চলতি বছর দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সভায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের অনেকে সেখানে যাওয়া সিইওদের আনন্দিত ভাব দেখে প্রভাবিত হন। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের আশাবাদের মিলন ঘটানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
নিশ্চিত করে বললে, এমন কশাস অপ্টিমিজম বা পরিপূর্ণ সফলতার আশা না করেও ভালো ফলাফলের আশা করার ক্ষেত্রে কিছু ভিত্তি রয়েছে, যেমন কঠোর জিরো কভিড নীতি থেকে চীনের ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া। শিগগিরই দেশটিতে রিভেঞ্জ স্পেন্ডিং বা দীর্ঘসময় কেনার সুযোগ না পাওয়ার ফলে ক্রেতাদের বেশি বেশি পণ্য ক্রয়ের প্রবণতা বাড়বে। গত তিন বছরের বেশির ভাগ সময় দেশটির জনগণ লকডাউনে কাটিয়েছে এবং এখন তাদের খরচ করার জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের আশা করছেন। সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা, চীনা ক্রেতারা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সক্ষম হবে এবং এর ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছবে। এদিকে চীনে যা-ই ঘটুক না কেন ভারত ক্রমাগত শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে, যা মূল্যছাড়ে রাশিয়ান তেল কেনার ফল।
আবার অতি-আত্মবিশ্বাসী পূর্বাভাসের কারণে রোমাঞ্চিত ইউরোপীয়দের আশা, ২০২৩ সালে তারা মন্দার মুখে পড়বে না, অন্তত খারাপ অবস্থায় পড়বে না। এমনকি ইতালিও তাদের প্রবৃদ্ধি অনুমান ঊর্ধ্বমুখী করেছে এবং প্রত্যাশা করছে চলতি বছর তা দশমিক ৬ শতাংশ বাড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পলিসি এজেন্ডায় জলবায়ু পরিবর্তনকে সবচেয়ে ওপরে রাখা হয়েছে। তবে পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নই এবারের শীতে ইউরোপকে গ্যাসের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করেছে, যা অনেক বিশ্লেষক পূর্বাভাস করেছিলেন।
অনেক ইউরোপীয় যুক্তি দিতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ ফেডারেল রিজার্ভের আগ্রাসী সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব চলতি বছর নাগাদ উপলব্ধি করা যাবে না। হয়তো তাদের বক্তব্য অর্ধেক ঠিক হতে পারে, কারণ বড় ধরনের কোনো নিম্নগামী প্রবণতা ছাড়া ফেডারেলের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের বড়সড় ভাগ্য থাকতে হবে। একই সময়ে, ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা ভয় পাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি হ্রাস আইনে অন্তর্ভুক্ত পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ভর্তুকি এ মহাদেশ থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বন্ধ করে দেবে।
তবে যতই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি এসব দেশ হোক না কেন তা ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল। এর কোনো শেষ দেখা না গেলেও এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হতে পারে, তাতে সৃষ্টি হতে পারে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট।
উদাহরণ হিসেবে ধরুন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার ধ্বংস হবে নিশ্চিত। কিন্তু এক্ষেত্রে চীনের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। যদি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য পুতিনকে নিন্দা জানান এবং একই সময়ে রাশিয়ান তেল ও পণ্য কেনেন তাহলে পশ্চিমারা রাশিয়ান যুদ্ধযন্ত্রকে সক্ষম করছে এমন দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হবে—যেমন ভারত ও চীন।
যদিও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর আজকের বর্ধিত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পরিমাপ করা কঠিন, তার পরও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিসংখ্যান বলছে, ডিগ্লোবালাইজেশনের কারণে বৈশ্বিক জিডিপি ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যদি তাকে প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে হয়তো সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। নেট জিরো ট্রানজিশন এরই মধ্যে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ, খণ্ডিত বিশ্বে যা অর্জন করা আরো কঠিন হয়ে যাবে।
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে বলে আগেই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আগামী ১০ বছরে তা জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ বাড়বে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বারবার বলেছেন, ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে তিনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করবেন না, দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ, যার আশঙ্কা আরো বেশি মনে হচ্ছে, তা আরো বেশি ভয়ংকর হবে, এমনকি যদি আমরা আঞ্চলিক পারমাণবিক যুদ্ধ বা পারমাণবিক সন্ত্রাসের কারণে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিগুলোকে ছাড় দিই তবুও। বিশ্বায়নের সুবিধাগুলো সম্পর্কে ভাবতে গেলে আমরা একটি প্রাথমিক সুবিধার কথা ভুলে যাই, যার নাম আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা।
যুদ্ধপূর্ববর্তী সীমান্ত পুনর্বহাল করতে চায় ইউক্রেনীয়রা, সেই সঙ্গে ন্যাটোর কাছ থেকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় এবং পুনর্গঠনের জন্য শত শত কোটি ডলারের সহায়তা পেতে চায়। পাশাপাশি পুতিন ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনতে চায় দেশটি। পুতিনের পারমাণবিক হুমকিতে তারা মোটেও ভীত নয়। কিন্তু ইউক্রেনে আধুনিক সব ট্যাঙ্ক সরবরাহে জার্মানির অনিচ্ছা থেকে বোঝা যায়, ন্যাটোর সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় সাধারণভাবে খুবই অস্বস্তিতে পড়েছেন পশ্চিমা নেতারা।
আপাতত পশ্চিমের পরিকল্পনা ইউক্রেনকে যথেষ্ট যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে তাদের অঞ্চল আবার ফিরে পেতে সাহায্য করা অথবা কোনো একটি সমাধানে আসতে সাহায্য করা। পশ্চিমা কৌশলেরই একটি মূল অংশ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়েই এ যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব হবে এমনটা ভাবা অজ্ঞতা হবে। আধুনিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি অঞ্চলেই ক্ষমতা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে, সেটি হলো আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকায়। তার পর থেকে পুরো বিশ্বই দক্ষিণ আফ্রিকার পৃথককরণের বিরুদ্ধে একত্র হয়ে থেকেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক এমন নয়।
রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এ মুহূর্তে এ বৃদ্ধি সম্ভবত স্বল্পমেয়াদে মূল্য সংকোচনমূলক প্রভাব ফেলবে, কেননা বাজার এবং ক্রেতা উভয়েই আতঙ্কিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে না। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির বলকানাইজেশন (বড় রাষ্ট্রগুলোর ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়া) অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।
হতে পারে (যদিও অসম্ভব) পুতিনের শাসন ভেঙে পড়বে এবং যা কিছু তাকে সফল করছে সেগুলোও শান্তি খুঁজবে। আরো সম্ভব যে ইউক্রেনে পুনরুপনিবেশ স্থাপনের পরিকল্পনায় অটল থাকবে রাশিয়া এবং তা প্রকৃত অর্থে একটি চীনা অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হবে। আরো কিছু সম্ভাব্য ফলাফল রয়েছে, কিন্তু ইউরোপে শিগগিরই শান্তি ফিরিয়ে আনা সেগুলোর একটি নয়। বিশ্বের ব্যবসায়িক নেতারা হয়তো ইউক্রেনের কথা ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তারা বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারবেন না।
[স্বত্ব: প্রোজেক্ট সিন্ডিকেট]
কেনেথ রগোফ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড পাবলিক পলিসির অধ্যাপক
ভাষান্তর: শর্মিলা সিনড্রেলা










