২০২২-২৩ অর্থবছরে বাস্তবায়নের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল সরকার। শুরুতেই করোনা ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থমন্ত্রী সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বাজেট সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। অর্থবছরের ছয় মাসের তথ্য বলছে, সতর্কবাণীই সঠিক ছিল। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে বাজেট বাস্তবায়নের হার মাত্র ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের মাত্র ১৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। আর পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থ। বাজেট বাস্তবায়ন শ্লথ হওয়ার মূল দুটি কারণ হলো—এক. মন্ত্রণালয়ের দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা আর দ্বিতীয়টি অর্থ সংকট। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় উভয় কারণের সত্যতা মিলছে। মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন ছিল, যার কারণে কোনো অর্থবছরেই বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থ সংকট। সরকারের রাজস্ব আহরণ মারাত্মক আকারে কমেছে এবং বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তাপ্রবাহ কমেছে। এর প্রতিফলন বাজেট বাস্তবায়নে পড়েছে। এক্ষেত্রে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক ঋণসহায়তা দ্রুত ছাড়করণের পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা অর্থনীতির গতি আরো শ্লথ হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
করোনা অতিমারী এবং পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশেও পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাজেটে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়া প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, ডলার সংকট। ডলার সংকটের একমাত্র কারণ আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, অর্থ পাচারও অনেকাংশে দায়ী। আমদানিতে ওভার-ইনভয়েসিং যাতে না হয়, তার জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এ-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যে বিভ্রান্তি আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিও বলছে, চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। সুতরাং প্রকৃত তথ্য না পেলে কোনো নীতি প্রণয়নই কাজে আসবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী উচ্চমূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক হিসেবে অভিহিত করে পাশ কাটিয়ে গেলেন। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি সংকট। জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার একটি বড় অংশ সাজানো হয়েছে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করে। গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৫৫ ডলারে উঠে যায়। এর মধ্যে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। জ্বালানির বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারিভাবে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে কারখানা সচল রাখাই দুরূহ হয়ে পড়বে। এজন্য বিশেষ করে বস্ত্র, সিরামিক ও ইস্পাতের মতো ভারী শিল্পে আশঙ্কা বিরাজ করছে। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ কর-জিডিপি অনুপাত। কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও কর-জিডিপির গড় অনুপাত ১৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের ৮ শতাংশেরও কম। গবেষকরা মনে করেন, এ হার অন্তত ২২ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। এর জন্য সম্পদ কর আরোপসহ কর-কাঠামোকে সম্প্রসারণ করতে হবে। কর আহরণে দক্ষতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি আহরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে হবে।
সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার প্রধান কারণ রাজস্ব আহরণ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকা। জাতীয় সংসদ অনুমোদিত বাজেট সুষ্ঠুভাবে সময়মতো বাস্তবায়নে আগাম পরিকল্পনা নেয়া এবং তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে অপরিকল্পিত সরকারি ঋণ এড়ানো ও ঋণজনিত ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো সম্ভব হতো। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাজেট বাস্তবায়নের একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিতে পারে। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বাজেট বাস্তবায়ন অর্থবছরের প্রথমার্ধে চলে ধীরগতিতে। অর্থবছরের শুরুর দিকে বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যেমন ধীরগতি দেখা যায়, তেমনি বেতন-ভাতা ছাড়া অন্যান্য খাতের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণও কম থাকে। তবে অর্থবছরের শেষ দিকে বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মেরামত, সংরক্ষণ, নির্মাণ ও পূর্ত এবং মালপত্র সংগ্রহের পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়ের গুণ-মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বরং বছরের শেষে এসে সরকারকে অপরিকল্পিত ঋণের দায় নিতে হয়। ফলে বাজেট শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন থেকে সরকার সরে যায়নি। জানুয়ারি পর্যন্ত গত বছরের তুলনায় উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয় ২ শতাংশ পিছিয়ে আছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে। এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সেটি গত বছরের তুলনায় খুব বেশি কম হবে না। সরকার চেষ্টা করছে সীমার মধ্যে থেকে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে যতটা কম ঋণ নেয়া যায়। কারণ ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে সেটি অর্থনীতির জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের শেষ নাগাদ আরো ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে। সরকারের এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ কম। কারণ প্রতি বছরই উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ও কাজ যথাসময়ে শেষ করতে না পারায় এডিপি কাটছাঁট করার ঘটনা ঘটছে। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই প্রতীয়মান হয়।
শুধু অবকাঠামোগত নয়, সব ধরনের উন্নয়নই বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। দেশের শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব খাতেই বরাদ্দ থাকে বাজেটে। বাজেট বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতির ভালো-মন্দ। আর বাস্তবায়ন নির্ভর করে সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর। অর্থনীতিতে করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বাজার ঊর্ধ্বমুখী। কারণে-অকারণে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। নতুন কর্মসংস্থান নেই। করোনাকালে বেড়েছে বেকারত্ব। এ দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত উভয় শ্রেণীর মানুষের আয় কমেছে। এ অবস্থায় দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য দেয়াই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। গতি আনতে হবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয়। তা না হলে মূল্যস্ফীতি নাগালের বাইরে চলে যাবে এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেগ পেতে হবে।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটেও কিছু কার্যক্রম ঘোষণা করা হয়েছিল যা যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে কোয়ার্টারভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন খাতের বিপরীতে ধার্য করা লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে কোয়ার্টারভিত্তিক রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। কোনো খাতের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে মৌসুমভিত্তিক কমবেশির রেকর্ড থাকলে তা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইটেমের বিপরীতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। রাজস্ব আহরণ খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। বিদ্যমান আইনের সংস্কার এবং অনলাইনিকরণ ব্যতিরেকে বিদ্যমান কর্মকাঠামো ও লোকবল দিয়ে রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ও পরিবেশের উন্নয়ন সাধন সম্ভব ও সমীচীন হবে না।
রাজস্ব আহরণ ও প্রদান ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল ও আস্থায় আনতে সরকারি-বেসরকারি খাত সমন্বয়ে উপদেষ্টা প্যানেল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্যানেল থেকেই কর নীতি ও রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রস্তাব আসতে পারে। জাপানসহ অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশে এ ধরনের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য করজাল বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সঠিকভাবে কর পরিশোধ করছে কিনা তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশী-বিদেশী ও বহুজাতিক সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ও ব্যক্তিগত কর আহরণ নিশ্চিত করতে পারলে শুধু কর প্রাপ্তিই বাড়বে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান/সংস্থার হিসাবও অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আসবে।
অর্থনীতিতে করোনার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বাজার ঊর্ধ্বমুখী। কারণে-অকারণে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। নতুন কর্মসংস্থান নেই। করোনাকালে বেড়েছে বেকারত্ব। এ দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত উভয় শ্রেণীর মানুষের আয় কমেছে। এ অবস্থায় দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য দেয়াই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাজেট বাস্তবায়নে সরকার দক্ষতার পরিচয় দেবে এটাই প্রত্যাশা।










