গাজীপুর থেকে রাজধানীর বিমানবন্দর পর্যন্ত যানজট নিরসনে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সাড়ে ২০ কিলোমিটার পথে থাকবে ২৫ স্টেশন। কিন্তু নির্মাণ চলাকালেই ধরা পড়ছে একের পর এক নকশাজনিত ত্রুটি। এছাড়া গাড়ি চলাচলের ভুল পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা হয়েছে রাস্তার ডিজাইন। শুধু তাই নয়, বিআরটি স্টেশনের নকশায়ও রয়েছে ত্রুটি। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি মিক্সড ট্রাফিক লেনের গড় প্রশস্ততা সাত মিটার। অথচ বিআরটি স্টেশন এলাকাগুলোয় এ প্রশস্ততা কমে দাঁড়াবে ছয় মিটার। ফলে প্রতিটি স্টেশনে বাধাপ্রাপ্ত হবে সাধারণ যানবাহন। এতে মহাসড়কে যানজট বেড়ে উঠবে। অর্থাৎ প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডটি শিল্প এলাকাপ্রবণ হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ট্রাক ও বাস এটি ব্যবহার করে। যানজট বেড়ে উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্প-কারখানা। দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার আগে একাধিক দফায় ত্রুটি সংশোধন করতে হয়েছে। তার পরও একের পর এক ত্রুটি উন্মোচিত হচ্ছে। এ রকম ত্রুটি ও ভুল পরিকল্পনায় নয় বছর ধরে চলছে প্রকল্পটি। দফায় দফায় বাড়াতে হচ্ছে মেয়াদ ও খরচ। এক্ষেত্রে নকশাগত ত্রুটি, পরিকল্পনাগত দুর্বলতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের আগে আরো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে ভুল নকশায়। যেসব লক্ষ্য সামনে রেখে এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, ভুল নকশার কারণে তা ভেস্তে গিয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভার হিসেবে মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। শহরের প্রধান ব্যস্ততম সড়ক হওয়ায় এর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ থাকলেও ফ্লাইওভার নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে এর নকশায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। অবশেষে ভুল নকশায় নির্মিত ফ্লাইওভারটি ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ফ্লাইওভারে ওঠা ও নামার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঢাল ও উচ্চতা বজায় রাখতে না পারায় ফ্লাইওভারটি যানজট নিরসনে তেমন কোনো কাজে আসেনি। একইভাবে মহাখালী ফ্লাইওভারেও নকশাগত ত্রুটির কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। খিলগাঁঁঁঁও ফ্লাইওভার চালুর কয়েক বছরের মাথায় বড় ধরনের ফাটল দেখা গিয়েছিল। যমুনা সেতুতেও বড় ফাটল দেখা দেয়ার পর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তা মেরামত করা হয়েছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর নির্মাণ পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটির কারণে অদূরভবিষ্যতে এসব স্থাপনাও ভেঙে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে নগরবিদদের কেউ কেউ মনে করেন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একেকটি স্বপ্নের স্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনা, অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট। ত্রুটি ধরা পড়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি।

বিআরটির মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত দুই-চার বছর লাগে। এর ব্যয়ও হয় কম। কিন্তু বিমানবন্দর-গাজীপুর প্রকল্পে উড়ালসড়ক, পাতালপথ, সেতুসহ অন্যান্য কাজ যুক্ত করে এটি জটিল করা হয়েছে। ট্রান্সমিলেনিও বিআরটি সিস্টেমটি কলম্বিয়ার বোগোতা এবং সোচা শহরদ্বয়ের মধ্যে চলাচল করে। ২০০০ সালে চালুকৃত সিস্টেমটি ২০১৯ সাল নাগাদ আটটি লেনসহ শহর দুটি জুড়ে ১১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। যাত্রীরা ওভারব্রিজ ব্যবহার করে স্টেশন পৌঁছেন। মধ্যবর্তী চারটি লেন বিআরটি বাসের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম বিআরটি সিস্টেম ট্রান্সজাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অবস্থিত। ভিড়ের সময় ট্রাফিক কমাতে সহায়তার জন্য একটি দ্রুতগতির পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু করতে এটি ২০০৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এটিতে বাসগুলো ডেডিকেটেড লেনে চলাচল করে এবং টিকিটের দামে আঞ্চলিক সরকার কর্তৃক ভর্তুকি দেয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ার ট্রান্সজাকার্তা বিশ্বের দীর্ঘতম বিআরটি সিস্টেম (২৫১ দশমিক ২ কিমি দীর্ঘ), যা প্রায় ৩ হাজার ৯০০ বাস পরিচালনা করে। ২০২০ সালে এটি গড়ে প্রতিদিন ৯ দশমিক ৮৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। লাহোর মেট্রোবাস পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের একটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট সার্ভিস। পাকিস্তানের লাহোর মেট্রোবাস পরিষেবাটি লাহোর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির লোকাল বাস সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নগর পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যা পার্শ্ববর্তী শহরতলির বাসিন্দাদের সংযুক্ত করে লাহোর জেলাজুড়ে একটি বিরতিহীন পরিবহন পরিষেবা পরিচালনা করে। লাহোর মেট্রোবাস পর্যায়ক্রমে চালুর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং ২০১৩ সালে চালু হওয়া প্রথম পর্যায়টি (২৭ কিমি) গাজুমাতা থেকে শাহাদ্র পর্যন্ত প্রসারিত। