ইদানীংকালে আমার ফেসবুক ইনবক্স উপচে পড়ছে বন্ধু ও আত্মীয়দের শেয়ার করা একটা (ভুয়া) খবরে - Finally FBI arrested a professor from Boston university who was in connection with Chinese university and research lab in Wuhan, and was highly paid by China.......Now it is very close to clear that corona virus is a Bio Attack planned and conducted by China.

১. FBI কি কোনো প্রফেসরকে গ্রেপ্তারকরেছে? হ্যাঁ, করেছে। কিন্তু তিনি Boston Universityর নয়, তিনি ছিলেন Harvard Universityর। Charles Lieber সেখানকার Chemistry and Chemical Biology বিভাগের প্রধান ছিলেন। বয়স 60। বোঝাই যাচ্ছে বেশ বড় বিজ্ঞানী, নাম করেছিলেন ন্যানোম্যাটেরিয়ালের ওপর কাজ করে, ভাইরাসের ওপর নয়। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন এ বছরের ২৮শে জানুয়ারি। এর পরে দু’মাসের ওপর সময় কেটে গেছে।

২. কেন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন? কারণ Lieber ফেডেরাল (অর্থাৎ ওয়াশিংটনের) কর্তৃপক্ষের কাছে চীন থেকে তিনি যে ফান্ডিং (অর্থ) পেয়েছেন সেটা খুলে বলেন নি। যেহেতু তিনি গবেষণার জন্য National Institute of Health (NIH) এবং Department of Defense (DOD) থেকে ফান্ডিং পেতেন সেইজন্য তাঁর আবেদন পত্রে অন্য কোথাও থেকে তিনি গবেষণার জন্য টাকা পান কিনা সেটা উল্লেখ করতে হয়। অধ্যাপকরা/গবেষকরা যদি বাইরে consultancy করে পয়সা পান সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, ইত্যাদি। ২০১১ সনে তিনি উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের (Wuhan University of Technology WUT) সঙ্গে এক চুক্তি করেন যেখানে তাঁর একটা বিরাট সময় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দেবার কথা ছিল - তাঁকে WUT মাসে $50,000 বরাদ্দ করেছিল, এছাড়া থাকা-খাওয়ার জন্য $158,000। অন্যদিকে উহানে একটা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার জন্য $1.5 মিলিয়ন ডলার। কী ধরণের ল্যাব WUTতে তাঁর প্রতিষ্ঠা করা কথা সেই ব্যাপারে পরে আসছি। বোঝাই যাচ্ছে Harvard তাঁত নিয়মিত কাজ করে WUTর এই কাজগুলো করা সম্ভব নয়, কাজেই তিনি এই টাকার কথাগুলো চেপে যান। WUTর সঙ্গে যৌথ কাজ করার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, কিন্তু কাজ করার সময় ও সেটার জন্য যে পারিশ্রমিক তাকে দেয়া হচ্ছে সেটা disclose না করলে তা অপরাধ হবে সেটা তাঁরও জানা ছিল। এছাড়া চীন সরকারের Thousands Talent Plan – যেটাতে বিদেশের চীনা ও বিদেশী বিজ্ঞানীদের চীনে recruit করা হত সেই সম্পর্কে কিছু জানেন না বলেছিলেন। DOD এবং NIH-এর কাছে দেয়া তথ্যে Liber জ্ঞানত তাঁর WUTর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নানাবিধ খুঁটিনাটি এড়িয়ে যান, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় Harvardও জানত না তিনি WUTর সঙ্গে কতখানি জড়িত। FBI মূলত এই জন্যই তাকে গ্রেপ্তার করে।

