প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম মেট্রোরেলের শুভ উদ্বোধন করলেন গতকাল। দেশের পরিবহন খাতের জন্য এটা বড় ঘটনা। যদিও প্রথম পর্যায়ে এই ট্রেনসেবা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু করা হবে। পরে তা বিস্তৃত হবে মতিঝিল পর্যন্ত, যে পথের মোট দূরত্ব ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর সফলতায় যে কেউ ঢাকার অন্য ব্যস্ত এলাকা কিংবা দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরে এমন সেবা চালু হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করতে পারেন। বাংলাদেশের মতো একটি অধিক জনবহুল, দ্রুত নগরায়ণ হতে থাকা ও জায়গাস্বল্পতায় ধুঁকতে থাকা একটি দেশের জন্য মেট্রোরেলের সুবিধা অনেক। এটা যে কেবল দৈনিক যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে, তা নয়। বরং একসঙ্গে প্রচুর যাত্রী বহনের মাধ্যমে পরিবহনের অন্য মাধ্যমগুলোর ওপরও চাপ কমিয়ে দেবে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ নমনীয়তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও গতির ফলে পরিষেবাটি যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি দেয়, তা আমাদের জীবনমানের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। মেট্রোরেল কেবল দ্রুত পরিবহন নয়, এটি পরিবেশবান্ধবও। বাংলাদেশে মেট্রোরেল নতুন পরিবহন হওয়ায় এর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে। ফলে কর্তৃপক্ষকে যাত্রীদের সচেতন করার পাশাপাশি নিজেদেরও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। জাতির অগ্রগতির প্রতীক এ পরিবহন কারো গাফিলতি বা ভুলে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, সেটা কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না। মেট্রোরেল ঢাকার জনজীবনে গতি আনবে বলে প্রত্যাশা।

রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে গণপরিবহন হিসেবে সাধারণ বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যানজট সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বড় বিকল্প হচ্ছে মেট্রোরেল। বিশ্বের সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা এই মেট্রোরেল প্রকল্প রাজধানীর যানজট সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনবে। ওই সম্ভাবনায় পৌঁছার বিষয়টি যদিও অনেকাংশে নির্ভর করে অনিষ্পন্ন কাজ ও কেনাকাটা (ট্রেন, কোচ ইত্যাদি) কত দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক চলাচল শুরুর পর কতটা সন্তোষজনকভাবে সেবাটি দেয়া হচ্ছে। ২০১২ সালে কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের মেয়াদ বেশ কয়েকবার বাড়ানো হয়েছে, ব্যয়ও বেড়েছে। ডিসেম্বরে এ পরিষেবা চালুর পর তার পথে আর কোনো বাধা আসবে না। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে সদিচ্ছার কোনো অভাব আছে বলে মনে হয় না। তার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়, সে ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এ বার্তাও নিতে হবে, যাতে এটি অন্যান্য উচ্চাভিলাষী যোগাযোগ প্রকল্পগুলোর ভাগ্যবরণ না করে, যা প্রতিশ্রুতি অনুসারে ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

যানজটের কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০১৮ সালে পরিচালিত বুয়েটের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকা শহরের যানজটের কারণে বার্ষিক ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, যা জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট কর্মঘণ্টার মূল্য বিবেচনায় নিলে ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, ঢাকার যানজট ৬০ শতাংশ কমাতে পারলে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। এছাড়া ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুসারে, মেট্রোরেল প্রকল্পটি প্রতি বছর ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে, যা জাতীয় জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। তাছাড়া মেট্রোরেল ঢাকার ১৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ করবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে গতিশীল করবে, যা অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

মেট্রোরেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর লোকবলের প্রয়োজন হবে, যা বাংলাদেশে অনেক কাজের সুযোগ তৈরি করবে। প্রতিটি মেট্রোরেলের স্টেশনে একটি অপারেটিং রুম, টিকিট কাউন্টার, লাউঞ্জ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট, প্রার্থনার স্থান, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, এসকেলেটর, লিফট এবং আরো অনেক কিছু থাকবে। কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে নতুন কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তাছাড়া স্টেশনগুলোর আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোয় ব্যবসা পরিচালনার জন্য একদল কর্মীর প্রয়োজন হবে। এসব কর্মসংস্থান আর্থিক কার্যকলাপ বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। মেট্রোরেলের কারণে ট্রানজিট ব্যবস্থা বাড়বে এবং স্টেশনগুলোর আশপাশে অসংখ্য ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত ব্যবসা গড়ে উঠবে। এছাড়া উন্নত পরিবহন পরিকাঠামোর কারণে নতুন সংস্থাগুলো বিকাশের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে বর্তমান ব্যবসাগুলো উপকৃত হবে। সামগ্রিকভাবে স্টেশন ও রুটের কাছাকাছি স্থাপন করা এ ব্যবসাগুলো দেশের জিডিপিতে যথেষ্ট অবদান রাখবে।

