কভিড-১৯-এর
কয়েকটি নতুন
ধরন সৃষ্ট
বিপত্তি সত্ত্বেও
বিশ্বের বেশির
ভাগ দেশের
অর্থনীতি ও
বাজারের জন্য
২০২১ সাল
তুলনামূলকভাবে একটা
ইতিবাচক বছর
হিসেবে অতিবাহিত
হয়েছে। ২০২০
সালে ভয়াবহ
মন্দার পরও
বিদায়ী বছরে
সম্ভাবনার চেয়ে
বেশি প্রবৃদ্ধি
হয়েছে এবং
জোরালোভাবে বাজারগুলো
ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এটা বিশেষ
করে যুক্তরাষ্ট্রের
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য,
যেখানে পুঁজিবাজার
নতুন উচ্চতায়
উন্নীত হয়েছে।
এটা আংশিকভাবে
সম্ভব হয়েছে
মার্কিন ফেডারেল
রিজার্ভের অতি
শিথিল মুদ্রানীতির
কারণে (যদিও
অন্য উন্নত
দেশের কেন্দ্রীয়
ব্যাংকগুলো মূলত
সম্প্রসারণমূলক নীতি
গ্রহণ করেছে)।
তবে ২০২২
সালটা মনে
হয় আরেকটু
কঠিন হবে।
অতিমারী এখনো
শেষ হয়নি।
এর মধ্যে
ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব
শুরু হয়েছে
সর্বত্র। আগের
ধরনগুলোর চেয়ে
ওমিক্রন ততটা
বিপর্যয়কর না-ও
হতে পারে,
বিশেষ করে
টিকাদানে এগিয়ে
থাকা উন্নত
দেশগুলোর জন্য;
কিন্তু এটি
আরো বেশি
সংক্রামক, যার
মানে হলো
হাসপাতালে রোগীর
চাপ এবং
মৃত্যু বেশি
হবে। ওমিক্রন-সৃষ্ট
অনিশ্চয়তা-ঝুঁকি
চাহিদা দমন
করবে এবং
সরবরাহ ব্যবস্থার
প্রতিবন্ধকতাগুলো আরো
তীব্রতর করবে।
বাড়তি সঞ্চয়,
দমিত চাহিদা,
শিথিল মুদ্রানীতি
ও রাজস্ব
নীতির সঙ্গে
বিরাজমান প্রতিবন্ধকতাগুলো
২০২১ সালে
মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।
অনেক কেন্দ্রীয়
ব্যাংকারই জোরগলায়
বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতির
ঊর্ধ্বমুখিতা হবে
সাময়িক। তারা
এখন স্বীকার
করছেন, এ
স্ফীতি আগামীতেও
বজায় থাকবে।
জরুরি পদক্ষেপে
মাত্রাগত পার্থক্য
থাকলেও তারা
এখন মাত্রিক
উপশমের (কোয়ান্টিটেটিভ
ইজিং) মতো
অগতানুগতিক মুদ্রানীতিগুলো
ধীরে ধীরে
অবসায়নের পরিকল্পনা
করছেন, সুদহার
যাতে কিছুটা
স্বাভাবিক করা
যায়।
এখানে বলে
রাখা ভালো,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর
দৃঢ়তা এবার
পরীক্ষিত হবে
যদি নীতি-হার
(পলিসি-রেট)
বৃদ্ধি বন্ড,
ঋণ ও
পুঁজিবাজারে অভিঘাতের
সৃষ্টি করে।
ব্যক্তি ও
সরকারি ঋণের
বড় স্ফীতির
কারণে বাজারগুলো
উচ্চ ঋণব্যয়ের
(বরোয়িং কস্ট)
চাপ সামলাতে
পারবে না।
যদি এক্ষেত্রে
আরো অনিয়ন্ত্রিত
উল্লম্ফন ঘটে
তাহলে কেন্দ্রীয়
ব্যাংকগুলো নিজেদের
একটি ঋণ
ফাঁদের মধ্যে
খুঁজে পাবে
এবং সম্ভবত
তাদের পথপরিক্রমাও
পুরোটাই বদলে
যাবে। সেটি
হলে মূল্যস্ফীতি
প্রত্যাশায় ঊর্ধ্বমুখী
স্থানান্তর ঘটবে
এবং সেটি
ঘটবে মূল্যস্ফীতির
মহামারী ঘটিয়ে।
আগামী বছরেও
বিপুল ভূরাজনৈতিক
ও পদ্ধতিগত
ঝুঁকি অব্যাহত
থাকবে। ভূরাজনৈতিক
ক্ষেত্রে তিনটা
প্রধান হুমকি
দেখা দিতে
পারে।
এক. রাশিয়া
ইউক্রেনে আক্রমণের
প্রস্তুতি নিচ্ছে
এবং এ
আক্রমণ প্রতিরোধ
নির্ভর করছে
নতুন কোনো
আঞ্চলিক নিরাপত্তা
ব্যবস্থা বিষয়ে
কোনো আলোচনা
আদৌ হবে
কিনা তার
ওপর। অবশ্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট
