ডিজিটাল
লেনদেন আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি সাধারণ এবং নিত্যদিনের কার্যক্রমের অংশ। বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ এরই মধ্যে কয়েক দশক ধরে ডিজিটাল এবং প্রতিদিন বিশ্বে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে সব উন্নত এবং বেশির ভাগ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের কাঠামো তৈরি করেছে এবং আন্তঃব্যাংক/প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করে চলেছে। ‘ডিজিটাল মুদ্রা/নোট বা ‘ভার্চুয়াল মুদ্রা/নোট’ ডিজিটাল লেনদেন খাত এবং আর্থিক বিশ্বে তুলনামূলকভাবে নতুন। বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ২০০৯ সালে যখন প্রথম ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা অর্থাৎ ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’ আবির্ভূত হয়। বিটকয়েনের পর এ সময়ের মধ্যে ছয় হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্বজুড়ে প্রচলন করা হয়েছে, যা স্থানান্তর হতে পারে এবং লেনদেন বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইস্যুকৃত এসব ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা অদূরভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত ‘ভার্চুয়াল মুদ্রা’ প্রচলনের বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে এবং বিভিন্ন দেশের এ-সংক্রান্ত প্রয়াস আরো বেগবান হয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত অনেক বিভ্রান্তি, সংশয় এবং এর ব্যবহারে অনেক দেশে আইনি বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও আজ অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভার্চুয়াল মুদ্রার উপস্থিতি একটি বাস্তবতা। এছাড়া এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ‘ব্লকচেইন’ আগামী দিনের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে বিপ্লবের সূচনা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইস্যুকৃত এ ভার্চুয়াল মুদ্রাগুলোর উত্থান রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ডিজিটাল নোট প্রচলনের জন্য চাপও বটে। সেক্ষেত্রে ডিজিটাল মুদ্রা/নোট সরাসরি টাকা/ ডলার/ইউরো/পাউন্ড ইত্যাদির মতো লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে, যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘লিগাল টেন্ডার’ বা ‘ফিয়াট মানি’। মুদ্রা/নোট এবং কয়েনের সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রা/নোট বিনিময়ের মাধ্যম এবং মূল্য সঞ্চয় হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে এটি সাধারণ পরিবর্তন নয়। একটি বড় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। এটি হবে অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ব্যাংক খাত তথা সার্বিক লেনদেন, আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে এক আমূল রূপান্তর। ‘অর্থ সরবরাহের’ গতানুগতিক সংজ্ঞায় পরিবর্তন আসবে, অর্থায়ন প্রক্রিয়া হবে ভিন্নতর। বৈদেশিক লেনদেনের এবং নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াগুলো একটি নতুন রূপ নেবে, যেখানে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য এবং যুক্তিপূর্ণ সমঝোতা এ সমাগত ব্যবস্থার সাফল্যের পূর্বশর্ত হবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে ডিজিটাল মুদ্রা/নোটের সম্ভাবনা, কৌশল এবং এর প্রযুক্তির দিকগুলো নিয়ে গবেষণায় অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এ পরিবর্তিত ডিজিটাল মুদ্রা এরই মধ্যে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি’ বা ‘সিবিডিসি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ব্যক্তি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ইস্যুকৃত ক্রিপ্টোকারেন্সির একটি নিয়ন্ত্রিত এবং পরিবর্তিত রূপ হতে যাচ্ছে সিবিডিসি। প্রকাশিত তথ্যানুসারে, বিশ্বের ৮৫ শতাংশেরও বেশি দেশ ‘রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট’-এর সম্ভাব্যতা নিরূপণে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি দেশ এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোটের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নও সম্পাদন করেছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতি, সামাজিক দূরত্বের ব্যবস্থা, জনগণের উদ্বেগ যে নগদ নোটের/মুদ্রার মাধ্যমে কভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণ করতে পারে এবং সরকারি তহবিল থেকে সরাসরি অর্থ প্রদানের প্রকল্পগুলো রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোটের যৌক্তিকতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোটের ওপর গবেষণা, মতামত এবং তাদের অবস্থান প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে ‘ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট’ এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দলগতভাবে অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, জাপান, কানাডা এবং তারা এরই মধ্যে এ বিষয়ে মৌলিক কিছু নীতিমালার ক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছেছে। একটি সফল পাইলট পর্ব সম্পন্ন করে বাহামাস বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাহামিয়ান ডলারের ডিজিটাল সংস্করণ স্যান্ড ডলার জারি করেছে, যা বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট। স্বল্প জনসংখ্যার এবং ৯০ শতাংশ মোবাইল অন্তর্ভুক্তির দেশটিতে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোটের প্রচলন তুলনামূলক সহজ হলেও এটি অবশ্যই একটি সাহসী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত। তবে অর্থনীতির আকার, কাঠামো, প্রযুক্তি এবং জটিলতা বিবেচনায় চীন, সুইডেন ও কানাডার রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট মডেলগুলো বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বেশি আলোচনার খোরাক হয়েছে।