পিক আওয়ারে বাস না পাওয়া, অতিরিক্ত ভিড়, অল্প ব্যবধান, বাস কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার ইত্যাদি কারণে ঢাকা শহরের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। ট্যাক্সি ও সিএনজি ছিল বাসের বিকল্প। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া, ‘মিটার ভাড়া’ ব্যবহার না করার প্রবণতা, যাতায়াতের অনুরোধ কমে যাওয়া, সিএনজিতে ছিনতাই ও মলম পার্টির উৎপাত এবং চালকদের দুর্ব্যবহার জনগণের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ঢাকাবাসীর যাতায়াতের একটি সুবিধাজনক মাধ্যম হবে মেট্রোরেল। কারণ এটি প্রচুর যাত্রী বহনক্ষমতাসহ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন সুবিধা দেবে, এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করবে এবং প্রতি ৪ মিনিটে প্রতিটি স্টেশনে একটি ট্রেন যাতায়াত করবে। তাছাড়া বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবহারে নারীরা প্রায়ই হয়রানির সম্মুখীন হয়। এর মধ্যে রয়েছে পিক টাইমে দীর্ঘ অপেক্ষার সময়, শারীরিক বা মৌখিক হয়রানি, আসনস্বল্পতা, নিরাপদে বাসে ওঠানামা ও উপযুক্ত পরিবহন খোঁজা। এসব কারণে নারীরা বিদ্যমান পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছে। সুতরাং, তারা মেট্রোরেলে ভ্রমণে আরো আগ্রহী হবে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে।

মেট্রোরেল আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি নতুন যুগে আবদ্ধ করবে। উন্নত দেশগুলোয় মেট্রোরেল এবং অন্যান্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন মাধ্যমগুলোকে একত্র করে একটি উন্নত রুট সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে, যাতে মানুষ শুধু একটি পেমেন্ট কার্ডের মাধ্যমে তাদের গন্তব্যে ভ্রমণ করতে পারে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে মেট্রোরেলের ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। সিস্টেমটি ধীরে ধীরে সব ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রসারিত করা যেতে পারে। এটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন আনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। মেট্রোরেল চালু হলে ঢাকা শহর থেকে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানো যাবে। মানুষ বাসা ভাড়া অনেক কম খরচ করে শহরের বাইরে থাকতে পারে এবং অফিস ও অন্যান্য কাজে সহজে ঢাকায় আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বসবাসকারীরা সব রুট সম্পন্ন হয়ে গেলে ১ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মূল শহরে যেতে পারবে। প্রতিটি মেট্রোরেল রুট ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সুতরাং পুরো ট্রানজিট সিস্টেমটি কাছাকাছি শহরে প্রসারিত করা যেতে পারে। বর্তমানে এসব এলাকায় বসবাসকারী লোকজনও সেখানে বসবাস না করে মূল শহরের কর্মী বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন। তাছাড়া অনেক বাণিজ্যিক উন্নয়ন ঘটবে এবং রুটের চারপাশে সুবিধাগুলোর ভাড়া ও মূল্য বাড়বে। দ্বিতীয়ত, আবাসিক ভবন বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য পুনর্নির্মাণ করা হবে। ফলে ওইসব এলাকায় বসবাসকারী লোকজন কম ভাড়ার জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হবে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ কেন্দ্রীয় শহর থেকে বিকেন্দ্রীভূত হবে।

ঢাকার রাস্তায় চলমান সব যানবাহন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, যা পরিবেশদূষণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। এছাড়া ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের উদ্যোগ চলছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে রয়েছে। মেট্রোরেল রাজধানীর পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঢাকার বায়ুদূষণ অন্যান্য মেগাসিটির তুলনায় অনেক বেশি তীব্র। যেহেতু মেট্রোরেল ‘বিদ্যুচ্চালিত’ এবং প্রতি ঘণ্টায় বেশি যাত্রী বহন করতে পারে, তাই ঢাকায় বাস ও অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে যাতায়াতের প্রবণতা কমে যাবে। এতে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমবে, যা পরিবেশের জন্য উপকারী হবে। এছাড়া শব্দ, শক ও কম্পন কমাতে মেট্রোরেলে ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম (এমএসএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। শব্দদূষণ রোধে কংক্রিটের পাশের দেয়ালও করা হবে। এ প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর মেট্রোরেলের প্রভাব কমাবে।

মেট্রোরেল পুরোপুরি চালুর আগে কয়েকটি বিষয় আমলে নিতে হবে। প্রথমত, স্টেশন এবং এর সংযুক্ত সড়কগুলোর ব্যবস্থাপনা। স্টেশনে মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এড়াতে হবে, যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ওঠানামা করতে পারে। এরপর স্টেশন থেকে সংযুক্ত সড়কগুলোয় কী ধরনের বাহন চলবে, তাও আগে থেকে ঠিক করতে হবে। ঢাকা শহরের সড়ক রুটগুলো উত্তর-দক্ষিণমুখী। সেক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মানুষ যাতে মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। মেট্রোরেল পুরোপুরি চালু হতে আরো ১৫ মাস সময় লাগবে। এ সময়ে নগরের যানজট কীভাবে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়, তাও কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। ঢাকা শহরের সড়ক পরিবহনে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে, যা কেবল যানজটই বাড়াচ্ছে না, অসুস্থ প্রতিযোগিতায় দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হক শহরজুড়ে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি বা এক রুটে এক কোম্পানির বাস চালুর ব্যাপারে উৎসাহী ও তত্পর ছিলেন। তার উদ্যোগে এ পদ্ধতিতে হাতিরঝিল থেকে গুলশান-২ পর্যন্ত ‘ঢাকা চাকা’ চালু হয়েছিল এবং তা সফলভাবে চলছে। ধীরে ধীরে সব রুটেই এ পদ্ধতিতে বাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের হস্তক্ষেপে যেন এ পরিকল্পনা মাঝপথে থেমে না যায় সে নিশ্চয়তাও নগরবাসী পেতে চায়।