সারা বিশ্বে করোনা অভিঘাত মোকাবেলা অভিযান সরকারগুলোকে যেমন শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যক্তি খাতও চিরায়ত এবং নতুন নতুন কায়দায় এ যুদ্ধে শামিল হচ্ছে। আমাদের পাশের দেশ ভারত, এমনকি বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের কেউ কেউ আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশে উদ্যোগটি যদিও এখনো তরুণ-যুবা বা বিশেষ কোনো জনহিতৈষী সংগঠনের মধ্যেই অনেকটা সীমাবদ্ধ, তার পরও আমরা পত্রিকান্তরে জানতে পেরেছি দেশের বৃহৎ কিছু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও করোনা অভিঘাত মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৩ থেকে ১৫ কোটি টাকা দান করেছেন। চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী গ্রুপের কর্ণধার তার রাষ্ট্রীয় পদকের পুরো অর্থই গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন। সিলেটে এক ব্যবসায়ী নারী অনেকটা সঙ্গোপনে গরিবদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিলাচ্ছেন। অন্যদিকে ভারতে দেখলাম আজিম প্রেমজি আর রতন টাটারা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে এগিয়ে আসছেন। 

আমার প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যক্তি খাতের উন্নয়নে ব্যয়িত। তাই বাংলাদেশের ব্যক্তি খাত নিয়ে আমার রয়েছে একটা মমত্ববোধ। কিন্তু আমার বন্ধুরা বিশেষ করে যারা আন্তর্জাতিক ব্যক্তি খাতের খোঁজখবর রাখেন, তারা বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের সমাজচিন্তা বা সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ নিয়ে অত্যন্ত সন্দিহান। আমি যত বলি, আমাদের ব্যক্তি খাতের বেশির ভাগ ফার্স্ট জেনারেশন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে কিংবা তাদের অধিকতর শিক্ষিত নেক্সট জেনারেশন এলে ব্যাপারটি পাল্টে যাবে, বন্ধুরা তা বিশ্বাস করছেন না।

তাদের তিনটি প্রশ্ন: ১. তারা মানে আমাদের ব্যক্তি খাত যেকোনো আপদে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে কেন? ২. আপৎকালীন নিজের গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না কেন? ৩. তাদের সবসময় কেন একটি রাজনৈতিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলেই শুধু চাঁদা দিতে দেখা যায়?

যদিও তারা সবার দিকে অঙ্গুলি হেলাচ্ছেন না, তবুও আমার কিছু বন্ধুর অভিযোগের তালিকা আরো লম্বা। অনেকেই মনে করেন, যে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ৫ কোটি ডলারের ওপর রফতানি করে আসছে, সেই ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তা কেন আপদে শ্রমিকদের তিন মাসের বেতনও দিতে পারবে না? স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরেও যখন এ অবস্থা, কবে তাহলে নিজ থেকে আন্তর্জাতিক ব্যক্তি খাতের সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতা করে উঠে দাঁড়াতে পারবে? তাদের মধ্যে যারা আঞ্চলিক ব্যবসায়ী গ্রুপ হিসেবে আত্মপ্রকাশের খায়েশ রাখেন, তাদের যে সময় পরম্পরায় লাভজনক হতে হবে শুধু তা-ই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যাপারেও উচ্চকিত থাকতে হবে বা সিএসআরের ব্যাপারেও এগিয়ে থাকতে হবে। অনেকেই দেখছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ গরিব আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের অনুরোধে কিছুটা দান-খয়রাতে এগিয়ে এলেও আগের দিনের বিত্তবানদের মতো শিক্ষা বিস্তার বা অন্যান্য সমাজ গঠনমূলক কাজে অত্যন্ত লাজুক। তারা নিজ নিজ ব্যবসা বা অনেক সময় অন্যায়কে মানিয়ে নেয়ার জন্য যতটা না টিভি কিংবা মিডিয়ার মালিক হতে চান কিংবা নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদানে এগিয়ে আসেন, ততটা সমাজের কোনো দুর্গতিতে তাদের সাক্ষাৎ মেলে না। তারা নাকি সিএসআর বলতে বোঝেন নিজ মায়ের নামে স্কুল বা বাবার নামে মাদ্রাসা করে পরেরবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যাওয়া। বন্ধুদের অনেকেই এমনকি এই ক্রান্তিলগ্নে যখন কোনো ব্যবসায়ীগোষ্ঠী হাসপাতাল নির্মাণে ব্রত, মনে করছেন তার পেছনেও থাকতে পারে কর-ভ্যাট ফাঁকির পাঁয়তারা বা সহজে অপেক্ষাকৃত সফল প্রতিযোগীকে ঘায়েল করার চেষ্টা। অনেকের প্রশ্ন, তারা কেন বিশ্বস্বীকৃত চ্যারিটি বা এনজিওগুলোর সঙ্গে কাজ না করে সরকারের তহবিলে টাকা ঢেলে দিচ্ছেন? আমার দু-একজন প্রবাসী বন্ধু জানতে চেয়েছেন, সরকারের এই ত্রাণ তহবিলের কোনো অডিট হয় কিনা? উত্তরে আমি বলেছি, গোলাম রহমান সাহেব যখন অনেক বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সচিব ছিলেন, তাকে একবার উচ্চকিতভাবে এই তহবিলের অডিটের ব্যাপারে ফোনে কথা বলতে শুনেছিলাম। কেউ কেউ মনে করছেন, খ্যাতিমান বা আঞ্চলিক বা বিশ্বপর্যায়ে খ্যাতি কুড়াতে ইচ্ছুক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত পরিকল্পিত সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম। সরকার থেকে বা গ্রাহকদের থেকে শুধু নিতে জানলে হবে না, সমাজ বা সমাজের পিছিয়ে থাকা লোকদের মাধ্যমে প্রতিদান বা ফেরতও দিতে জানতে হবে।

কিছুদিন আগে অনুজপ্রতিম এক ব্যাংক নির্বাহী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচারের একটি বক্তৃতার কিয়দংশ পাঠালেন। তিনি বলছেন, ‘দেয়ার ইজ নাথিং কলড পাবলিক মানি। অল পাবলিক মানি ইজ ইওর মানি, ইউ গিভ ইন দ্য ফর্ম অব ট্যাক্স অ্যান্ড আদার মিনস।’ আমাদের ব্যবসায়ীরা যদি অন্তত এই পাবলিক মানির বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারেন বা পাবলিক মানির প্রাইভেট ব্যবহারটা বন্ধ বা কমিয়ে দিতে পারেন, তাও মন্দ হবে না। পাবলিক মানি চলে যাবে সত্যিকারের পাবলিকের দুর্গতিনাশে।

 

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক