বাংলাদেশের সংবিধানে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ বলতে মূলত অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে বোঝানো হয়েছে [অনুচ্ছেদ ১৫(ক)]। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জীবনধারণের মৌলিক এসব উপকরণ ন্যায্যমূল্যে জনগণের কাছে সহজলভ্য করা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দেশের মোট জনসংখ্যার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ (সূত্র: হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে ২০১৬) দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা এদেশে এসব মৌলিক উপকরণের দাম আকাশচুম্বী, যা সাম্প্রতিক সময়ে শুধু দারিদ্র্য হ্রাসের গতিকে শ্লথ করেনি, বরং নিম্নবিত্তের মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে এবং দরিদ্র মানুষকে অতি দরিদ্রে পরিণত করছে। এর কারণ আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

মৌলিক উপকরণগুলোর মধ্যে প্রধান হছে অন্ন। অন্ন বলতে সাধারণত ভাতকে বোঝায়। চাল থেকে রূপান্তরিত ভাত দেশের কমবেশি ৯০ ভাগ লোকের প্রধান খাদ্য। আমাদের ক্যালরির প্রধান উৎস ভাত। সরকারি তথ্য মোতাবেক, দেড় দশকে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০০ গুণ। ২০০১-০২ অর্থবছরে আমি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। ওই অর্থবছর সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে কৃষকদের কাছ থেকে মোটা আমন চাল কিনেছিল প্রতি কেজি ১২ টাকা ৫০ পয়সায়। চলতি আমন মৌসুমে তা কেনা হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকায়। এখানে উল্লেখ্য, ধান কাটা মৌসুমে সরকারের সংগ্রহ অভিযান শেষে খোলা বাজারে পণ্যটির দাম সাধারণত সরকারের সংগ্রহমূল্যের চেয়ে বেশি থাকে। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি খোলাবাজারে এক কেজি মোটা চালের দাম দাঁড়িয়েছিল ৫০-৫২ টাকার মধ্যে। এক কেজি মাঝারি ও চিকন চালের দাম ছিল অনেক বেশি। প্রশ্ন হলো, গত দেড় দশকে সাধারণ মানুষের আয় কি ৩০০ গুণ বেড়েছে? বাড়েনি। তাছাড়া বেড়েই চলেছে ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য। বিবিএসের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে (হায়েস)-২০১৬ অনুযায়ী, দরিদ্রতম ৫ শতাংশ মানুষের আয় ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে মোট আয়ের শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। দরিদ্রতম ১০ শতাংশ মানুষের আয় ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে মোট আয়ের ১ দশমিক ১ শতাংশে, যা ২০১০ সালে ছিল ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে ধনীদের আয় বেড়েছে। সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের আয় ২০১০ সালের মোট আয়ের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালে মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় ২০১০ সালের মোট আয়ের ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালে মোট আয়ের ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য বৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসের গতি নিম্নমুখী হওয়ার একটি বড় কারণ।

স্বাস্থ্যসেবা জীবনধারণের একটি মৌলিক উপকরণ। সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সূচকে বৈশ্বিক গড় মানের (স্কোর ৪২ দশমিক ২) চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ। ৩৫ স্কোর নিয়ে ১৯৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১৩। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত (৫৭), মিয়ানমার (৭২), (ভুটান ৮৫), পাকিস্তান (১০৫) ও নেপাল (১১১)।