‘বিশ্ববিদ্যালয় একটা বিশেষ সাধনার ক্ষেত্র। সাধারণভাবে বলা চলে, সে সাধনা বিদ্যার সাধনা। কিন্তু তা বললে কথাটা সুনির্দিষ্ট হয় না; কেননা বিদ্যা শব্দের অর্থ ব্যাপক এবং তার সাধনা বহুবিচিত্র’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শিক্ষা’।|
এক.
আমাদের দেশে শীতের মৌসুমে কিংবা শীত চলে যাওয়ার প্রান্তে এসে সাধারণত দুটো অনুষ্ঠান মাথাচাড়া দেয়। এর একটি হলো বনভোজন এবং অন্যটি সমাবর্তন উৎসব। অন্যান্য উৎসবের কথা আপাতত না হয় থাক। যেমন পিঠা উৎসব, শীতকালীন খেলাধুলা, বিয়ে-শাদি ইত্যাদি। এরই মধ্যে খবর পেলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ২ মার্চ সমাবর্তন অনুষ্ঠান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুমান করি, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন উৎসব হয়ে গেছে কিংবা হওয়ার অপেক্ষায় আছে। অবশ্য সমাবর্তন উৎসব পালনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যতটা নিয়মিত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক ততটা নয় এবং বলাবাহুল্য, তা নানা কারণে।
সাধারণ অর্থে, কনভোকেশন বা সমাবর্তন বলতে যা বোঝায় তা হচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের কোনো বিশেষ একটা জায়গায় একত্র হওয়া বা করা। তবে আজকাল আমরা কনভোকেশন বা সমাবর্তন বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের সনদপ্রাপ্তির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হওয়াটাকে বুঝে থাকি। কেউ এটাকে গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি হিসেবেও দেখে থাকেন।
একজন ছাত্রের কাছে সমাবর্তন উৎসবে যোগ দেয়ার ব্যাপারটি তার জীবনের অন্যতম এক স্বপ্ন হিসেবে অন্তরে গেঁথে থাকে। কোনো একদিন সকালে গাউন আর হ্যাট পরে হেঁটে সমাবর্তন প্যান্ডেলে পৌঁছে সতীর্থদের সঙ্গে ভাবগম্ভীর পরিবেশে মহামান্য আচার্যের কাছ থেকে সনদ বা স্বর্ণপদক নিয়ে বাড়ি ফিরবে—এমন স্বপ্ন সে দেখে। ওই দিনটিতে বাবা-মাকে নিয়ে যায় অনেকে, বাড়তি পাওনা হিসেবে থাকে ছবি তোলা, হারানো বন্ধুদের ফিরে পাওয়া এবং আড্ডা দেয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
দুই.
সমাবর্তনের ইতিহাস অতি দীর্ঘ এবং ভিন্নমত দিয়ে প্রভাবিত। এর মধ্যে যতটুকু জানা যায়, ১৫৭৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দেয়ার জন্য ডেকেছিল এবং বলা হয়ে থাকে যে সেই থেকে পৃথিবীব্যাপী সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রিপ্রাপ্ত হয়ে আসছে। তবে তারও বহু পূর্বে, যখন যাজকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন, তখনো সমাবর্তন শব্দটির সন্ধান মেলে এবং একটু পরই সে বিষয়ে কথা বলব।
সমাবর্তন উৎসব একটা গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠান। এখানে অনেক আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারস্যাপার স্পষ্টত লক্ষণীয়, প্রথমত, এ ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হিসেবে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়টির আচার্য কিংবা তার প্রতিনিধি। দ্বিতীয়ত, এ অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকেন কোনো নামিদামি ব্যক্তি যার কাছ থেকে গ্র্যাজুয়েটরা শিক্ষণীয় কিছু কথা শুনতে পায়। তৃতীয়ত, সমাবর্তন প্যান্ডেলে যেতে হয় নীরবে, মিছিল করে। আচার্য, তার প্রতিনিধি কিংবা সমাবর্তন বক্তাকেও কিছুদূর হেঁটে সমাবর্তন মঞ্চে উঠতে হয়। এ মিছিল সুচারু করার দায়িত্বে থাকেন একজন যার নাম দেয়া হয়ে থাকে ‘মার্শাল’। কৌতুক করে বলা হয় ফিল্ড মার্শাল! চতুর্থত, সমাবর্তন প্যান্ডেলে করণীয় বিষয় ঘিরে প্রাক-প্রস্তুতিস্বরূপ দু-একদিন আগে মহড়ার ব্যবস্থা করা হয় যেখানে আচার্য ও সমাবর্তন বক্তার কুশপুত্তলিকা হিসেবে কাউকে অভিনয় করতে হয়। পঞ্চমত, সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আচার্যের কাছে ডিগ্রি প্রদানের জন্য নিজ নিজ অনুষদের ডিন ডিগ্রিধারীদের উপস্থিত করান। এবং সবশেষে, আচার্যের অনুমতিতে অনুষ্ঠান শুরু এবং শেষ হয় এবং তিনি চলে যাওয়ার পর পিনপতন নীরবতা ভেঙে প্যান্ডেল হয়ে ওঠে সরগরম।
তিন.