কী আশা করছে বিশ্ব রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট প্রচলনের মাধ্যমে? কী তাদের প্রেরণা? ‘সুবিধাজনক
এবং সহজবোধ্যতা’ সম্ভবত রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট প্রচলনের প্রাথমিক প্রেরণা। আশাবাদীরা এই নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মাঝে একটি অত্যন্ত দক্ষ আর্থিক লেনদেন এবং অর্থায়ন ব্যবস্থা দেখতে পান। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এখনো স্বল্প আয়ের মানুষ বা গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ পুরোপুরি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আসেনি। ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বল্প আয়ের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট বাস্তবায়নের মূল প্রেরণা। উন্নয়নশীল অর্থনীতিরগুলোর নোট প্রিন্টিং এবং এ-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার ব্যয় হ্রাস করতে পারে এবং আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত অপরাধ কমাতে অবদান রাখতে পারে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট। আর্থিক লেনদেনের বৃহত্তর সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এ নতুন ডিজিটাল নোট। উন্নত অর্থনীতিগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট কাঠামোয় ‘অর্থ লেনদেনের সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা’র সম্ভাবনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা ভার্চুয়াল অর্থ লেনদেন ব্যবস্থার স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট কাঠামোর মাঝে।
সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা এবং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে দেশে ডিজিটাল লেনদেন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখযোগ্য নীতিমালা গ্রহণ করেছে এবং মূলত ২০১০ সাল থেকে ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের প্রযুক্তি অবকাঠামো স্থাপন করেছে। ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি কৌশলটির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ এবং ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’ অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ‘মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস’ বা ‘এমএফএস’ দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ই-বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। খুব নির্দিষ্টভাবে বিকাশ, রকেট, নগদ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডিজিটাল লেনদেন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে একই সারিতে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য আরো অর্জন করতে হবে। উল্লেখযোগ্য উন্নতি সত্ত্বেও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন সূচক’ অনুসারে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বৈষম্য দৃশ্যমান।
সন্দেহ নেই যে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ সেলফোন ও ইন্টারনেট অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তবে মোবাইল সেট ব্যবহারে স্মার্টফোন এবং পুরুষ-মহিলা ও গ্রামীণ-নগর বৈষম্য নিরসনে উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় উন্নত অর্থনীতি ইন্টারনেট অবকাঠামো স্থির ব্রডব্যান্ড সাবস্ক্রিপশনে অনেক এগিয়ে। কম্পিউটার মালিকানার ক্ষেত্রে শহর এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, তবে গ্রামাঞ্চলে সে চিত্র এক রকম নয়।
‘উদ্ভাবনী সক্ষমতা’ ডিজিটাল বিকাশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা হয় রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট বাস্তবায়নে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালক। প্রযুক্তির ব্যবহার, উদ্ভাবন এবং সম্পর্কিত গবেষণা, উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগ ইত্যাদি স্তম্ভ ব্যবহার করে পরিমাপ করা যেতে পারে একটি দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের সাম্প্রতিক গ্লোবাল ইনোভেশন সূচক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে উদ্ভাবনী সক্ষমতায় বড় দূরত্ব নির্দেশ করে। উন্নয়নশীল দেশে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল নিশ্চিত করার জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতার ওপরও কাজ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তার ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করছে। কভিড-১৯ মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব ধরনের লেনদেনে এ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল মুদ্রা/নোট প্রবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ নিজেকে তা থেকে দূরে রাখতে পারে না। দেশকে প্রস্তুত হতে হবে এবং ‘ডিজিটাল টাকা’ প্রবর্তন ও বাস্তবায়নে স্বীকৃত মৌলিক নীতির আওতায় গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ডিজিটাল টাকা প্রবর্তন ও বাস্তবায়নে সফলতা কেবল ডিজিটাল আপগ্রেডেশন বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ও রূপান্তর, যার জন্য প্রস্তুতি এবং সক্ষমতার উন্নয়ন প্রয়োজন।
ড. শাহ মো. আহসান হাবীব: অধ্যাপক ও পরিচালক (প্রশিক্ষণ) বিআইবিএম