৩.  যে সংবাদের ফাইলটা শেয়ার করা হচ্ছে সেটার ওপরে FBI এর কর্মকর্তার ভিডিও আছে। যারা শেয়ার করছেন তাঁরা একটু মনোযোগের সঙ্গে যদি ভিডিওটা দেখতেন তাহলে শুনতে পেতেন যে সেখানে করোনাভাইরাস বা কোনো ধরণের জীবাণু অস্ত্রের কথা উল্লিখিত হয় নি। যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁর যদি Lieber-এর Wiki পাতায় যেতেন দেখতেন Charles Lieber-এর ভাইরাস সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তিনি রসায়নের মানুষ এবং 2001 সনে Feynman Prize on Nanontechnology পেয়েছিলেন কার্বন ন্যানোটিউবের ওপর তাঁর কাজের জন্য। তিনি কম খরচে ন্যানো-তার তৈরি করার পদ্ধতি দিয়েছিলেন যা কিনা ইলেকট্রনিক্স ও ডাটা রাখার চিপে ব্যবহার হয়। জীববিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর একমাত্র সম্পর্ক হল এই সূক্ষ্ণ তারের জাল মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়ে কেমন করে নিউরনের বৈদ্যুতিক সঙ্কেত পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে WUT যে ল্যাবটি উহানে তাঁকে গঠন করতে বলেছিল সেটা হল উন্নত ব্যাটারির ল্যাব। Lieber-এর ব্যাটারি সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কেন তাঁকে চীনারা এই কাজের জন্য recruit করেছিল সেটা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিজ্ঞানীর কাছে রহস্য। অনেকে মনে করেন চীনারা Lieberকে ঘুষ দিচ্ছিল যাতে পরবর্তীতে তাকে blackmail করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নত প্রযুক্তি - nanotechonology সংক্রান্ত – যাতে সহজে পাচার করা যায়। [ট্রাম্পের আমলে FBI পুরোনো সম্পর্কও (অর্থাৎ যেখানে চীনের সঙ্গে বর্তমানে সহযোগিতা নেই) অনুসন্ধান করছে।] 

৪. WUT যে শহরে, অর্থাৎ উহানে, সেখানেই একটি বেশ নাম করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, সেটির নাম হল Wuhan Institute of Virology। যারা ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করে তারা এই Virology Institute-এর সাথে Wuhan University of Technologyকে (WUT) গুলিয়ে ফেলে। Charles Lieber-এর যোগাযোগ ছিল WUTর সাথে, Virology Institute-এর সাথে নয়। আগেই বলেছি Lieber জীববিদ নয়, তার ভাইরাস সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। প্রসঙ্গত উহানের এই ভাইরাস Institute থেকেই নতুন করোনাভাইরাসের প্রথম জিনোম সিকোয়েন্স হয়। অনেকে বলেন এই Institute-এর সাথে চীন সরকারের জৈবিক জীবাণু অস্ত্র বানানোর কোনো প্রোগ্রাম আছে। সেরকম কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই, থাকলেও থাকতে পারে। অনেকে বলেন এখান থেকে accidentally নতুন ভাইরাসটি মুক্ত হয়ে উহান শহরে প্রবেশ করেছে। সেরকম কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। বরং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে যে, এই ভাইরাসটি প্রকৃতির এক বিশেষ মিউটেশনের পরই - হয়তো বাদুড় থেকে - আমাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে, অথবা আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে মিউটেট করেছে। 

 ৫. Lieber এখন কোথায় আছেন? যতটুকু জানি উনি $1 মিলিয়ন ডলারের জামিনে কারাগারের বাইরে আছেন। অভিযুক্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর জেল হতে পারে। 

৬. যে জিনিসটা Fake News দুনিয়াকে সাহায্য করেছে সেটা হল Lieber-এর বিরুদ্ধে FBI যেদিন অভিযোগ আনল সেদিনই তারা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠরত দুজন চীনা ছাত্র-ছাত্রীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি বা প্রযুক্তি পাচারের ব্যাপারে মামলা করেছিল। এর মধ্যে ২৯ বছর বয়সী Yinching Ye মার্কিন ভিসা পেতে চীনা সামরিক বাহিনির (তিনি Lieutenant ছিলেন) সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি Boston Universityর ছাত্রী ছিলেন এবং তাঁর কম্প্যুটারে মার্কিন সেনাবাহিনির ওপর কিছু গোয়েন্দাগিরির তথ্য পাওয়া যায়। FBI এই ব্যাপারে এগিয়ে আসার আগেই Ye চীনে চলে যান এবং এখন মনে হয় সেখানেই আছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ Zaosong Zeng নামে আর এক চীনা ছাত্রকে বোস্টন বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে 30 শিশি ক্যান্সারের কোষ পাওয়া যায় যা কিনা সে Beth Israel Deaconess Medical Center থেকে চুরি করেছিল। কবে তাকে প্রেপ্তার করা হয়েছে - ২০১৯-এর ১০ই ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই করোনা আতংক শুরু হবার আগে। যে জিনিসটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল এই দুই চীনা ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে করোনা ভাইরাসের কোনো সংযোগ নেই, তার চেয়ে বড় কথা হল Charles Lieberএর সাথে তাদের যোগাযোগ ছিল না। 