জো বাইডেন
ইউক্রেনকে আরো
সামরিক সহায়তা
দেয়ার প্রতিশ্রুতি
ব্যক্ত করেছেন
এবং রাশিয়ার
বিরুদ্ধে কঠোর
অবরোধ আরোপের
হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তবে অবরোধ
শব্দটি ব্যবহারের
মাধ্যমে মার্কিন
প্রেসিডেন্ট পরিষ্কারভাবে
জানিয়ে দিয়েছেন
যে রাশিয়ার
হামলা থেকে
ইউক্রেনকে রক্ষায়
সরাসরিভাবে তারা
অংশ নেবেন
না। অস্বীকার
করার উপায়
নেই, রাশিয়ার
অর্থনীতি এখন
আগের চেয়ে
অনেক বেশি
শক্তিশালী ও
স্থায়িত্বশীল। কাজেই
ওই ধরনের
হুমকি দেশটির
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির
পুতিনকে মোটেই
ভড়কে দেবে
না। সর্বোপরি,
কিছু পশ্চিমা
অবরোধ যেমন
নর্ড স্ট্রিম
২ গ্যাস
পাইপলাইন বন্ধ
করে দেয়ার
মতো পদক্ষেপ
বরং ইউরোপের
নিজস্ব জ্বালানি
ঘাটতি আরো
তীব্রতর করতে
পারে।
দ্বিতীয়ত, চীন-আমেরিকান
শীতল যুদ্ধ
আরো তীব্রতর
হচ্ছে। চীন
তাইওয়ান ও
দক্ষিণ চীন
সাগরে (যেখানে
সীমান্ত বিরোধ
প্রবলতর হচ্ছে)
এবং চীন
ও যুক্তরাষ্ট্রের
অর্থনীতির মধ্যকার
বৃহত্তর ডিকাপলিং
প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত
হচ্ছে। সময়ান্তরে
এ অগ্রগতির
একটি স্থবিরতামূলক
পরিণাম থাকবে।
তৃতীয়ত, ইরান
এখন একটি
প্রায় পারমাণবিক
শক্তিধর রাষ্ট্র
(থ্রেসহোল্ড নিউক্লিয়ার
স্টেট)।
দেশটি জোরালোভাবে
নিয়ার-উইপন
গ্রেডে ইউরেনিয়াম
সমৃদ্ধ করে
আসছে। এ
পরিস্থিতিতে একটা
ব্যাপার হলো,
পারমাণবিক চুক্তি
সংশোধন বা
সংস্কারের বিষয়ে
কোথাও কোনো
আলোচনা হচ্ছে
না। ফলে
ইসরায়েল প্রকাশ্যে
ইরানের পারমাণবিক
স্থাপনায় হামলার
হুমকি দিচ্ছে।
তেমনটা ঘটলে
১৯৭৩-৭৯
সময় পর্বের
তেলসংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক
অভিঘাতের চেয়ে
স্থবিরতামূলক পরিণাম
বেশি হবে।
নতুন বছর
আরো কিছু
পদ্ধতিগত উদ্বেগ
সামনে নিয়ে
আসবে। ২০২১
সালে দাবদাহ,
অগ্নিকাণ্ড, খরা,
হারিকেন, বন্যা,
টাইফুন এবং
অন্য দুর্যোগগুলো
জলবায়ু পরিবর্তনের
প্রকৃত প্রভাব
অনেকটা উন্মোচন
করেছে। আর
এদিকে গ্লাসগোয়
অনুষ্ঠিত কপ২৬
জলবায়ু সম্মেলন
বেশির ভাগ
ক্ষেত্রেই কিছু
গালভরা প্রতিশ্রুতি
উপহার দিয়েছে
চলতি শতকে
বৈশ্বিক উষ্ণতা
৩ ডিগ্রি
সেলসিয়াস বৃদ্ধির
একটা বিপর্যয়কর
পরিস্থিতিতে বিশ্বকে
ঠেলে দিয়ে।
খরা এরই
মধ্যে খাদ্যের
দাম বিপজ্জনক
মাত্রায় বাড়িয়ে
দিচ্ছে এবং
জলবায়ু পরিবর্তনের
প্রভাব ক্রমেই
খারাপ থেকে
খারাপ হচ্ছে।
সামনে আরো
খারাপ হতে
পারে।
এখন দেশে
দেশে অর্থনীতিকে
বি-কার্বনায়নের
দিকে নিয়ে
যাওয়ার একটা
আলাপ চলছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির
পর্যাপ্ত সরবরাহ
নিশ্চিতের আগে
আগ্রাসীভাবে সেদিকে
নিয়ে যাওয়াটা
জীবাশ্ম জ্বালানি
সক্ষমতায় বিনিয়োগ
নিঃশেষিত করে
পরিস্থিতি আরো
খারাপ করতে
পারে। সময়ান্তরে
এ ডিনামিক্স
জ্বালানির দাম
আরো বাড়াতে
পারে। অধিকন্তু,
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
ইউরোপ ও
অন্য উন্নত
দেশগুলোর শরণার্থীর
প্রবাহ বাড়বে,
যেহেতু দেশগুলো