এমন একটা সমাবর্তন উৎসব সামনে রেখে ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বিরাজ করে বিরাট উত্তেজনা ও উদ্দীপনা। এর কারণ কারো অজানা থাকার কথা নয়। মধ্যরাতের মোমবাতি পুড়িয়ে, ক্ষেত্রবিশেষে আহার-বিহার ত্যাগ করে, সারা রাত পড়াশোনা শেষে দৌড়ে গিয়ে পরীক্ষার হলে বসা কিংবা বাবা-মায়ের ভালোবাসা এবং স্বজনদের নৈকট্যবঞ্চিত হয়ে হাতে পাওয়া এ সোনার সনদ সমাবর্তনের মাধ্যমে পাওয়া যায়। এটা শুধু পরিশ্রমের পুরস্কার নয়, রীতিমতো সিদ্ধির স্বীকৃতি। তাছাড়া সমাবর্তন ঘিরে পরিবারে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ যে পরিবার দীর্ঘ ভ্রমণে ডিগ্রিধারীকে সহায়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে, শিক্ষকদের সঙ্গে পুনর্মিলনী এ উত্তেজনা ও উদ্দীপনায় বাড়তি জ্বালানি জোগায়। তবে কর্তৃপক্ষের কাছে সমাবর্তন আয়োজন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ—বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের কিংবা তার প্রতিনিধির কাছ থেকে সময় পাওয়া, সমাবর্তন বক্তা হিসেবে এমন কাউকে নির্বাচিত করা যার প্রতি সরকার নাখোশ নন, গাউন আর টুপির ব্যবস্থা করা, খাওয়া-দাওয়া এবং প্রয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইত্যাদি নিয়ে বেশ বড় ধকল যায় প্রশাসনের ওপর দিয়ে।
চার.
প্রসঙ্গত, সমাবর্তন পোশাক হিসেবে গাউন এবং এর সঙ্গে হ্যাট ও টাসেলে এর কথা বলতেই হয়। টাসেলে হচ্ছে শোভা বৃদ্ধির জন্য টুপিতে ঝুলিয়ে দেয়া সূত্রগুচ্ছ।
জানা যায় যে, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ সহস্রাব্দে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন গির্জার যাজকমণ্ডলী। তখন ক্লাস বসত গির্জায় কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো ইমারতে। ইতিহাসবিদদের মতে, ছাত্রদের শহরের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে দেখানোর জন্য গাউন ও হুডসের প্রবর্তন করা হয়েছিল। তাছাড়া কারো মতে, সেই সময় কেন্দ্রীয় তাপ ব্যবস্থা ছিল না। তাই ছাত্রদের ঈষদুষ্ণ রাখার জন্য গাউন ও হ্যাটের প্রচলন করা হয়। সমাবর্তনে মাথায় থাকা হ্যাট হচ্ছে অর্জনের প্রতীক, গ্র্যাজুয়েট অনেক পরিশ্রম করে ডিগ্রি পেল এটার ইঙ্গিত দেয় ওই হ্যাট। আবার বিশেষত ডক্টরেট ও মাস্টার্সের বেলায় টাসেলেটি ডিগ্রি প্রদানের পুরো সময় বাঁ দিকে এবং ডিগ্রিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ডান দিকে ঘুরাতে হয়। এর অর্থ হলো ডিগ্রিধারী একটা নতুন স্তরে প্রবেশ করল। হ্যাটটি বর্গাকৃতির কেন হয় তার ব্যাখায় কেউ বলেন এটা বই নির্দেশ করে, কেউ বলেন মধ্যযুগের যাজকদের প্রতীকী টুপি।
পাঁচ.
আমার উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন হয়েছিল ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যেখানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ছিলেন লর্ড লিটন। আমার এককালের শিক্ষকতা করার জায়গা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন উৎসব হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ৫ জানুয়ারি। অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তখন উপাচার্য, আচার্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। সমাবর্তন বক্তা হয়ে এলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমেদ। প্রথম সমাবর্তন বলে কথা, চারদিকে হইহই রইরই পড়ে গেল।
গাউন ভাড়া করে আনা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং এখানে বানানো হলো তিন হাজারের মতো গাউন।
দ্বিতীয় সমাবর্তনটি হয় ২০০১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। আমি যখন উপাচার্য ছিলাম; আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এবং সমাবর্তন বক্তা প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান। তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় উপাচার্য খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমানের সময়, সমাবর্তন বক্তা ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল। চতুর্থ সমাবর্তন হয় উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের সময় ২০১০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। সমাবর্তন বক্তা প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলাম এবং পঞ্চমটি অনুষ্ঠিত হয় উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম উপাচার্য থাকাকালীন, সমাবর্তন বক্তা ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন।
তারই ধারাবাহিকতায় আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাবির ষষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠান এবং অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল আলমের নেতৃত্বে তার প্রশাসন গলদঘর্ম এ সমাবর্তন সফল করতে। এ সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার কথা রাষ্ট্রপতি এবং আচার্য আবদুল হামিদ এবং সমাবর্তন বক্তা প্রধান বিচারপতি মো. হাসান ফয়েজ সিদ্দিকি। (তথ্য উৎস: আহমেদ সুমন, গণসংযোগ অফিসপ্রধান, জাবি)।
ছয়.
সমাবর্তন সবসময় অনন্য এক অনুষ্ঠান। একদিকে মনে হবে এটা গ্র্যাজুয়েটদের সমাপনী উৎসব, অন্যদিকে এবং একই সঙ্গে মনে হবে এটা শিক্ষক, স্টাফ, প্রশাসন এমনকি বহিঃস্থ সমাজ—সবার অর্জন উদযাপনের উৎসব। নিয়মিতভাবে এ উৎসব উদযাপন একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কৃতিত্বের কথাই বলে থাকে। তাই সমাবর্তন যাতে নিয়মিত হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার খেয়াল রাখা উচিত। দেশে-বিদেশে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের দিনক্ষণ একাডেমিক ক্যালেন্ডারে উল্লেখ থাকে যা প্রমাণ করে সমাবর্তন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা আপাতত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাপনী উৎসব সুন্দরভাবে হোক, সাফল্য লাভ করুক—এ কামনা করি।
‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
আমার এই দেহখানি তুলে ধরো
তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো
নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে
নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’।
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক, বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










