এ মতামত যখন লেখা হচ্ছে তখন পর্যন্ত মৃতের নিশ্চিতকৃত সংখ্যা ৩১। আহত দুশোর কাছাকাছি। হতাহতের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনাগুলোর রেকর্ড-ব্যাখ্যা সবই সব সময় সংখ্যায়ই সীমাবদ্ধ থাকে। চাপা পড়ে যায় ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলোর কার্যকারণ-অনুসন্ধান। রাষ্ট্র শোক প্রকাশ করে। দিনব্যাপী, কখনো আধা দিনব্যাপী শোক পালন করে। আবার ত্রাণ তহবিলে অনুদানও চায়। ঘটনা নিয়ে কিছু পরিমাণে তদন্ত হয়। কেউ কেউ হয়তো শাস্তিও পায়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব তদন্তের প্রতিবেদন জনসম্মুখে আসে না। ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলোও বন্ধ হয় না। চলতে থাকে। কারখানায় অগ্নিকাণ্ড-বয়লার বিস্ফোরণ বা ভবন ধসে শ্রমিকের মৃত্যু, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক কারখানার বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু সবখানেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে ঢাকার একটি স্কুল ভবনের ওপর। শুরুতে সবাই এটিকে প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ বলে ধরে নিলেও পরে জানা যায়, এটি ছিল আসলে প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত একটি যুদ্ধবিমান। এবং বিমানবাহিনীর এ মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। আর গত ৩৪ বছরে ৩০ বারের বেশি বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বা যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এ ধরনের পুরনো মডেলের যুদ্ধবিমানগুলোই।
বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী শহরের আকাশে এ ধরনের উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটি কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, বায়ুসুরক্ষা ব্যবস্থা যদি এমন সব অচল যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল হয়, যেগুলো আকাশে উঠতে না উঠতেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে, বারবার বিধ্বস্ত হয়; তাহলে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই জনমনে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়। আর এ ধরনের সংশয়ের অবকাশ তৈরি হওয়াটাও কখনো কোনো দেশের জন্য ভালো কিছু নয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো এতগুলো শিশুর এভাবে প্রাণহানি কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহত শিশুদের নরকসম যন্ত্রণা পোহানোর বিষয়টিও হৃদয়বিদারক। যে শিশুরা প্রাণে বেঁচে ফিরেছে, এ ঘটনার ট্রমা কি তাদের পক্ষে কখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? জীবনের শুরুর দিকেই সংবেদনশীল মনে এত ভয়াবহ একটি ঘটনার ছাপ পড়ে গেল তাদের মনে। কোনো কোনো শিশুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যারা ট্রমার কারণে নিজের ঠিকানা বা আত্মীয়স্বজনের নামও বলতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি কার্ড আর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে তাদের আত্মীয়ের সন্ধানে। ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে ফেরা এসব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো কেউ কোনো কিছু ভেবেছেন কি?
প্রশ্ন হলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে কেন বিমানবাহিনীর নবিসদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাতে হবে? এর কোনো উত্তর নেই। অনেকেই হয়তো পরস্পর দোষারোপ বা দায় এড়ানোর কাজে ব্যস্ত হবেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না। মৃতেরা কি ফিরে আসবেন? আহত শিশুগুলোর যন্ত্রণার উপশম হবে কি তাতে? যে পিতা-মাতারা বুকের মানিককে হারিয়েছেন, তাদের এ যন্ত্রণার উপশম হবে কখনো? এর কোনো ক্ষতিপূরণ হয়?
দেড়-দুই দশক ধরে এমন মর্মান্তিক অনেকগুলো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছে বাংলাদেশ। কে জানে হয়তো সামনেও আরো হবে। দেশের জনসাধারণও এক সময় এ ঘটনার কথা ভুলে অপেক্ষা করতে থাকবে পরবর্তী কোনো দুর্ঘটনার জন্য। কিন্তু এসব ঘটনার কারণগুলোর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান মিলবে না। রানা প্লাজার ঘটনার পর অনুমোদনহীন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ থামেনি। চুড়িহাট্টার দুর্ঘটনার পরও ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমেনি। উত্তরার ঘটনার পর ঘনবসতিপূর্ণ নগরীর ওপর বৈমানিকের প্রশিক্ষণ থামবে কিনা বা বাংলাদেশের আকাশপথের ঝুঁকিগুলো দূর করতে সক্রিয় কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা, সেটিও প্রশ্ন।
রাজধানী ঢাকার ওপর দিয়ে সামরিক-বেসামরিক সব ধরনেরই উড়োজাহাজ চলাচল এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় সময়ই উড়োজাহাজের পাইলটরা অভিযোগ করেন, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়ে আশপাশের এলাকা থেকে লেজার লাইট মারা হচ্ছে। অত্যন্ত ভয়ংকর অভিযোগ। যেকোনো ফ্লাইটের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হচ্ছে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়টা। এ সময় পাইলটের সামান্য ভুলে বা মনোযোগের সামান্যতম ব্যাঘাতে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহতম দুর্ঘটনা। ঠিক এমন একটা সময় যখন পাইলটের চোখের মধ্যে আচমকা লেজার লাইট এসে পড়ে, তখন কি ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে; সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের কেউ কখনো মনোযোগ দিয়েছেন কি? বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কখনো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা গেছে কি?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ লেজার লাইট কারা মারছে? সাধারণ জনগণ? অন্তত প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেটুকুই বলার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। যদিও রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালকসহ ভুক্তভোগীরা সবাই জানেন, ঢাকার রাস্তায় লেজার লাইট ব্যবহার করে একমাত্র ট্রাফিক পুলিশ। যানবাহনের চালকের চোখ বরাবর আকস্মিকভাবে লেজার লাইট ফেলে চালকের দৃষ্টিশক্তিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি সড়কে বাড়াচ্ছে আকস্মিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। ট্রাফিক পুলিশের হাতে লেজার লাইট দিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণের এ আইডিয়া কার মাথায় এসেছিল, কে জানে? এটি অনতিবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
পাইলটদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও মনোযোগ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। নেপাল দুর্ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ আর কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন এয়ারপোর্টের কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপে যা-ই বলা হয়ে থাকুক না কেন; উড়োজাহাজের পাইলট যে মানসিকভাবে অত্যন্ত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেটি তো স্পষ্ট।
সামরিক-বেসামরিক যেকোনো উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেই যাত্রী ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা বহুলাংশে পাইলটের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। যদিও বাংলাদেশে পাইলট নিয়ে জালিয়াতি-দুর্নীতির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে নানা সময় অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা নিয়েও।
মাইলস্টোন দুর্ঘটনা বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন খাতের জন্য বড় একটি ওয়েক আপ কল। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান একে একে দুর্বল হয়ে ওঠার বিষয়টি জুলাই অভ্যুত্থানের পর পর বেশ ব্যাপকমাত্রায় প্রকট হয়ে উঠেছিল। এ ধরনের দুর্ঘটনা সে বিষয়টিকেই বারবার সামনে নিয়ে আসছে। এখন প্রয়োজন কমপ্লিট ওভারহলিং বা আমূল সংস্কার। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটিকেও অতি উচ্চাভিলাসী বলেই মনে হচ্ছে।
মো. সাইফুল ইসলাম : সাংবাদিক