তাদের সীমান্ত
বন্ধ করে
দেয়ার পরিকল্পনা
করছে।
এ প্রেক্ষাপটের
বিপরীতে উন্নত
ও উদীয়মান
অর্থনীতি উভয়
ধরনের দেশগুলোয়
রাজনৈতিক অকার্যকারিতা
(পলিটিক্যাল ডিসফাংশন)
বাড়ছে। মার্কিন
মধ্যবর্তী নির্বাচন
একটি পূর্ণ
প্রস্ফুটিত সাংবিধানিক
সংকট উপহার
দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র দলীয়
মেরুকরণ, অচলাবস্থা
ও রক্ষণশীলতার
নজিরবিহীন মাত্রার
মধ্য দিয়ে
যাচ্ছে, যার
সবগুলোয় সাংঘাতিক
পদ্ধতিগত ঝুঁকি
সৃষ্টি করতে
পারে।
জনতুষ্টবাদী দলগুলো
(দক্ষিণপন্থী ও
বামপন্থী উভয়ই)
বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী
হচ্ছে, এমনকি
লাতিন আমেরিকারের
মতো অঞ্চলেও—যেখানে
রাজনৈতিক জনতুষ্টিবাদ
একটা বিপর্যয়কর
ইতিহাসের রূপ
নিয়েছে। পেরু
ও চিলি
উভয় দেশেই
বিদায়ী বছরে
কট্টর বামপন্থী
নেতারা বিজয়ী
হয়েছেন। ২০২২
সালে ব্রাজিল
ও কলম্বিয়ায়ও
তেমনটা ঘটতে
পারে। আবার
আর্জেন্টিনা ও
ভেনিজুয়েলায় আর্থিক
পতনের ধারাবাহিকতা
বজায় থাকবে।
ফেডারেল রিজার্ভ
ও অন্য
প্রধান কেন্দ্রীয়
ব্যাংকগুলোর গৃহীত
নীতি সুদহার
স্বাভাবিকীকরণের পদক্ষেপে
ওইসব দেশ
এবং তুরস্ক
ও লেবাননের
মতো নাজুক
উদীয়মান বাজারগুলোয়
আর্থিক অভিঘাত
ঘটাতে পারে।
উল্লেখ করার
দরকার নেই
যে অনেক
উন্নয়নশীল দেশই
ঋণ ফাঁদে
পড়বে, যাদের
ঋণ অনুপাত
এরই মধ্যে
অস্থায়িত্বশীল।
২০২১ সালের
মতো বুদ্বুদময়
না থাকলেও
আর্থিক বাজারগুলো
ফেনিল থাকবে।
বর্তমানে সরকারি
ও ব্যক্তি
খাতের শেয়ারগুলো
বেশ ব্যয়বহুল
(আয়মূল্য অনুপাত
গড়ের উপরে
রয়েছে), মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র ও
আরো অনেক
অর্থনীতিতে আবাসন
মূল্য (গৃহায়ন
ও ভাড়া)
এখন অনেক
বেশি এবং
মিম স্টক,
ক্রিপ্টো অ্যাসেট,
এসপিএসি (স্পেশাল
পারপাস অ্যাকুইজিশন
কোম্পানি) ঘিরে
বেশ উন্মাদনা
এখনো রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি
বন্ডগুলোর ইল্ড
অতি নিম্নমাত্রায়
রয়ে গেছে,
ঋণ স্প্রেডও
অনেক দিন
ধরে সংকুচিত,
এটি আংশিকভাবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর
প্রত্যক্ষ ও
অপ্রত্যক্ষ সমর্থনের
কারণে।
যতদিন কেন্দ্রীয়
ব্যাংকগুলো অগতানুগতিক
নীতি ধরনে
(আনকনভেনশনাল পলিসি
মোড) ছিল,
ততদিন সবকিছু
ভালোভাবে চলছিল।
কিন্তু ২০২২
সালে নীতিহার
স্বাভাবিকীকরণ শুরু
হলে সম্পদ
ও ঋণ
বুদ্বুদ সংকুচিত
হতে পারে।
উপরন্তু, মূল্যস্ফীতি,
ধীর প্রবৃদ্ধি,
ভূরাজনৈতিক ও
পদ্ধতিগত ঝুঁকিগুলো
চলতি বছর
বাজার সংশোধনের
শর্তও তৈরি
করতে পারে।
যেটিই আসুক
বা ঘটুক
না কেন
এ বছরের প্রায়
পুরোটা সময়জুড়ে
বিনিয়োগকারীরা হয়তো
খাদের কিনারায়
থাকবেন, যেখান
থেকে যেকোনো
মুহূর্তে তারা
ছিটকে পড়তে
পারেন।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
নুরিয়েল রুবিনি: মার্কিন
অর্থনীতিবিদ, রুবিনি
ম্যাক্রো অ্যাসোসিয়েটসের
প্রধান নির্বাহী,
সহপ্রতিষ্ঠাতা দ্য
বুমবাস্ট ডট
কম
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