৭. তাহলে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের তাহলে সূত্রপাত কেন? আধুনিক যুগের প্রতিটি সংবাদ যাচাই করে নেবার অনেক উপায় আছে। প্রথমত নিজের যুক্তি ও জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সেই পর্যায়টি যদি সংবাদটি পার হয় তবে আন্তর্জালে অনুসন্ধান করতে হবে। ওপরে আমি যা লিখলাম সবই তো আন্তর্জালে আছে। তবু আমরা সেই খাটনিটুকু করতে চাই না। Fake News বানানোর যেমন একটা দর্শন আছে, Fake News শেয়ার করারও একটা দর্শন আছে। আমরা খুব সহজেই এরকম ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে চাই কারণ আমাদের মস্তিষ্ক একটা কার্যকারণ সম্বন্ধ খুঁজতে চায়। সেই মস্তিষ্ক যেন বলছে নিশ্চয় প্রকৃতি এরকম নিষ্ঠুর হবে না, মানুষ ছাড়া এরকম কাজ আর কে করবে (অথচ অন্য সময়ে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার ­– যেমন শিশু মৃত্যুর সময় – বলি ঈশ্বরের আচরণ রহস্যময়, সেই রহস্য আমাদের বোধের উর্ধে)। এই ভাইরাসটি ল্যাবে যে বানানো নয়, আর বানানো হলেও Charles Lieber-এর পক্ষে যে এটা বানানো সম্ভব নয় সেটা একটু অনুসন্ধান করলেই বোঝা যায়। কথা হল এটা যদি ল্যাবে সৃষ্টিই হত তাতে কি আমাদের সমস্যা মিটে যেত? না, মিটতো না, কিন্তু অনেক সময় একটা বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা সংবাদগুলো শেয়ার করি। যেমন এটা যদি চীনের ল্যাবে তৈরি হয় তো চীন সম্পর্কে, সেটার নিয়ন্ত্রণবাদিতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা পূর্ণতা পাবে। আবার যদি এটা মার্কিন ল্যাবে সৃষ্টি করে চীনে পাচার করা হয় তো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে এতদিন যা বলে এসেছি তা প্রতিষ্ঠিত হবে। যখন যেটা কাজে লাগে। এর জন্য কোনো প্রমাণের দরকার নেই। 

নাকি ল্যাবে বানানো হলে নিশ্চয় এটার প্রতিষেধক সাথে সাথে তৈরি করা হয়েছে এরকম একটা ক্ষীণ আশার সঞ্চার হয়? আমার এক নিকটজন বললেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এবং তার নিকট লোকদের কাছে নাকি ইতিমধ্যে প্রতিষেধক আছে এরকম একটা খবরও চলছে। আমার মতে এরকম খবর এই করোনা ক্রান্তিকালকে আরো সঙ্কটবহুল করে দেয়, আমাদের দুঃশ্চিন্তা, আশঙ্কা, অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দেয়। সমাধান দেয় না। 

[1] https://www.nytimes.com/2020/01/28/us/charles-lieber-harvard.html

[2] https://www.factcheck.org/2020/02/no-link-between-harvard-scientist-charles-lieber-and-coronavirus/

[3] https://www.sciencemag.org/news/2020/02/why-did-chinese-university-hire-charles-lieber-do-battery-research

[4] https://www.nytimes.com/2019/12/31/us/chinese-scientist-cancer-research-investigation.html