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায় দুটি স্থগিত রাখা হয়েছে, কারণ এগুলোকে লাইট রেইল প্রকল্পে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিআরটি কর্তৃপক্ষ বলছে, স্টেশন এলাকায় মিক্সড ট্রাফিক লেন প্রশ্বস্ত করার পরিকল্পনা শুরু থেকেই তাদের রয়েছে। কিছু স্থানে এরই মধ্যে জায়গা বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় মিক্সড ট্রাফিক লেনটি কিছুটা ফুটপাতের দিকে বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। আবার কোথাও এখনো ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান। প্রয়োজনীয় প্রাক্কলনগুলো তারা করে ফেলেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে জমি অধিগ্রহণের কাজ বাকি। আশপাশের ভবন ভেঙে কীভাবে জায়গা তৈরি করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া প্রকল্প প্রণয়ন ও নকশা প্রণয়নের সময় বিষয়টি কেন ধরা পড়ল না, তাও বোধগম্য নয়। আলোচ্য বক্তব্য দায় এড়ানোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। কারণ স্টেশন এলাকাগুলোয় চিকেন নেকের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। ওই এলাকায় দুর্ঘটনাও বাড়তে পারে। তাছাড়া বিআরটি প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, স্টেশন এলাকাগুলো সরু হবে, এটা জেনেই করিডোরটির নকশা করা হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, এটি করা হয়েছে মূলত প্রকল্পটি অনুমোদনের স্বার্থে। অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না, খরচ কম হবে তাই এমন নকশা করার কথা জানিয়েছেন তারা। বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কেননা তাদের জন্য ভালো একটি প্রকল্পের পরিণতি খারাপ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডটি শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা। শ্রমিকরা হেঁটে যাতায়াত করেন ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য। তাদের জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাতের ব্যবস্থা করা হয়নি। লাখ লাখ শ্রমিকের জন্য করা হয়েছে মাত্র ৪ ফুটের একটি ফুটপাত, তাও আবার দোকানের পাশ দিয়ে। দোকানদারই অর্ধেকটা দখল করে ফেলবে। ফলে শ্রমিকরা রাস্তায় চলে আসবেন। পরিবহনে আরো বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। শুধু তাই নয়, স্টেশনের কলাম দেয়া হয়েছে ফুটপাতের ওপর। সেখানে মানুষ চলাচল করতে পারবে না! আর যারা বিআরটি ব্যবহার করবে, তারাই বা কীভাবে চলাচল করবে! এটি যারা বিআরটির যাত্রী হবে, তাদের আসা-যাওয়ার জায়গা না করে দিলে তারা উৎসাহিত হবে না। অপারেশন ও ডিজাইন অনুযায়ী বিআরটি একটি ভুল প্রকল্প। বিআরটির ফুটপাত সারা বিশ্বেই ১০-১২ ফুট হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে সেটি করা হয়েছে ৪ ফুট, তাও আবার স্টেশনের কাছে সেটি ১-২ ফুট। বিআরটির সঙ্গে ফুটপাতের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বড় ফুটপাত মানুষকে বিআরটি ব্যবহারে উৎসাহিত করে। ভাঙাচোরা, সংকীর্ণ ফুটপাত বিআরটির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে।

ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ টেকসই উন্নয়নের অন্তরায়। এ ধরনের ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অনেক উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, রূপসা রেলসেতু প্রকল্প, খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, আখাউড়া-লাকসাম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশকিছু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। এসব ভুলের কারণে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জন যেমন ব্যাহত হয়, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কোটি কোটি টাকা খরচ করে তা ভেঙে ফেলা বা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবে জনগণের টাকার অপচয় রোধ করা না গেলে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কখনোই সম্ভব হবে না। এটি হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়ম, অস্বচ্ছতার কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় স্থাপনা ভুল পরিকল্পনা ও ভুল নকশায় নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় ও দায়িত্বহীনতার দায় এড়াতে পারেন না। তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতি অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। তিনি একটি একনেক সভায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই, ভুল নকশা এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে মান বজায় রাখতে ব্যর্থতার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। জনগণের অভিপ্রায়ও একই। প্রত্যাশা থাকবে সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো সতর্ক হবে এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ করবে।