি একজন মুক্ত মানুষ।’
জুলফিকার আলী জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন বিধায় অত্যন্ত দাম্ভিক ছিলেন। নিজেকে উঁচু দরের রাজনীতিক মনে করলেও বঙ্গবন্ধুর সামনে তার ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির কারণে উচ্চবাচ্য করতেন না। এটাই ছিল বাস্তবতা। যেমন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে পরাস্ত হয়ে ভুট্টো বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ‘আপনি একজন মুক্ত মানুষ।’ তা না হলে বঙ্গবন্ধু তার সাথে কথা বলতেন না।
ভুট্টো ছিলেন একজন মদ্যপ, অনেক সময় তাকে মাতাল হিসেবে দেখা গেছে। আর বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭৩ সালের ৫-৯ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্র আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে চতুর্থ জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন, তখন আলজিয়ার্সের একমাত্র ইংরেজি পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী মুজিব সম্পর্কে প্রায় এক পৃষ্ঠাব্যাপী বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘The leader without beard; neither visits any night club nor touched drinks in Life.’ (একজন শ্মশ্রুবিহীন নেতা, যিনি কখনো নৈশ ক্লাবে যাননি এমনকি জীবনে কখনো মদ স্পর্শ করেননি।)
আলজিয়ার্স নগরীর উপকণ্ঠে এক বিশাল কনফারেন্স হলে নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই মোট ৯২টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসনিক প্রধানরা এসে পৌঁছেছিলেন। বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়াও এদের মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো; সৌদি আরবের বাদশা ফয়সাল, মরক্কোর বাদশা হাসান, ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদ, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হাবিবরগুইবা, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি, পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্ত, কাপুচিয়ার প্রিন্স রাদম সিহানুক, নাইজেরিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা, উগান্ডার ইদি আমিন, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অন্যতম। উল্লেখ্য, পাকিস্তান জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের সদস্য নয় এবং তাদের সদস্য লাভের বারবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সম্মেলনের শুরুতেই বিভিন্ন দেশের নেতাদের পরিচয় করিয়ে দেন সম্মেলনের সভাপতি ও আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিন। একজন করে নেতা মঞ্চে এসে দাঁড়ানোর পর প্রেসিডেন্ট বুমেদিন ক্ষুদ্র বক্তৃতায় তাদের পরিচয় প্রদান করেন। সঙ্গে সঙ্গে হলে উপস্থিত সব প্রতিনিধি করতালির মধ্য দিয়ে জানিয়েছেন উষ্ণ অভিনন্দন। পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাতের পরিচিতির সময় করতালি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচিতির পর সম্মেলন কক্ষে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাঙালি পোশাকে শ্বেতশুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোট পরিহিত প্রায় ছয় ফুটের এক হিমাচল সদৃশ ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিব। মুখে শিশুর সরল হাসি। সম্মেলন কক্ষের প্রতিটি মানুষ আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে চলেছিলেন, সে করতালি যেন আর থামার নয়। এভাবেই সেদিন বিশ্বনেতারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে জানালেন হূদয়ের প্রাণঢালা সংবর্ধনা। তিন মিনিটের বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে করতালির পর প্রেসিডেন্ট বুমেদিনের ইশারায় সবাই আবার আসন গ্রহণ করেছিলেন।
নিচে বঙ্গবন্ধু ও ডেভিড ফ্রস্টের সেই বিখ্যাত সাক্ষাত্কারের সংগ্রামের নোটবুক অনূদিত বিশেষ অংশ উদ্ধৃত হলো:
ফ্রস্ট: মি. ভুট্টো সম্পর্কে আপনি এখন কী ভাবেন? আপনি কি ভাবেন যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কখনো স্বাধীন ঢাকা সফর করবেন? তিনি কি কখনো এখানে কথা বলতে আসবেন?
শেখ মুজিব: আমি জানি না। কিন্তু তিনি প্রথমে এখন এ বাস্তবতাকে স্বীকার করুন যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। তার এটাও জানা উচিত যে বাংলা তার ভূখণ্ড এ চিত্কার করে লাভ নেই। বাংলা তা নয়। কারণ কোনো কেজো উদ্দেশ্যে তারা যদি একক পাকিস্তান দাবি করে, তখনো আপনি জানেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমার রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার দাবি করতে পারতাম, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান হতো আমার ভূখণ্ড। তারা যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাহলে আমি দাবি করতে পারি যে আমার দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমি একটি সভা ডেকে গোটা দেশকে বাংলাদেশ ঘোষণা করতে পারি এবং তাদের বলতে পারি যে পশ্চিম পাকিস্তান আমার ভূখণ্ড। আপনি, ভুট্টো বেরিয়ে যান, আমি গভর্নর নিয়োগ করছি। এটা আমার ভূখণ্ড, আপনি বিদায় নিন, অন্যথায় আমি মিত্রবাহিনীসহ আমার সেনাবাহিনী পাঠাব পশ্চিম পাকিস্তান দখল করার জন্য। এসব ঝামেলা আমি চাই না। ভূখণ্ডের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার নেই। পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে মি. ভুট্টো সুখী থাকুন। বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে আমি সুখী থাকতে চাই এবং বাংলাদেশ এখন একটি সার্বভৌম স্বাধীন দেশ।
১৯৭৪ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে ওআইসি সম্মেলনে যোগদানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা অনুরোধ করেন, তখন তিনি তা নাকচ করে দেন। তিনি জানিয়ে দেন, যতক্ষণ পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেবে ততক্ষণ তিনি সেখানে সম্মেলনে যোগ দিতে যাবেন না। তখন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর ওআইসিভুক্ত দেশগুলো থেকেও প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর কয়েকজন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে তাদের প্লেনে করেই লাহোর নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুকে লাহোর বিমানবন্দরে যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হয়, মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৪-এর ২২-২৪ ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনটি বাংলাদেশের জন্য খুব তাত্পর্যপূর্ণ ছিল।
এভাবেই ভুট্টো একের পর এক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ব্যক্তিত্বে, কৌশলে, উপস্থিত বুদ্ধিতে, নীতি আদর্শে পরাস্ত হয়েছেন। ভুট্টোর মতো দুর্ভাগা নেতা বিশ্বে খুব কম আছেন। তাকে তার দেশে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সামরিক জান্তা হত্যা করেছে। জনগণ তার একটা প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সামরিক জান্তা বা কেউ বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়ার ক্ষমতা রাখত না। তাই তাকে চোরাগোপ্তা হামলা করে হত্যা করেছিল। খুনিদের একজন রশিদ এন্থনি মাসকারেনহাসের সাথে সাক্ষাত্কারে তো বলেছেনই যে ‘বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখলে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। অতএব সেই কারণেই তারা তাকে হত্যা করেছেন।’
লেখক: বঙ্গবন্ধু গবেষক; তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক
অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন ও জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন










